বৃহস্পতিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

গতকাল রাতে আমি যে গল্পটি আমি জেনেছি,
তার একটি শুরু আছে
এই কথা এখনো মনে রেখেছে শীত সন্তপ্ত ভোরের আকাশ

প্রতিদিন এই শীত ও শহরের উষ্ণতা বয়ে নিয়ে
একটি কোমল বাড়ির কাছে গোপনে লিখে রাখি
                                       সেইসব মৃত্যুঞ্জয়ীদের নাম
এখানে কি আজ শিমুল বাগান হয়েছে?
যে শিমুল ফুটেছিলো এক দুপুরের রক্তে?

আমরা এই দুপুরে সেই ফাল্গুনের ঘ্রাণ বয়ে বেড়াই
দেখি, সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে এই ঘ্রাণ ছড়িয়ে যাচ্ছে
                                          পথ থেকে পথে

বসন্তের ঘ্রাণ

at বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৩  |  No comments

গতকাল রাতে আমি যে গল্পটি আমি জেনেছি,
তার একটি শুরু আছে
এই কথা এখনো মনে রেখেছে শীত সন্তপ্ত ভোরের আকাশ

প্রতিদিন এই শীত ও শহরের উষ্ণতা বয়ে নিয়ে
একটি কোমল বাড়ির কাছে গোপনে লিখে রাখি
                                       সেইসব মৃত্যুঞ্জয়ীদের নাম
এখানে কি আজ শিমুল বাগান হয়েছে?
যে শিমুল ফুটেছিলো এক দুপুরের রক্তে?

আমরা এই দুপুরে সেই ফাল্গুনের ঘ্রাণ বয়ে বেড়াই
দেখি, সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে এই ঘ্রাণ ছড়িয়ে যাচ্ছে
                                          পথ থেকে পথে

Read More

রবিবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

তুমি দূরের আকাশ। যে আকাশে রাতের অন্ধকারে ঝিলমিল করে তারারা। চাঁদ প্রতি যৌবনে তার আলোর বণ্যায় ভাসিয়ে দেয় অন্ধকার। দিনে তুমি স্বরূপে ফেরো। এই সময় কেউ কি মন দিয়ে তোমার দিকে তাকায়? কেউ কেউ হয়তো তাকায়। নিজেকে যখন শূণ্য মনে হয়, মনে হয় পৃথিবীর লক্ষ কোটি যন্ত্রণার ভেতর অযাচিত একটি মানুষ হুট করে প্রবেশ করার পর যে শূণ্যতা তৈরি হয় সেই মন নিয়ে তখন লোকজন আকাশের দিকে তাকায়। হতাশা থেকে মুক্তি চেয়ে নতুন আশার সন্ধ্যানে। কিন্তু আকাশের দুঃখ দেখে না কেউ। বৃষ্টি দেখে আনন্দ বা হতাশা দুটোই করে মানুষ। আকাশের দুঃখ কি কেউ বোঝে? বোঝে কি সন্ধ্যায় কেনো আকাশের বুকে রক্ত জমা হয়? তুমি কি সেই আকাশ?
গত চারদিন ধরে যে মানুষগুলো নিজেদের সুখ শান্তি আরাম আয়েস বর্জন করে রাজপথকে ঠিকানা করেছে, তুমিও তাদের একজন। আমিও হয়তো তাদেরই দলের, কিন্তু দিনকে দিন অলস হতে যাওয়া আমি বারবার সেই দলে গিয়ে দাঁড়াচ্ছি না। কিন্তু আমি জানি, তোমার মতো লাখো মানুষ সেই জনতার কাতারে। আমি শুধু বলবো তোমার ডানে বা বায়ে বা তোমার পেছনে যে মানুষটির অস্তিত্ব তুমি পেতে পারো সেটা হতে পারে আমার।
ছা-পোশা জীবনে তো নানান সীমাবদ্ধতা থাকে। সেইসব সীমাবদ্ধতার একটাই নিজের ইচ্ছার কাছে পরাধীন থাকা। তবে শান্তনা একটাই, আমার সেই পেশাটা একেবারে জনবিচ্ছিন্ন নয়। বরং জনগণের কাছে যাওয়ার সুযোগ। তবে সেখান থেকে আকাশ অনেক দূরের পথ। তাই তোমার কাছে ফিরতে ইচ্ছে হয় সকাল সন্ধ্যা বিকাল। তুমিই তো সেই আকাশ। যে আকাশের দিকে তাকিয়ে নিঃশ্বাস ছাড়লে বিনিময়ে সাহস যোগায়। ভালো থেকো।

এ্যাংরী বার্ডকে চিঠি

at রবিবার, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৩  |  No comments

তুমি দূরের আকাশ। যে আকাশে রাতের অন্ধকারে ঝিলমিল করে তারারা। চাঁদ প্রতি যৌবনে তার আলোর বণ্যায় ভাসিয়ে দেয় অন্ধকার। দিনে তুমি স্বরূপে ফেরো। এই সময় কেউ কি মন দিয়ে তোমার দিকে তাকায়? কেউ কেউ হয়তো তাকায়। নিজেকে যখন শূণ্য মনে হয়, মনে হয় পৃথিবীর লক্ষ কোটি যন্ত্রণার ভেতর অযাচিত একটি মানুষ হুট করে প্রবেশ করার পর যে শূণ্যতা তৈরি হয় সেই মন নিয়ে তখন লোকজন আকাশের দিকে তাকায়। হতাশা থেকে মুক্তি চেয়ে নতুন আশার সন্ধ্যানে। কিন্তু আকাশের দুঃখ দেখে না কেউ। বৃষ্টি দেখে আনন্দ বা হতাশা দুটোই করে মানুষ। আকাশের দুঃখ কি কেউ বোঝে? বোঝে কি সন্ধ্যায় কেনো আকাশের বুকে রক্ত জমা হয়? তুমি কি সেই আকাশ?
গত চারদিন ধরে যে মানুষগুলো নিজেদের সুখ শান্তি আরাম আয়েস বর্জন করে রাজপথকে ঠিকানা করেছে, তুমিও তাদের একজন। আমিও হয়তো তাদেরই দলের, কিন্তু দিনকে দিন অলস হতে যাওয়া আমি বারবার সেই দলে গিয়ে দাঁড়াচ্ছি না। কিন্তু আমি জানি, তোমার মতো লাখো মানুষ সেই জনতার কাতারে। আমি শুধু বলবো তোমার ডানে বা বায়ে বা তোমার পেছনে যে মানুষটির অস্তিত্ব তুমি পেতে পারো সেটা হতে পারে আমার।
ছা-পোশা জীবনে তো নানান সীমাবদ্ধতা থাকে। সেইসব সীমাবদ্ধতার একটাই নিজের ইচ্ছার কাছে পরাধীন থাকা। তবে শান্তনা একটাই, আমার সেই পেশাটা একেবারে জনবিচ্ছিন্ন নয়। বরং জনগণের কাছে যাওয়ার সুযোগ। তবে সেখান থেকে আকাশ অনেক দূরের পথ। তাই তোমার কাছে ফিরতে ইচ্ছে হয় সকাল সন্ধ্যা বিকাল। তুমিই তো সেই আকাশ। যে আকাশের দিকে তাকিয়ে নিঃশ্বাস ছাড়লে বিনিময়ে সাহস যোগায়। ভালো থেকো।

Read More

বৃহস্পতিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

সৌদি আরবের প্রথম নারী চলচ্চিত্র নির্মাতা হাইফা আল-মানসুর এর ছবি ‘ওয়াজদা’ ২০১২ তে মুক্তি পেয়েছে। ছবিটি প্রথম প্রদর্শিত হয়েছে ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে। সেখানে তিনটি পুরস্কার পাবার পর দুবাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব-১২ তে চারটি শাখায় পুরস্কার জিতে নেয় ‘ওয়াজদা’। সব মিলে এই সৌদি নির্মাতার প্রথম ছবি তার ঝোলায় পুড়েছে ১০টি পুরস্কার ও দুটি নমিনেশন। গত ৬ ফেব্রুয়ারি ফ্রান্সে প্রথম শো হয়েছে। এই উপলক্ষে ফ্রান্সের ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা ফ্রান্স ২৪ এই নারী নির্মাতার এক সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে। এই সাক্ষাৎকারটির ভাবানুবাদ প্রকাশ করা হলো।


ফ্রান্স ২৪ : আপনি বেড়ে উঠেছেন এমন একটি দেশে, যে দেশে সিনেমা হল নেই। তো এমন একটি দেশ থেকে আপনি সিনেমা বানানোর চিন্তাটা কি করে করলেন?

হাইফা আল মনসুর : আমি একটি ছোট শহরে বড় হয়েছি। যে শহরটিতে কোনও সিনেমা হল নেই, কিন্তু প্রচুর ভিডিও ক্যাসেট ভাড়ায় পাওয়া যেত। বাচ্চারাসহ আমাদের পরিবারে বার জন সদস্য। আমার বাবা (সৌদি আরবের কবি আব্দুল রহমান মনসুর) একদিন আমাদেরকে সিনেমা দেখার জন্য এনে দিলেন। এর মাধ্যমে যেন আমরা বাইরের পৃথিবী সম্পর্কে জানতে পারি। তখন আমি আমরা প্রচুর ছবি দেখেছি। যার মধ্যে রয়েছে হলিউডের মেইনস্ট্রিম ছবি যেমন ব্রুস লি, জ্যাকি চ্যান ছিলো। ছিলো প্রচুর পরিমাণে অন্য আমেরিকান ছবি, ভারতীয় ছবি ও মিশরীয় ছবিও। এর মাধ্যমে আমি বুঝতে পারি আমাদের বাইরের পৃথিবীটা কেমন। এবং এর মাধ্যমে দেখেছি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ধরণের ভাবনার বহুরৈখিক রূপ। তখন থেকেই সিনেমা আমার অনুভূতির সাথে মিশে গিয়েছে। আমার মনে পরে আমি প্রথম ‘স্নো হোয়াইট’ নামের ওয়াল্ট ডিজনীর একটি ছবিটি দেখেছিলাম। আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম তা দেখে। তারও বছর খানেক পরে, আরও অনেক ছবি আমার ‘ওয়াজদা’র অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। তার মাঝে রয়েছে ভিক্টোরিও ডি সিকা’র ‘বাইসাইকেল থিফ’ এবং চলচ্চিত্রের নব্য বাস্তববাদ আন্দোলন ও আমাকে আমার গন্তব্যের দিকে যেতে সহযোগীতা করেছে ইরানের পরিচালক জাফর পানাহির ‘অফসাইড’। যাকে আমার মনে হয়েছিলো জীবনের রঙিন ও আনন্দের মধ্য দিয়ে জীবনের গল্পটা বলা যায়। সবকিছুর পরও দারদেনে ব্রাদার্সের ‘রোসেটা’ ছবিটা আমাকে দেখিয়েছে একজন মহিলা গল্পকার কিভাবে গল্পকে নিজের মতো করে বলতে পারে। আমি এসব থেকেই অনুপ্রেরণা পেয়েছি।


ফ্রান্স ২৪ : আপনি যখন সিনেমা বানানোর চিন্তা করলেন, তখন কোন দর্শকদের কথা ভেবেছিলেন? আপনি কি ইউরোপের দর্শকদের সৌদি আরবের নারীদের জীবন যাপন দেখাতে চেয়েছেন? নাকি অন্য নারীদের দেখাতে চেয়েছেন সৌদি আরবের মতো একটা দেশে নারীরা কিভাবে জীবন যাপন করে?

হাইফা আল মনসুর : দুটোই। আসলে আমি চেয়েছিলাম, সব শ্রেণীর দর্শকরা আনন্দের সাথে ছবিটি দেখুক। পাশাপাশি আমি সৌদি আরবের জীবনের একটি চিত্রও যোগ করতে চেয়েছি, কিন্তু সব সময় সব করা যায় না এটা সৌদি আরবের, মিশরের বা অন্য আরব দেশগুলোর লোকজন জানে। তারপরও এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, সৌদি আরবের লোকজন এটা তাদের নিয়ে ও তাদেরই সিনেমা হিসেবে মনে করে এবং এর জন্য তারা গর্ববোধ করে। এই ছবিটিকে লক্ষ্য এবং উৎসর্গের জায়গা থেকে দেখতে হবে, কারণ এটা সৌদি আরবেরই জীবন থেকে উঠে আসা। একই সাথে আমি মনে করি এই ছবি সৌদি আরবের সিনেমাকে উৎসাহী করবে।

ফ্রান্স ২৪ : এই মুহূর্তে সৌদি আরবের সিনেমার জন্য কি সবচেয়ে ভালো হয় বলে আপনি মনে করেন?

হাইফা আল মনসুর : সৌদি আরবের কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেমা নিয়ে পড়াশোনার সুযোগ নেই। সৌদি আরবের অনেক মানুষ তাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সাথে আপোষ করে, যা বাধ্যতামূলক নয়। সেই জায়গায় মানুষ সিনেমা বানাতে চাইছে, তাই সেখানে তার ব্যবস্থা করা উচিত। যদিও এখনো অনেকেই সেখানে সিনেমা নিয়ে বিতর্ক করে, তবুও অনেক মানুষ এখন সিনেমাকে গ্রহণ করছে। তাই সরকারের উচিত সৌদিতে সিনেমাকে উন্মুক্ত করে দেয়া।

ফ্রান্স ২৪ : আপনি একজন নির্মাতা হিসেবে সৌদি আরবে কেমন মনে করছেন?

হাইফা আল মনসুর : আমি রাজনীতি সচেতন ব্যাক্তি। আমার সাথে কিছু মানুষ রয়েছে, আরও বেশী নারীরা স্বাভাবিক জনজীবনের সাথে সম্পৃক্ত হউক এমনটা তারা দেখতে চায়। এমনকি আমার প্রতিপক্ষের মানুষ রয়েছে। মূলত সৌদি আরব একটি রক্ষণশীল দেশ, দেশের বুদ্ধিজীবী ও সমালোচকরা তাদের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে বাইরের কোনও কিছুকে স্বাগতমত জানাতে চায় না। আমি এমন এক সীমাবদ্ধ পরিবেশে কাজ করি, তার পরও আমি বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতে আমার মতামত তুলে ধরি। সাধারণভাবে আক্রমনাত্মক অবস্থান থেকেই আমি আমার কথাগুলো বলি এবং আমি বরাবরই সৌদি আরবের নারীদের স্বাধীনতার পক্ষেই কথা বলে এসেছি। তারমানে আমি মুখের উপর কথা বলছি না। ‘ওয়াজদা’য় আমি যেমন একটি নারীর গল্প বলেছি, কিন্তু আমি দেখিয়েছি একটি শিশুকে। আমি সংলাপের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করেছি, এবং আমার ধারণা মানুষ এটিকে সমর্থন জানাচ্ছে।

ফ্রান্স ২৪ : ‘ওয়াজদা’ যখন টিভিতে বা ডিভিডিতে সৌদি আরবে মুক্তি পাবে তখন কেমন প্রতিক্রিয়া আশা করছেন?

হাইফা আল মনসুর : দুবাই ফিল্ম ফ্যাস্টিভ্যালে যখন ছবিটি দেখায়, তখন আমি খুব নার্ভাস ছিলাম। ছবিটি ভেনিসে প্রদর্শণের পর তখন অনেক সৌদি আরবের অনেকেই দুবাইয়ে ছবিটি দেখতে এসেছিলো। তারা কিন্তু ছবিটি পছন্দ করেছে। কেউ কেউ বলেছে তারা ছবির কিছু কিছু স্থানে প্রাণ খুলে হেসেছে। এটা নিশ্চিত যে, চলচ্চিত্র উৎসবে যারা গিয়েছে তারা সবাই উচ্চবিত্তের এবং শিক্ষিত। এখন আমারা দেখতে অপেক্ষা করছি ছবিটি সৌদি আরবের সাধারণ মানুষ কিভাবে গ্রহণ করবে। আমার ধারণা তারা আমার চিন্তার জায়গাটা ধরতে পারবে। এটি একটি কিশোরীর গল্প, যে কিনা নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়। যদি কোন বাবা এ ছবি দেখে তার মেয়ের জন্য কিছু করার চেষ্টা করে সেটাই আমার জন্য অনেক কিছু হয়ে দাঁড়াবে।

ফিল্মম্যাকারের গল্প

at বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ০৭, ২০১৩  |  No comments

সৌদি আরবের প্রথম নারী চলচ্চিত্র নির্মাতা হাইফা আল-মানসুর এর ছবি ‘ওয়াজদা’ ২০১২ তে মুক্তি পেয়েছে। ছবিটি প্রথম প্রদর্শিত হয়েছে ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে। সেখানে তিনটি পুরস্কার পাবার পর দুবাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব-১২ তে চারটি শাখায় পুরস্কার জিতে নেয় ‘ওয়াজদা’। সব মিলে এই সৌদি নির্মাতার প্রথম ছবি তার ঝোলায় পুড়েছে ১০টি পুরস্কার ও দুটি নমিনেশন। গত ৬ ফেব্রুয়ারি ফ্রান্সে প্রথম শো হয়েছে। এই উপলক্ষে ফ্রান্সের ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা ফ্রান্স ২৪ এই নারী নির্মাতার এক সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে। এই সাক্ষাৎকারটির ভাবানুবাদ প্রকাশ করা হলো।


ফ্রান্স ২৪ : আপনি বেড়ে উঠেছেন এমন একটি দেশে, যে দেশে সিনেমা হল নেই। তো এমন একটি দেশ থেকে আপনি সিনেমা বানানোর চিন্তাটা কি করে করলেন?

হাইফা আল মনসুর : আমি একটি ছোট শহরে বড় হয়েছি। যে শহরটিতে কোনও সিনেমা হল নেই, কিন্তু প্রচুর ভিডিও ক্যাসেট ভাড়ায় পাওয়া যেত। বাচ্চারাসহ আমাদের পরিবারে বার জন সদস্য। আমার বাবা (সৌদি আরবের কবি আব্দুল রহমান মনসুর) একদিন আমাদেরকে সিনেমা দেখার জন্য এনে দিলেন। এর মাধ্যমে যেন আমরা বাইরের পৃথিবী সম্পর্কে জানতে পারি। তখন আমি আমরা প্রচুর ছবি দেখেছি। যার মধ্যে রয়েছে হলিউডের মেইনস্ট্রিম ছবি যেমন ব্রুস লি, জ্যাকি চ্যান ছিলো। ছিলো প্রচুর পরিমাণে অন্য আমেরিকান ছবি, ভারতীয় ছবি ও মিশরীয় ছবিও। এর মাধ্যমে আমি বুঝতে পারি আমাদের বাইরের পৃথিবীটা কেমন। এবং এর মাধ্যমে দেখেছি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ধরণের ভাবনার বহুরৈখিক রূপ। তখন থেকেই সিনেমা আমার অনুভূতির সাথে মিশে গিয়েছে। আমার মনে পরে আমি প্রথম ‘স্নো হোয়াইট’ নামের ওয়াল্ট ডিজনীর একটি ছবিটি দেখেছিলাম। আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম তা দেখে। তারও বছর খানেক পরে, আরও অনেক ছবি আমার ‘ওয়াজদা’র অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। তার মাঝে রয়েছে ভিক্টোরিও ডি সিকা’র ‘বাইসাইকেল থিফ’ এবং চলচ্চিত্রের নব্য বাস্তববাদ আন্দোলন ও আমাকে আমার গন্তব্যের দিকে যেতে সহযোগীতা করেছে ইরানের পরিচালক জাফর পানাহির ‘অফসাইড’। যাকে আমার মনে হয়েছিলো জীবনের রঙিন ও আনন্দের মধ্য দিয়ে জীবনের গল্পটা বলা যায়। সবকিছুর পরও দারদেনে ব্রাদার্সের ‘রোসেটা’ ছবিটা আমাকে দেখিয়েছে একজন মহিলা গল্পকার কিভাবে গল্পকে নিজের মতো করে বলতে পারে। আমি এসব থেকেই অনুপ্রেরণা পেয়েছি।


ফ্রান্স ২৪ : আপনি যখন সিনেমা বানানোর চিন্তা করলেন, তখন কোন দর্শকদের কথা ভেবেছিলেন? আপনি কি ইউরোপের দর্শকদের সৌদি আরবের নারীদের জীবন যাপন দেখাতে চেয়েছেন? নাকি অন্য নারীদের দেখাতে চেয়েছেন সৌদি আরবের মতো একটা দেশে নারীরা কিভাবে জীবন যাপন করে?

হাইফা আল মনসুর : দুটোই। আসলে আমি চেয়েছিলাম, সব শ্রেণীর দর্শকরা আনন্দের সাথে ছবিটি দেখুক। পাশাপাশি আমি সৌদি আরবের জীবনের একটি চিত্রও যোগ করতে চেয়েছি, কিন্তু সব সময় সব করা যায় না এটা সৌদি আরবের, মিশরের বা অন্য আরব দেশগুলোর লোকজন জানে। তারপরও এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, সৌদি আরবের লোকজন এটা তাদের নিয়ে ও তাদেরই সিনেমা হিসেবে মনে করে এবং এর জন্য তারা গর্ববোধ করে। এই ছবিটিকে লক্ষ্য এবং উৎসর্গের জায়গা থেকে দেখতে হবে, কারণ এটা সৌদি আরবেরই জীবন থেকে উঠে আসা। একই সাথে আমি মনে করি এই ছবি সৌদি আরবের সিনেমাকে উৎসাহী করবে।

ফ্রান্স ২৪ : এই মুহূর্তে সৌদি আরবের সিনেমার জন্য কি সবচেয়ে ভালো হয় বলে আপনি মনে করেন?

হাইফা আল মনসুর : সৌদি আরবের কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেমা নিয়ে পড়াশোনার সুযোগ নেই। সৌদি আরবের অনেক মানুষ তাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সাথে আপোষ করে, যা বাধ্যতামূলক নয়। সেই জায়গায় মানুষ সিনেমা বানাতে চাইছে, তাই সেখানে তার ব্যবস্থা করা উচিত। যদিও এখনো অনেকেই সেখানে সিনেমা নিয়ে বিতর্ক করে, তবুও অনেক মানুষ এখন সিনেমাকে গ্রহণ করছে। তাই সরকারের উচিত সৌদিতে সিনেমাকে উন্মুক্ত করে দেয়া।

ফ্রান্স ২৪ : আপনি একজন নির্মাতা হিসেবে সৌদি আরবে কেমন মনে করছেন?

হাইফা আল মনসুর : আমি রাজনীতি সচেতন ব্যাক্তি। আমার সাথে কিছু মানুষ রয়েছে, আরও বেশী নারীরা স্বাভাবিক জনজীবনের সাথে সম্পৃক্ত হউক এমনটা তারা দেখতে চায়। এমনকি আমার প্রতিপক্ষের মানুষ রয়েছে। মূলত সৌদি আরব একটি রক্ষণশীল দেশ, দেশের বুদ্ধিজীবী ও সমালোচকরা তাদের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে বাইরের কোনও কিছুকে স্বাগতমত জানাতে চায় না। আমি এমন এক সীমাবদ্ধ পরিবেশে কাজ করি, তার পরও আমি বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতে আমার মতামত তুলে ধরি। সাধারণভাবে আক্রমনাত্মক অবস্থান থেকেই আমি আমার কথাগুলো বলি এবং আমি বরাবরই সৌদি আরবের নারীদের স্বাধীনতার পক্ষেই কথা বলে এসেছি। তারমানে আমি মুখের উপর কথা বলছি না। ‘ওয়াজদা’য় আমি যেমন একটি নারীর গল্প বলেছি, কিন্তু আমি দেখিয়েছি একটি শিশুকে। আমি সংলাপের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করেছি, এবং আমার ধারণা মানুষ এটিকে সমর্থন জানাচ্ছে।

ফ্রান্স ২৪ : ‘ওয়াজদা’ যখন টিভিতে বা ডিভিডিতে সৌদি আরবে মুক্তি পাবে তখন কেমন প্রতিক্রিয়া আশা করছেন?

হাইফা আল মনসুর : দুবাই ফিল্ম ফ্যাস্টিভ্যালে যখন ছবিটি দেখায়, তখন আমি খুব নার্ভাস ছিলাম। ছবিটি ভেনিসে প্রদর্শণের পর তখন অনেক সৌদি আরবের অনেকেই দুবাইয়ে ছবিটি দেখতে এসেছিলো। তারা কিন্তু ছবিটি পছন্দ করেছে। কেউ কেউ বলেছে তারা ছবির কিছু কিছু স্থানে প্রাণ খুলে হেসেছে। এটা নিশ্চিত যে, চলচ্চিত্র উৎসবে যারা গিয়েছে তারা সবাই উচ্চবিত্তের এবং শিক্ষিত। এখন আমারা দেখতে অপেক্ষা করছি ছবিটি সৌদি আরবের সাধারণ মানুষ কিভাবে গ্রহণ করবে। আমার ধারণা তারা আমার চিন্তার জায়গাটা ধরতে পারবে। এটি একটি কিশোরীর গল্প, যে কিনা নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়। যদি কোন বাবা এ ছবি দেখে তার মেয়ের জন্য কিছু করার চেষ্টা করে সেটাই আমার জন্য অনেক কিছু হয়ে দাঁড়াবে।

Read More

রবিবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০১৩

বাংলাদেশের ভিজ্যুয়াল মিডিয়ায় মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর একটা বেশ ভালো ভূমিকা আছে। এ কথা নিশ্চয়ই কেউ অস্বীকার করবে না। আমিও করি না। আমি বরং এক কাঠি সরেশ হয়ে তাকে একটা ‘বিপ্লবী’র স্থানে দেখতে চাই। আর সেই বিপ্লবটা সেই ক্ষেত্রে, যখন বাংলাদেশের দর্শকরা ইটিভি বাংলা ছাড়া আর হাতে গোনা কয়েকজন টিভি নাট্যনির্দেশকের নাটক ছাড়া আর কিছুই বুঝতো না, তখন তিনি নতুন জানালা খোলে দিয়েছিলেন। তার টিভি নাটক মানুষ এক সময়ের ‘অয়োময়’ ‘সংসপ্তক’ এর মতো নাটক যেভাবে দেখতো ঠিক সেভাবে হয়তো দেখতো না, কিন্তু তার নাটক মানুষ উৎসব সহকারে দেখতো। এখন তিনি আর নাটক বানান না, সিনেমা বানান। একজন নির্মাতার এইটাই চূড়ান্ত পরিচয় ও অবস্থানের স্থান। তার জন্যও তিনি সেলুট পাওয়ার দাবি রাখেন। সেইটুক আমি তাকে দিতে চাই এবং তা আমার মন থেকে তিনি অকুণ্ঠভাবেই পেয়ে থাকেন। তাঁর চতুর্থ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘টেলিভিশন’। এর আগে তিনি তিন তিনটি ছবি নির্মাণ করেছেন। দর্শক সমালোচকদের কাছে প্রশংসা ও সমালোচনা তিনি দুটোই পেয়েছেন। আমার ব্যক্তিগত অবজারভেশন বলে প্রশংসা পেলে তিনি আহ্লাদে গদগদ হয়ে যান না, খুশী হন (প্রশংসা কে না পছন্দ করে?)। আবার সমালোচনা পেলে তিনি সেটাও যে খুব বিরক্ত হন তা না, তার প্রতিবাদের ভাষা অন্য রকম হয়ে গিয়ে একটা সিনেমাও হয়ে যেতে পারে। যার প্রমাণ আমরা ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’ এর প্রকাশিত ডিভিডিতে দেখেছি।
সে যাই হোক, সমালোচনাকে গ্রহণযোগ্যভাবে দেখতে না পারলে তাকে আমি ততটা গুরুত্ব দিতে রাজি না। যে কাজ করতে তার সমালোচনা হবেই। যদি সমালোচনা গ্রহণ করতে পারেন, তবেই উন্নতি হবে। নইলে যা আছে তাই থাকবে, বরং অবনতিও হতে পারে। এই কথাগুলো বলা এ কারণে যে, সরয়ার ফারুকির তৃতীয় ছবি যখন মুক্তি পায়, তখন প্রয়াত নির্মাতা তারেক মাসুদ বলেছিলেন, দান দান তিন দানে যেমন আমরা সেরাটা প্রত্যাশা করি, সরয়ার এর কাছেও তাই প্রত্যাশা করি। তবে সেই ছবি দেখার পর তারেক মাসুদের প্রতিক্রিয়া কি হয়েছিলো তা আমার জানা নাই। তাই আমি ঠিক এটা বলতে পারছিনা তৃতীয় দানটা কি তিনি পুরনো দানগুলোর লাভ-ক্ষতি পুষিয়ে দিয়েছিলেন কিনা। এইখানে আমার সন্দেহ রয়েছে। কারণ সেই তৃতীয় দান অতিক্রম করে এখন চতুর্থ দান-এ গিয়ে পরেছেন তিনি। একজন চলচ্চিত্রকার যদি তার চতুর্থ ছবিতে এসেও আশ্চর্য রকম কিছু করতে না পারেন, তাহলে সাধারণত ধরে নিয়ে থাকি সেই চলচ্চিত্রকার আর আশ্চর্যরকম কিছু করতে পারবে না। এ কথা সব ক্ষেত্রেই কাজে দেয় বলে ধারণা করি। যদিও ব্যতিক্রম সব সময়ই হিসেবের বাইরে।
এবার আসি মূল প্রসঙ্গে। ‘টেলিভিশন’ ছবিটি প্রথম প্রিমিয়ার হয়েছে ‘পুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব-২০১২’ তে। তবুও যেনতেন প্রিমিয়ার নয়, ক্লোজিং ফিল্ম হিসেবে তা প্রিমিয়ার হয়েছে। এই ছবি দেখে আমারও (অন্য অনেকের মতো- সেই দলে এই ছবির নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকিও রয়েছেন) প্রিয় নির্মাতা কিম কি দুক বলেছেন, গুড ফিল্ম। পরবর্তিতে দুবাই আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফ্যাস্টিভ্যালে এ ছবি ‘বিশেষ পুরস্কার’ পেয়েছে। এসব কারণে ‘টেলিভিশন’ ছবি নিয়ে আগ্রহ ছিলো। সেই আগ্রহ মেটাতে শুক্রবার বিকেলেই ছবিটি দেখার মনস্থির করেছিলাম। নানান কারণে তা হলো না। শনিবার সন্ধ্যার টিকিট করে সারারাত সারাদিন এর অপেক্ষায় ছিলাম। সিনেমা শুরুর সময় সিনেমার টাইটেল প্রেজেন্টেশন ভালো লেগেছে। ছবির রিভিউ পড়ার সুবাদে গল্পটি জেনে গিয়েছিলাম আগেই। যা জেনেছি তাতে মনে হৈছে এই ছবির বাংলাদেশী কোনও প্রিমিয়ার হৈলে ছবিটা দর্শকদের কাছ থেকে গ্রহণযোগ্যতা এখন যতটুকু পাচ্ছে তার চেয়ে হয়তো একটু কম পেতো। ছবির গল্প মোটামোটি এই- একজন ধর্মান্ধ চেয়ারম্যান (ধর্মভিরু বলবো না এই কারণে যে, ধর্ম ভিরুরা কখনোই ধর্ম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে না, কেবল নিজে বাঁচার জন্য ধর্মের আশ্রয় নেয়। অপরদিকে ধর্মান্ধরা ধর্মকে ঢাল করে চারপাশে ধর্মের লৌকিক জগত তৈরি করতে চায়। এই ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র আমার ধারণা তাই করেছে। এ কারণেই তিনি ধর্মান্ধ) নিজের গ্রামে টেলিভিশন নিষিদ্ধ করেছে। তার ধারণা টেলিভিশন দেখলেই মানুষ নষ্ট হয়ে যাবে। এই টেলিভিশনের কাছেই তাকে শেষ পর্যন্ত পরাজিত হইতে হয়। মাঝখানে আছে প্রেম, সংগ্রাম, আর কিছুটা ড্রামা। এইসব বিস্তারিত বলার তেমন ইচ্ছাই হইতেছে না। ছবিটা নিয়া যে লিখতে বসছি তার কারণ অন্য। তার কারণ হৈলো এই ছবিটার প্রত্যাশার পারদ এত বেশী উড়ছিলো যে, তেমনি কইরা পারদ গইল্যা কুয়াশা হৈয়া গেছে। ছবির গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ঐ চেয়ারম্যান এতই ধর্মান্ধ যে পাসপোর্ট করতে ছবি তুলতে হবে বলে সে হজ্জ্ব করতে যেতে চায় না। কিন্তু এই ছবির দুই গল্পকার ভুলে যায় চেয়াম্যান নির্বাচন করতে হলে যে মনোনয়ন পত্র জমা দিতে হয় তাতে প্রার্থীর ছবি দিতেই হবে। না দিলে মনোনয়ন বাতিল। যে গ্রামে টেলিভিশন চলে না সেই গ্রামে ইন্টারনেট চলে। টেলিভিশনের চেয়ে যে ইন্টারনেট নষ্ট হয়ে যাওয়ার জন্য আরও ভয়ঙ্কর তা তো বলার অপেক্ষাই রাখে না। এমন কন্ট্রাডিকশন নিয়ে ছবির গল্প। ছবির প্রথমার্ধে প্রচুর হিউমার। আর এই হিউমারের কারণে প্রথমার্ধে গল্পের চেয়ে আনন্দই বেশী দেয়া বলে মনে হলো। মনে হলো এতই যদি হিউমার আনতে হয় তাহলে কেবল সংলাপ দিয়ে কেনো? নোয়াখালির একটা দ্বীপের মতো অঞ্চল বলেই কি ঐ দ্বীপের মানুষদের কথায় হিউমার বেশী থাকবে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজবো না। কারণ খুঁজে লাভ নেই। এই উত্তর ছবিতে নেই। এই প্রথম অর্ধের ভেতর সিনেমা দেখতে বসছি এই কথা একবারও মনে হয় নাই, কেবল মনে হৈতেছিলো যে সিনেমা দেখতে আসছি কিন্তু সিনেমাটা কখন শুরু হবে? সেই সিনেমা আর শুরু হয় নাই। মাঝে মাঝে ট্রেলার দেখাইয়া আবার তার নিজের স্থানে ফেরত গেছে। অভিনেতা অভিনেত্রীদের অধিকাংশেরই মুখে নোয়াখালি অঞ্চলের ভাষাটা কেমন যেনো মানানসই লাগছিলো না। মনে হচ্ছিলো তারা নোয়াখালীর ভাষাই বলতেছে তবে মুখস্থ করে। চেয়ারম্যান চরিত্রে শাহির হুদা রুমিকে নির্বাচন আমার মোটেও মনপুত হয় নি। এই গল্প কেনো নোয়াখালির হবে তাও ঠিক ততটা স্পষ্ট না। একটা কারণ হিসেবে দাঁড় করানো যায়, তা হলো ঐ দ্বীপ সাম্রাজ্যের প্রসঙ্গ। কিন্তু সেই প্রসঙ্গ ধূপে টেকে না কারণ, যে এই ক্ষমতাটা দেখাতে পারে সে সবখানেই পারে। যেই গল্পটি এই ছবিতে বলা হয়েছে, সুদূর গ্রামের গল্প যেখানে টেলিভিশন ও মোবাইল ফোনই রীতিমত আন-এভিইলেবল, সেই গল্প বলার জন্য আধুনিক ব্যান্ড শিল্পীদের মিউজিকে করা একেরপর এক গান অন্যদের কেমন লেগেছে তা আমার জানা নাই। ছবিতে ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর খুঁজেই পাই নাই। ছবির সিনেমাটোগ্রাফি আরামদায়ক ছিলো। লাইট চমৎকার, কম্পোজিশনও বেশ ভালো। কিন্তু বারবার যে জিনিসটি মিস করতেছিলাম তা হৈলো ঐ সিনেমা সিনেমা ভাব। আজকে যখন অফিসে কথা হচ্ছিলো টেলিভিশন নিয়ে, তখন একজন বললো তার মেয়ে ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’ সিনেমা দেখার পর নাকি বলছিলো টেলিফিল্ম দেখতেছে। আমি একটা জায়গা ভেবে প্রতিবাদ করি নি। কারণ, টিভির নির্মাতারা সিনেমা বানাতে গেলে তারা টিভির যে চর্চা, ঐ চর্চার মতো করেই সিনেমা বানাতে চায়। আর এ কারণেই সিনেমা দেখার পরও তা টিভি প্রোডাকশন বলে মনে হয়। এই ছবি দেখার পরও আমার তাই মনে হচ্ছিলো। আমি সেই মোস্তফা সরয়ার ফারুকী কেই দেখছি যিনি ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’ ছবির পরিচালক। কিছুটা মুন্সিয়ানা এখানেও দেখিয়েছেন সেটা ঐ প্রত্যাশার পারদ যে উঁচুতে উঠছিলো তা মেটায় নাই। কিছু কিছু আশ্চর্য রকম চিত্রকল্প কিছু কিছু বিরক্তিকর দৃশ্যায়নের সাথে প্লাসে মাইনাসে ছবিটার অনেক ক্ষেত্রেই যোগফল রাখতে সাহস পায় না। তবে ছবির বেশ কিছু জায়গা চোখে লেগে থাকবে তার একটি হলো কুহিনূরের (তিশা) সাথে সোলাইমানের (চঞ্চল) ফোনে কথা বলার দৃশ্য। ফোনটি কোনও এক জায়গায় রেখে দাও, যেন আমি তোমার হাটা চলার শব্দ শুনতে পাই আর মনের ‘টেলিভিশন’ দিয়ে দেখতে পাই তোমারে। অসাধারণ সরয়ার ভাই। আপনি যে পারেন এই দৃশ্যে আপনি তা দেখিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু আপনি বলুনতো, এই দৃশ্যটা যে সিনেমায় থাকে সেই সিনেমাটার অন্যসবকিছু এর আশ-পাশের মানেরও হয়েছে? আমি জানি না। এছাড়া ছবির শেষে যখন আমিন চেয়ারম্যান প্রতারিত হয়ে হোটেলে মাস কাটিয়ে হজ্জ্বের কথা বলে বাড়ি আসবে বলে চিন্তা করে। বা অপেক্ষা করে হজ্জ্ব করে তবেই বাড়ি যাবে, তার যে পরাজয় এই পরাজয় কি কাম্য? এই পরাজয় কি তাকে মাটিতে মিশিয়ে দেয় না? সেই পরাজয়ের গল্প তো তার গ্রামেই সবচেয়ে বেশী অনুভূতিপ্রবণ হতে পারতো। অন্তত আমার তাই মনে হয়। অথবা আমিন চেয়ারম্যানের যে হজ্জ্বের জন্য হাহাকার, তা যত দীর্ঘ সময় দেখানো হয়েছে, এতে করে কি হাহাকার খুব তীব্র বোঝা যায়? আমি বুঝি নি। ছবির অনেক ক্ষেত্রেই মনে হয়েছে আপনি ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর ইচ্ছা করেই এড়িয়ে গেছেন। এই এড়িয়ে যাওয়াকে কি আপনার অন্য কোনও পরিকল্পনা কাজ করেছে? এই পরিকল্পনার কারণে কিন্তু অনেক ভালো ইমোশন ক্রিয়েট করার সুযোগ তৈরি হয়েও হয় নি। তা কি ভালো হলো? এত এত প্রশ্নের উত্তর আমি পাই নি। মনে হয় পাবোও না।
তারপরও ছবিটা হয়তো দেশের বাইরের আরও কিছু ফ্যাস্টিভ্যালে যাবে, কিছু পুরস্কারও পাবে। তবে এ প্রসঙ্গে কিছু না বললেই নয়। তা হলো আমাদের ছবি নিয়ে বড় বড় ফ্যাস্টিভ্যাল কমিটির যে দৃষ্টিভঙ্গিটা থাকে তা হলো, বাংলাদেশ একটা উন্নয়নশীল দেশ, এই দেশের উন্নয়নশীল ছবির জন্য আমরা না হয় একটু সহযোগীতা করলামই। এই দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি আমাদের গল্প ও নিজেদের বিক্রয় করবার যা থাকে তা হলো তাদের মনোযোগ আকর্ষণের ভাবনাগুলো। এই ছবিতে তা করা হয়েছে বলেই মনে হয়েছে আমার। যেই অভিযোগটা তারেক মাসুদকে নিয়েও কেউ কেউ করেছিলো। তার নামে অভিযোগ ছিলো, তারেক মাসুদ ইউরুপের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ছবি বানায়, এ কারণে সেই ছবি সেইসব ফ্যাস্টিভ্যালে প্রশংসিত হয়। এই অভিযোগ পুরুপুরি সত্য না হলেও কিছুটা তার সাথে যায়। যদিও তিনি তা অতিক্রম করেও দেখিয়েছেন। কিন্তু এই ছবিতেও তো একই ভাবনার প্রমাণ পাই। নয়তো ‘টেলিভিশন’ এর গল্প বলতে গিয়ে ধর্মীয় একটি চরিত্রই কেনো শিকার হবে তার?

সিনেমাহলের ‘টেলিভিশন’

at রবিবার, জানুয়ারি ২৭, ২০১৩  |  9 comments

বাংলাদেশের ভিজ্যুয়াল মিডিয়ায় মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর একটা বেশ ভালো ভূমিকা আছে। এ কথা নিশ্চয়ই কেউ অস্বীকার করবে না। আমিও করি না। আমি বরং এক কাঠি সরেশ হয়ে তাকে একটা ‘বিপ্লবী’র স্থানে দেখতে চাই। আর সেই বিপ্লবটা সেই ক্ষেত্রে, যখন বাংলাদেশের দর্শকরা ইটিভি বাংলা ছাড়া আর হাতে গোনা কয়েকজন টিভি নাট্যনির্দেশকের নাটক ছাড়া আর কিছুই বুঝতো না, তখন তিনি নতুন জানালা খোলে দিয়েছিলেন। তার টিভি নাটক মানুষ এক সময়ের ‘অয়োময়’ ‘সংসপ্তক’ এর মতো নাটক যেভাবে দেখতো ঠিক সেভাবে হয়তো দেখতো না, কিন্তু তার নাটক মানুষ উৎসব সহকারে দেখতো। এখন তিনি আর নাটক বানান না, সিনেমা বানান। একজন নির্মাতার এইটাই চূড়ান্ত পরিচয় ও অবস্থানের স্থান। তার জন্যও তিনি সেলুট পাওয়ার দাবি রাখেন। সেইটুক আমি তাকে দিতে চাই এবং তা আমার মন থেকে তিনি অকুণ্ঠভাবেই পেয়ে থাকেন। তাঁর চতুর্থ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘টেলিভিশন’। এর আগে তিনি তিন তিনটি ছবি নির্মাণ করেছেন। দর্শক সমালোচকদের কাছে প্রশংসা ও সমালোচনা তিনি দুটোই পেয়েছেন। আমার ব্যক্তিগত অবজারভেশন বলে প্রশংসা পেলে তিনি আহ্লাদে গদগদ হয়ে যান না, খুশী হন (প্রশংসা কে না পছন্দ করে?)। আবার সমালোচনা পেলে তিনি সেটাও যে খুব বিরক্ত হন তা না, তার প্রতিবাদের ভাষা অন্য রকম হয়ে গিয়ে একটা সিনেমাও হয়ে যেতে পারে। যার প্রমাণ আমরা ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’ এর প্রকাশিত ডিভিডিতে দেখেছি।
সে যাই হোক, সমালোচনাকে গ্রহণযোগ্যভাবে দেখতে না পারলে তাকে আমি ততটা গুরুত্ব দিতে রাজি না। যে কাজ করতে তার সমালোচনা হবেই। যদি সমালোচনা গ্রহণ করতে পারেন, তবেই উন্নতি হবে। নইলে যা আছে তাই থাকবে, বরং অবনতিও হতে পারে। এই কথাগুলো বলা এ কারণে যে, সরয়ার ফারুকির তৃতীয় ছবি যখন মুক্তি পায়, তখন প্রয়াত নির্মাতা তারেক মাসুদ বলেছিলেন, দান দান তিন দানে যেমন আমরা সেরাটা প্রত্যাশা করি, সরয়ার এর কাছেও তাই প্রত্যাশা করি। তবে সেই ছবি দেখার পর তারেক মাসুদের প্রতিক্রিয়া কি হয়েছিলো তা আমার জানা নাই। তাই আমি ঠিক এটা বলতে পারছিনা তৃতীয় দানটা কি তিনি পুরনো দানগুলোর লাভ-ক্ষতি পুষিয়ে দিয়েছিলেন কিনা। এইখানে আমার সন্দেহ রয়েছে। কারণ সেই তৃতীয় দান অতিক্রম করে এখন চতুর্থ দান-এ গিয়ে পরেছেন তিনি। একজন চলচ্চিত্রকার যদি তার চতুর্থ ছবিতে এসেও আশ্চর্য রকম কিছু করতে না পারেন, তাহলে সাধারণত ধরে নিয়ে থাকি সেই চলচ্চিত্রকার আর আশ্চর্যরকম কিছু করতে পারবে না। এ কথা সব ক্ষেত্রেই কাজে দেয় বলে ধারণা করি। যদিও ব্যতিক্রম সব সময়ই হিসেবের বাইরে।
এবার আসি মূল প্রসঙ্গে। ‘টেলিভিশন’ ছবিটি প্রথম প্রিমিয়ার হয়েছে ‘পুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব-২০১২’ তে। তবুও যেনতেন প্রিমিয়ার নয়, ক্লোজিং ফিল্ম হিসেবে তা প্রিমিয়ার হয়েছে। এই ছবি দেখে আমারও (অন্য অনেকের মতো- সেই দলে এই ছবির নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকিও রয়েছেন) প্রিয় নির্মাতা কিম কি দুক বলেছেন, গুড ফিল্ম। পরবর্তিতে দুবাই আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফ্যাস্টিভ্যালে এ ছবি ‘বিশেষ পুরস্কার’ পেয়েছে। এসব কারণে ‘টেলিভিশন’ ছবি নিয়ে আগ্রহ ছিলো। সেই আগ্রহ মেটাতে শুক্রবার বিকেলেই ছবিটি দেখার মনস্থির করেছিলাম। নানান কারণে তা হলো না। শনিবার সন্ধ্যার টিকিট করে সারারাত সারাদিন এর অপেক্ষায় ছিলাম। সিনেমা শুরুর সময় সিনেমার টাইটেল প্রেজেন্টেশন ভালো লেগেছে। ছবির রিভিউ পড়ার সুবাদে গল্পটি জেনে গিয়েছিলাম আগেই। যা জেনেছি তাতে মনে হৈছে এই ছবির বাংলাদেশী কোনও প্রিমিয়ার হৈলে ছবিটা দর্শকদের কাছ থেকে গ্রহণযোগ্যতা এখন যতটুকু পাচ্ছে তার চেয়ে হয়তো একটু কম পেতো। ছবির গল্প মোটামোটি এই- একজন ধর্মান্ধ চেয়ারম্যান (ধর্মভিরু বলবো না এই কারণে যে, ধর্ম ভিরুরা কখনোই ধর্ম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে না, কেবল নিজে বাঁচার জন্য ধর্মের আশ্রয় নেয়। অপরদিকে ধর্মান্ধরা ধর্মকে ঢাল করে চারপাশে ধর্মের লৌকিক জগত তৈরি করতে চায়। এই ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র আমার ধারণা তাই করেছে। এ কারণেই তিনি ধর্মান্ধ) নিজের গ্রামে টেলিভিশন নিষিদ্ধ করেছে। তার ধারণা টেলিভিশন দেখলেই মানুষ নষ্ট হয়ে যাবে। এই টেলিভিশনের কাছেই তাকে শেষ পর্যন্ত পরাজিত হইতে হয়। মাঝখানে আছে প্রেম, সংগ্রাম, আর কিছুটা ড্রামা। এইসব বিস্তারিত বলার তেমন ইচ্ছাই হইতেছে না। ছবিটা নিয়া যে লিখতে বসছি তার কারণ অন্য। তার কারণ হৈলো এই ছবিটার প্রত্যাশার পারদ এত বেশী উড়ছিলো যে, তেমনি কইরা পারদ গইল্যা কুয়াশা হৈয়া গেছে। ছবির গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ঐ চেয়ারম্যান এতই ধর্মান্ধ যে পাসপোর্ট করতে ছবি তুলতে হবে বলে সে হজ্জ্ব করতে যেতে চায় না। কিন্তু এই ছবির দুই গল্পকার ভুলে যায় চেয়াম্যান নির্বাচন করতে হলে যে মনোনয়ন পত্র জমা দিতে হয় তাতে প্রার্থীর ছবি দিতেই হবে। না দিলে মনোনয়ন বাতিল। যে গ্রামে টেলিভিশন চলে না সেই গ্রামে ইন্টারনেট চলে। টেলিভিশনের চেয়ে যে ইন্টারনেট নষ্ট হয়ে যাওয়ার জন্য আরও ভয়ঙ্কর তা তো বলার অপেক্ষাই রাখে না। এমন কন্ট্রাডিকশন নিয়ে ছবির গল্প। ছবির প্রথমার্ধে প্রচুর হিউমার। আর এই হিউমারের কারণে প্রথমার্ধে গল্পের চেয়ে আনন্দই বেশী দেয়া বলে মনে হলো। মনে হলো এতই যদি হিউমার আনতে হয় তাহলে কেবল সংলাপ দিয়ে কেনো? নোয়াখালির একটা দ্বীপের মতো অঞ্চল বলেই কি ঐ দ্বীপের মানুষদের কথায় হিউমার বেশী থাকবে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজবো না। কারণ খুঁজে লাভ নেই। এই উত্তর ছবিতে নেই। এই প্রথম অর্ধের ভেতর সিনেমা দেখতে বসছি এই কথা একবারও মনে হয় নাই, কেবল মনে হৈতেছিলো যে সিনেমা দেখতে আসছি কিন্তু সিনেমাটা কখন শুরু হবে? সেই সিনেমা আর শুরু হয় নাই। মাঝে মাঝে ট্রেলার দেখাইয়া আবার তার নিজের স্থানে ফেরত গেছে। অভিনেতা অভিনেত্রীদের অধিকাংশেরই মুখে নোয়াখালি অঞ্চলের ভাষাটা কেমন যেনো মানানসই লাগছিলো না। মনে হচ্ছিলো তারা নোয়াখালীর ভাষাই বলতেছে তবে মুখস্থ করে। চেয়ারম্যান চরিত্রে শাহির হুদা রুমিকে নির্বাচন আমার মোটেও মনপুত হয় নি। এই গল্প কেনো নোয়াখালির হবে তাও ঠিক ততটা স্পষ্ট না। একটা কারণ হিসেবে দাঁড় করানো যায়, তা হলো ঐ দ্বীপ সাম্রাজ্যের প্রসঙ্গ। কিন্তু সেই প্রসঙ্গ ধূপে টেকে না কারণ, যে এই ক্ষমতাটা দেখাতে পারে সে সবখানেই পারে। যেই গল্পটি এই ছবিতে বলা হয়েছে, সুদূর গ্রামের গল্প যেখানে টেলিভিশন ও মোবাইল ফোনই রীতিমত আন-এভিইলেবল, সেই গল্প বলার জন্য আধুনিক ব্যান্ড শিল্পীদের মিউজিকে করা একেরপর এক গান অন্যদের কেমন লেগেছে তা আমার জানা নাই। ছবিতে ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর খুঁজেই পাই নাই। ছবির সিনেমাটোগ্রাফি আরামদায়ক ছিলো। লাইট চমৎকার, কম্পোজিশনও বেশ ভালো। কিন্তু বারবার যে জিনিসটি মিস করতেছিলাম তা হৈলো ঐ সিনেমা সিনেমা ভাব। আজকে যখন অফিসে কথা হচ্ছিলো টেলিভিশন নিয়ে, তখন একজন বললো তার মেয়ে ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’ সিনেমা দেখার পর নাকি বলছিলো টেলিফিল্ম দেখতেছে। আমি একটা জায়গা ভেবে প্রতিবাদ করি নি। কারণ, টিভির নির্মাতারা সিনেমা বানাতে গেলে তারা টিভির যে চর্চা, ঐ চর্চার মতো করেই সিনেমা বানাতে চায়। আর এ কারণেই সিনেমা দেখার পরও তা টিভি প্রোডাকশন বলে মনে হয়। এই ছবি দেখার পরও আমার তাই মনে হচ্ছিলো। আমি সেই মোস্তফা সরয়ার ফারুকী কেই দেখছি যিনি ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’ ছবির পরিচালক। কিছুটা মুন্সিয়ানা এখানেও দেখিয়েছেন সেটা ঐ প্রত্যাশার পারদ যে উঁচুতে উঠছিলো তা মেটায় নাই। কিছু কিছু আশ্চর্য রকম চিত্রকল্প কিছু কিছু বিরক্তিকর দৃশ্যায়নের সাথে প্লাসে মাইনাসে ছবিটার অনেক ক্ষেত্রেই যোগফল রাখতে সাহস পায় না। তবে ছবির বেশ কিছু জায়গা চোখে লেগে থাকবে তার একটি হলো কুহিনূরের (তিশা) সাথে সোলাইমানের (চঞ্চল) ফোনে কথা বলার দৃশ্য। ফোনটি কোনও এক জায়গায় রেখে দাও, যেন আমি তোমার হাটা চলার শব্দ শুনতে পাই আর মনের ‘টেলিভিশন’ দিয়ে দেখতে পাই তোমারে। অসাধারণ সরয়ার ভাই। আপনি যে পারেন এই দৃশ্যে আপনি তা দেখিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু আপনি বলুনতো, এই দৃশ্যটা যে সিনেমায় থাকে সেই সিনেমাটার অন্যসবকিছু এর আশ-পাশের মানেরও হয়েছে? আমি জানি না। এছাড়া ছবির শেষে যখন আমিন চেয়ারম্যান প্রতারিত হয়ে হোটেলে মাস কাটিয়ে হজ্জ্বের কথা বলে বাড়ি আসবে বলে চিন্তা করে। বা অপেক্ষা করে হজ্জ্ব করে তবেই বাড়ি যাবে, তার যে পরাজয় এই পরাজয় কি কাম্য? এই পরাজয় কি তাকে মাটিতে মিশিয়ে দেয় না? সেই পরাজয়ের গল্প তো তার গ্রামেই সবচেয়ে বেশী অনুভূতিপ্রবণ হতে পারতো। অন্তত আমার তাই মনে হয়। অথবা আমিন চেয়ারম্যানের যে হজ্জ্বের জন্য হাহাকার, তা যত দীর্ঘ সময় দেখানো হয়েছে, এতে করে কি হাহাকার খুব তীব্র বোঝা যায়? আমি বুঝি নি। ছবির অনেক ক্ষেত্রেই মনে হয়েছে আপনি ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর ইচ্ছা করেই এড়িয়ে গেছেন। এই এড়িয়ে যাওয়াকে কি আপনার অন্য কোনও পরিকল্পনা কাজ করেছে? এই পরিকল্পনার কারণে কিন্তু অনেক ভালো ইমোশন ক্রিয়েট করার সুযোগ তৈরি হয়েও হয় নি। তা কি ভালো হলো? এত এত প্রশ্নের উত্তর আমি পাই নি। মনে হয় পাবোও না।
তারপরও ছবিটা হয়তো দেশের বাইরের আরও কিছু ফ্যাস্টিভ্যালে যাবে, কিছু পুরস্কারও পাবে। তবে এ প্রসঙ্গে কিছু না বললেই নয়। তা হলো আমাদের ছবি নিয়ে বড় বড় ফ্যাস্টিভ্যাল কমিটির যে দৃষ্টিভঙ্গিটা থাকে তা হলো, বাংলাদেশ একটা উন্নয়নশীল দেশ, এই দেশের উন্নয়নশীল ছবির জন্য আমরা না হয় একটু সহযোগীতা করলামই। এই দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি আমাদের গল্প ও নিজেদের বিক্রয় করবার যা থাকে তা হলো তাদের মনোযোগ আকর্ষণের ভাবনাগুলো। এই ছবিতে তা করা হয়েছে বলেই মনে হয়েছে আমার। যেই অভিযোগটা তারেক মাসুদকে নিয়েও কেউ কেউ করেছিলো। তার নামে অভিযোগ ছিলো, তারেক মাসুদ ইউরুপের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ছবি বানায়, এ কারণে সেই ছবি সেইসব ফ্যাস্টিভ্যালে প্রশংসিত হয়। এই অভিযোগ পুরুপুরি সত্য না হলেও কিছুটা তার সাথে যায়। যদিও তিনি তা অতিক্রম করেও দেখিয়েছেন। কিন্তু এই ছবিতেও তো একই ভাবনার প্রমাণ পাই। নয়তো ‘টেলিভিশন’ এর গল্প বলতে গিয়ে ধর্মীয় একটি চরিত্রই কেনো শিকার হবে তার?

Read More

বুধবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০১৩

তাইওয়ানের ডিরেক্টর অং-কার ওয়াই এর একটা ছবি দেখতে বসেছিলাম। ছবিটার নাম হ্যাপি টুগেদার। ১৯৯৭ সালে মুক্তি পাওয়া এ ছবি বিশ্বের বেশ কয়েকটি বড় বড় চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার পেয়েছে। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সমালোচকদের কাছ থেকে পেয়ে অনেক প্রশংসাসূচক বাক্য। ছবিটার গল্পের মুল বিষয় হলও প্রেম। কিন্তু এই প্রেম রোমিও-জুলিয়েট, শিরি-ফরহাদ বা রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের মতো তো নয়ই বরং বলা যায়, স্বাভাবিক জীবনের একটি ছেলের সাথে একটি মেয়ের প্রেমের গল্প নয়। গল্পটি একটি ছেলের সাথে একটি ছেলের প্রেমের। আর এই প্রেমের পাশাপাশি এখানে যৌন জীবনও এসে হাজির। একটি ছেলের সাথে একটি ছেলের যখন যৌন জীবনের সম্পর্ক তৈরি হয়, তখন সেটাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বা সমাজ জীবনের চোখে স্বাভাবিক যৌন জীবন হিসেবে উল্লেখ করা হয় না। তখন এই অবস্থাটাকে চিহ্নায়ন করার জন্য পৃথক শব্দ ব্যবহার করা হয়, আর তা হলও ‘সমকাম’। এই সমকাম শুধু ছেলেদের মাঝেই নয়, মেয়েদের মাঝেও রয়েছে। আর এই বিষয়ক একটি জীবনের গল্প নিয়ে আমি প্রথম যে ছবিটি দেখি তা দীপা মেহতার ‘ফায়ার’। এ ছবিতে দুই জন বিবাহিত নারী এই রকম একটি যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। আর সেই চরিত্র দুটো রূপায়ন করেছিলো শাবানা আজমি ও নন্দিতা দাশ। পর্দায় সম-লিঙ্গের যৌন সম্পর্কের ছবি দেখার সেই আমার প্রথম অভিজ্ঞতা। পরবর্তীতে আমি অনেক ছবি দেখেছি যার মাঝে সম-লিঙ্গের সম্পর্কের গল্প রয়েছে। সেইসব ছবির মাঝে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো হলও ‘ব্রোকব্যাক মাউন্টেন’, ‘রোম ইন দ্যা রুম’, ‘দ্যা বোং কানেকশনসহ অনেক। এইসব ছবির পাশে একটা ছেলের সাথে আর একটা ছেলের যৌন সম্পর্কের গল্প আমি দেখেছি ভারতীয় ছবি ‘আই এম’ এ। তবে সেখানকার প্রেক্ষাপটটা আরও ভিন্ন। সেখানে একজন পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ তার স্ত্রীর প্রথম পক্ষের ছেলে শিশুটিকে যৌন নির্যাতন করতো। এই নির্যাতনটা মূলত ঐ শিশুটির জীবনের ভবিষ্যৎ ভাবনায় এক বড় প্রভাব ফেলে পরবর্তীতে। সে মেয়েদেরও এড়িয়ে চলতে চায়। চায় কুৎসিত যৌন জীবনকে অতিক্রম করে একটা নিজের মতো জীবন গড়তে। যদিও সেটা স্বাভাবিক জীবন নয়, কিন্তু সেও এক সময় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। ফিরে আসলেও তার শৈশবের সেইসব নির্যাতনের স্মৃতি তাকে সব সময়ই তাড়িয়ে বেড়ায়। এই সেক্স এবিউজের যে অভিজ্ঞতা এই বিষয়টি নিয়ে আমার দেখা ছবির ভেতর ছবির ভাগ নেই বললেই চলে। স-বেধন নীলমণি ঐ ‘আই এম’। কিন্তু এই বিষয়টি নিয়ে আমার ভাবনা রয়েছে। আমি মনে করি আমাদের সমাজে শিশু ও শৈশবের এমন যৌন নির্যাতনের ফলে নির্যাতিতার মস্তিষ্কে এক ধরণের চাপ তৈরি হয়। আর এই চাপের ফলে সেই শিশুটি যখন প্রাপ্ত বয়স্ক হয় তখনো তার ভেতর এই স্বাভাবিক জীবনের অংশ হিসেবে যৌন জীবন নিয়ে এক ধরণের কমপ্লেক্স কাজ করে। যার ফলে সে মানসিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীনও হতে পারে। আবার উল্টো ফলও দেখা দিতে পারে ঐ প্রাপ্ত বয়স্ক যুবকটির মনে। সে হয়ে উঠতে পারে বিকৃত যৌন মানসিকতার ধারক। আর এর প্রভাব পড়বে সমাজে। সাম্প্রতিক কালে একের পর এক বিশ্রী যৌন অত্যাচারের খবরগুলোও এমনই কোনও বিকৃত যৌন চেতনার ধারকের ফলে হয়ে থাকতে পারে। এর পেছনের কারণ হিসেবে আমি ধারণা করতে পারি শৈশবের যৌন নির্যাতনের শিকারকে। আর এই একটা ছেলের (পূর্ণ বয়স্ক যুবকের) কাছে একটা শিশুর যৌন নির্যাতনের ঘটনা যে আমাদের সমাজেও ঘটছে বা ঘটে আসছে এই বিষয়ে এখন পর্যন্ত সমাজকর্মী বা শিল্পের কোনও শাখাতেই তার প্রকাশ দেখি নি। আমাদের চলচ্চিত্রে তো নয়ই। অথচ তা আসাটাও কিন্তু জরুরী। একটা উদাহরণ দিলেই বিষয়টি সম্পর্কে ধারণা করা যেতে পারে এই নির্যাতনটি কি পরিমাণ ভয়ঙ্কর ও জঘন্য।
বছর দেড়েক আগে আমি তখন দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকায় কাজ করি। মরে যাওয়া পত্রিকাটি তখন নতুন যৌবনের উদ্যম নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছিলো। তখন একদিন হঠাৎ নিউজ ডেস্কে আমার হাতে একটি খবর সম্পাদনের জন্য আসে। খবরটি পরে আমি অনেকটা অবাক হই। খবরটি একটি খুনের ঘটনার। উত্তরায় এক কিশোর কর্তৃক এক মোবাইল ফোন রি-চার্জ ব্যবসায়ী খুন হন। পুলিশ ঐ কিশোর ছেলেটিকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে ছেলেটি তার দোষ স্বীকার করে। খুন হওয়া ব্যক্তিটি একজন মোল্লা টাইপের মানুষ ছিলও। নামাজ পড়তো। মুখ ভর্তি দাড়ি ছিলও। এই লোকটিকে একটা কিশোর ছেলে কেনও খুন করতে পারে বলে মনে হয়? ছেলেটি তার দোকানে কর্মচারীর কাজ করতো। তবে কি ছেলেটিকে লোকটি নির্যাতন করতো? পরিশ্রম বেশী করাতো আর পারিশ্রমিক কম দিতো? এইসব ক্ষেত্রে আমাদের দেশে মানুষ এখনো ততটা হিংস্র হয়ে প্রতিবাদ করে থাকে না। এই খুনের ঘটনার পেছনে যেই নির্যাতনের ঘটনাটি পাওয়া যায় তখন তা হলও ঐ মোল্লা টাইপের লোকটি ঐ ছেলেটিকে যৌন নির্যাতন করতো। এবং ঘটনা এক সময় যখন তার সহ্যের সীমা অতিক্রম করে, তখন ছেলেটি তাকে রাগ বা ঝোঁকের মাথায় খুন করে ফেলে। আমি যখন খবরটি সম্পাদনা করে বার্তা প্রধানের ডেস্কে দিয়ে দেই তিনি তখন এই সংবাদটিকে এক কলামের একটি স্থান বরাদ্দ করতে বলে। আমি তখন প্রতিবাদ করে বলি, এই ধরনের যৌন নির্যাতন দেশে হর হামেশাই হচ্ছে কিন্তু নানান কারণে খবরে আসছে না। কি পরিমাণ জঘন্য অত্যাচারের মুখোমুখি হলে একটা ছেলে একটা মানুষকে খুন করতে পারে এই ঘটনা তার প্রমাণ দেয়। তাই এটা বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। আমার কথায় সেদিন ঐ খবরটি শেষের পাতায় বক্স আইটেম করে প্রকাশিত হয়েছিলো। এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি আমিও হয়েছি। তখন আমি দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ি, আমাদের পাড়ায় আমার সম বয়সী এক বন্ধু তার প্রতিবেশী এক সাহেব কাছে ডাকলে না যাওয়ায় আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। কেন তার কাছে সে যেতে চায় না। সে বলতে চাইতো না। আমি জোর করায় সে হাতের আঙুল দিয়ে এমন কিছু বিশ্রী ইঙ্গিত করেছিলো যে, তাতে আমার বুঝতে বাকি ছিলও না ঐ লোকটির কোনও এক সময়কার লালসার শিকার হয়েছিলো আমার বন্ধুটি। সাম্প্রতিক সময়েও আমি আমার চারপাশের বেশ কিছু বন্ধুদের সাথে কথা বলে জেনেছি, তাদের মাঝেও কেউ কেউ শৈশবে এমন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায় এই নির্যাতনের পদ্ধতিটি একটি ধারাবাহিক ব্যাধির মতো আমরা আমাদের সমাজে বহন করে চলেছি। কিন্তু রোগটি যে আছে সে বিষয়েই সচেতন নই। ডাক্তার দেখাবো কি করে? আমি আমার সেই বন্ধুর অভিজ্ঞতাটার কথা স্মরণ করেছিলাম সম্প্রতি। হিসেব করে দেখলাম, প্রায় কুড়ি বছর আগের ঘটনা। এখনো গা ঘিন ঘিন করে, আমাদের সমাজ এতই কুণ্ঠিত এক বসতি যে আমরা আমাদের গ্লানিকর ঘটনাগুলো পর্যন্ত বলতে সাহস পাই না। কিন্তু এ খাঁচা যে ভাঙতেই হবে। না ভাঙলে এ থেকে যে মুক্তি নেই তা আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। তাই যে ছবিটা আমি প্রথমেই বানাতে চাই, সেই ছবিটা আমি শুধু সেইসব শিশু-তরুণ-যুবকদের গল্প নিয়েই বানাতে চাই। যাতে আমাদের চারপাশের জীবনটাই তার মুখ দেখাবে।

আমি যে ছবিটি বানাতে চাই

at বুধবার, জানুয়ারি ২৩, ২০১৩  |  No comments

তাইওয়ানের ডিরেক্টর অং-কার ওয়াই এর একটা ছবি দেখতে বসেছিলাম। ছবিটার নাম হ্যাপি টুগেদার। ১৯৯৭ সালে মুক্তি পাওয়া এ ছবি বিশ্বের বেশ কয়েকটি বড় বড় চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার পেয়েছে। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সমালোচকদের কাছ থেকে পেয়ে অনেক প্রশংসাসূচক বাক্য। ছবিটার গল্পের মুল বিষয় হলও প্রেম। কিন্তু এই প্রেম রোমিও-জুলিয়েট, শিরি-ফরহাদ বা রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের মতো তো নয়ই বরং বলা যায়, স্বাভাবিক জীবনের একটি ছেলের সাথে একটি মেয়ের প্রেমের গল্প নয়। গল্পটি একটি ছেলের সাথে একটি ছেলের প্রেমের। আর এই প্রেমের পাশাপাশি এখানে যৌন জীবনও এসে হাজির। একটি ছেলের সাথে একটি ছেলের যখন যৌন জীবনের সম্পর্ক তৈরি হয়, তখন সেটাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বা সমাজ জীবনের চোখে স্বাভাবিক যৌন জীবন হিসেবে উল্লেখ করা হয় না। তখন এই অবস্থাটাকে চিহ্নায়ন করার জন্য পৃথক শব্দ ব্যবহার করা হয়, আর তা হলও ‘সমকাম’। এই সমকাম শুধু ছেলেদের মাঝেই নয়, মেয়েদের মাঝেও রয়েছে। আর এই বিষয়ক একটি জীবনের গল্প নিয়ে আমি প্রথম যে ছবিটি দেখি তা দীপা মেহতার ‘ফায়ার’। এ ছবিতে দুই জন বিবাহিত নারী এই রকম একটি যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। আর সেই চরিত্র দুটো রূপায়ন করেছিলো শাবানা আজমি ও নন্দিতা দাশ। পর্দায় সম-লিঙ্গের যৌন সম্পর্কের ছবি দেখার সেই আমার প্রথম অভিজ্ঞতা। পরবর্তীতে আমি অনেক ছবি দেখেছি যার মাঝে সম-লিঙ্গের সম্পর্কের গল্প রয়েছে। সেইসব ছবির মাঝে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো হলও ‘ব্রোকব্যাক মাউন্টেন’, ‘রোম ইন দ্যা রুম’, ‘দ্যা বোং কানেকশনসহ অনেক। এইসব ছবির পাশে একটা ছেলের সাথে আর একটা ছেলের যৌন সম্পর্কের গল্প আমি দেখেছি ভারতীয় ছবি ‘আই এম’ এ। তবে সেখানকার প্রেক্ষাপটটা আরও ভিন্ন। সেখানে একজন পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ তার স্ত্রীর প্রথম পক্ষের ছেলে শিশুটিকে যৌন নির্যাতন করতো। এই নির্যাতনটা মূলত ঐ শিশুটির জীবনের ভবিষ্যৎ ভাবনায় এক বড় প্রভাব ফেলে পরবর্তীতে। সে মেয়েদেরও এড়িয়ে চলতে চায়। চায় কুৎসিত যৌন জীবনকে অতিক্রম করে একটা নিজের মতো জীবন গড়তে। যদিও সেটা স্বাভাবিক জীবন নয়, কিন্তু সেও এক সময় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। ফিরে আসলেও তার শৈশবের সেইসব নির্যাতনের স্মৃতি তাকে সব সময়ই তাড়িয়ে বেড়ায়। এই সেক্স এবিউজের যে অভিজ্ঞতা এই বিষয়টি নিয়ে আমার দেখা ছবির ভেতর ছবির ভাগ নেই বললেই চলে। স-বেধন নীলমণি ঐ ‘আই এম’। কিন্তু এই বিষয়টি নিয়ে আমার ভাবনা রয়েছে। আমি মনে করি আমাদের সমাজে শিশু ও শৈশবের এমন যৌন নির্যাতনের ফলে নির্যাতিতার মস্তিষ্কে এক ধরণের চাপ তৈরি হয়। আর এই চাপের ফলে সেই শিশুটি যখন প্রাপ্ত বয়স্ক হয় তখনো তার ভেতর এই স্বাভাবিক জীবনের অংশ হিসেবে যৌন জীবন নিয়ে এক ধরণের কমপ্লেক্স কাজ করে। যার ফলে সে মানসিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীনও হতে পারে। আবার উল্টো ফলও দেখা দিতে পারে ঐ প্রাপ্ত বয়স্ক যুবকটির মনে। সে হয়ে উঠতে পারে বিকৃত যৌন মানসিকতার ধারক। আর এর প্রভাব পড়বে সমাজে। সাম্প্রতিক কালে একের পর এক বিশ্রী যৌন অত্যাচারের খবরগুলোও এমনই কোনও বিকৃত যৌন চেতনার ধারকের ফলে হয়ে থাকতে পারে। এর পেছনের কারণ হিসেবে আমি ধারণা করতে পারি শৈশবের যৌন নির্যাতনের শিকারকে। আর এই একটা ছেলের (পূর্ণ বয়স্ক যুবকের) কাছে একটা শিশুর যৌন নির্যাতনের ঘটনা যে আমাদের সমাজেও ঘটছে বা ঘটে আসছে এই বিষয়ে এখন পর্যন্ত সমাজকর্মী বা শিল্পের কোনও শাখাতেই তার প্রকাশ দেখি নি। আমাদের চলচ্চিত্রে তো নয়ই। অথচ তা আসাটাও কিন্তু জরুরী। একটা উদাহরণ দিলেই বিষয়টি সম্পর্কে ধারণা করা যেতে পারে এই নির্যাতনটি কি পরিমাণ ভয়ঙ্কর ও জঘন্য।
বছর দেড়েক আগে আমি তখন দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকায় কাজ করি। মরে যাওয়া পত্রিকাটি তখন নতুন যৌবনের উদ্যম নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছিলো। তখন একদিন হঠাৎ নিউজ ডেস্কে আমার হাতে একটি খবর সম্পাদনের জন্য আসে। খবরটি পরে আমি অনেকটা অবাক হই। খবরটি একটি খুনের ঘটনার। উত্তরায় এক কিশোর কর্তৃক এক মোবাইল ফোন রি-চার্জ ব্যবসায়ী খুন হন। পুলিশ ঐ কিশোর ছেলেটিকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে ছেলেটি তার দোষ স্বীকার করে। খুন হওয়া ব্যক্তিটি একজন মোল্লা টাইপের মানুষ ছিলও। নামাজ পড়তো। মুখ ভর্তি দাড়ি ছিলও। এই লোকটিকে একটা কিশোর ছেলে কেনও খুন করতে পারে বলে মনে হয়? ছেলেটি তার দোকানে কর্মচারীর কাজ করতো। তবে কি ছেলেটিকে লোকটি নির্যাতন করতো? পরিশ্রম বেশী করাতো আর পারিশ্রমিক কম দিতো? এইসব ক্ষেত্রে আমাদের দেশে মানুষ এখনো ততটা হিংস্র হয়ে প্রতিবাদ করে থাকে না। এই খুনের ঘটনার পেছনে যেই নির্যাতনের ঘটনাটি পাওয়া যায় তখন তা হলও ঐ মোল্লা টাইপের লোকটি ঐ ছেলেটিকে যৌন নির্যাতন করতো। এবং ঘটনা এক সময় যখন তার সহ্যের সীমা অতিক্রম করে, তখন ছেলেটি তাকে রাগ বা ঝোঁকের মাথায় খুন করে ফেলে। আমি যখন খবরটি সম্পাদনা করে বার্তা প্রধানের ডেস্কে দিয়ে দেই তিনি তখন এই সংবাদটিকে এক কলামের একটি স্থান বরাদ্দ করতে বলে। আমি তখন প্রতিবাদ করে বলি, এই ধরনের যৌন নির্যাতন দেশে হর হামেশাই হচ্ছে কিন্তু নানান কারণে খবরে আসছে না। কি পরিমাণ জঘন্য অত্যাচারের মুখোমুখি হলে একটা ছেলে একটা মানুষকে খুন করতে পারে এই ঘটনা তার প্রমাণ দেয়। তাই এটা বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। আমার কথায় সেদিন ঐ খবরটি শেষের পাতায় বক্স আইটেম করে প্রকাশিত হয়েছিলো। এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি আমিও হয়েছি। তখন আমি দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ি, আমাদের পাড়ায় আমার সম বয়সী এক বন্ধু তার প্রতিবেশী এক সাহেব কাছে ডাকলে না যাওয়ায় আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। কেন তার কাছে সে যেতে চায় না। সে বলতে চাইতো না। আমি জোর করায় সে হাতের আঙুল দিয়ে এমন কিছু বিশ্রী ইঙ্গিত করেছিলো যে, তাতে আমার বুঝতে বাকি ছিলও না ঐ লোকটির কোনও এক সময়কার লালসার শিকার হয়েছিলো আমার বন্ধুটি। সাম্প্রতিক সময়েও আমি আমার চারপাশের বেশ কিছু বন্ধুদের সাথে কথা বলে জেনেছি, তাদের মাঝেও কেউ কেউ শৈশবে এমন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায় এই নির্যাতনের পদ্ধতিটি একটি ধারাবাহিক ব্যাধির মতো আমরা আমাদের সমাজে বহন করে চলেছি। কিন্তু রোগটি যে আছে সে বিষয়েই সচেতন নই। ডাক্তার দেখাবো কি করে? আমি আমার সেই বন্ধুর অভিজ্ঞতাটার কথা স্মরণ করেছিলাম সম্প্রতি। হিসেব করে দেখলাম, প্রায় কুড়ি বছর আগের ঘটনা। এখনো গা ঘিন ঘিন করে, আমাদের সমাজ এতই কুণ্ঠিত এক বসতি যে আমরা আমাদের গ্লানিকর ঘটনাগুলো পর্যন্ত বলতে সাহস পাই না। কিন্তু এ খাঁচা যে ভাঙতেই হবে। না ভাঙলে এ থেকে যে মুক্তি নেই তা আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। তাই যে ছবিটা আমি প্রথমেই বানাতে চাই, সেই ছবিটা আমি শুধু সেইসব শিশু-তরুণ-যুবকদের গল্প নিয়েই বানাতে চাই। যাতে আমাদের চারপাশের জীবনটাই তার মুখ দেখাবে।

Read More

রবিবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০১৩

পাখি আমার বরাবরই ভালো লাগে। ছেলেবেলায় বাড়িতে পাখি পোষা হতো। পাখি আমার কাছে আত্মিয়-বন্ধুর মতো। যখন খুব ছোট ছিলাম বাসায় বসেই পড়াশোনা করতে হতো, স্কুলে যাওয়ার বয়স হয় নি তখন আমার বন্ধু ছিলো একটি টিয়া পাখি ও একটি ময়না পাখি। তবে তারা পৃথক সময়ে আমার বন্ধু হয়েছিলো। বনের পাখি পোষ মানে, মানুষের মন মানে না। এই বাক্য শিখেছিলাম তখনই, যখন আমাদের পোষ মানা পাখিগুলো মানুষ ধরে নিয়ে যেতো। সেই থেকে আমি একার বন্ধুকে হারিয়ে পাখি বন্ধুর নাম ভুলে যেতে চেয়ে ছিলাম। এইভাবেই দিন কাটে, বয়স বাড়ে, স্কুলে পড়ি। স্কুলের/ পাড়ার বন্ধুদের সময় ও সঙ্গ অতিক্রম করে চেষ্টা করি নিজেকে অতিক্রম করতে। কিন্তু পারি না। কোথায় যেনো একটা শূন্যতা। সেই শূন্যতার বাস এখনো রয়ে গেছে। কিন্তু আমার পাখি প্রেম কমে নি। বলতে পারি, ইনাম আল হকের মতো পাখি প্রেমিক আমি নই। আমার প্রেমটা গোপনে আরও গোপনে। আমি ভালোবাসি একজোড়া পাখি। একটা নই। আর এজন্য ভালোবাসি মানুষ। সেই পাখির মতো, পাখির গল্পের মতো। কিন্তু সেই জোড়া পাখির দেখা তো নেই চারপাশে।
হ্যা, সেই একজোড়া পাখির স্বপ্ন আমি দেখি। স্বপ্ন দেখি একজোড়া মুনিয়ার জনক আমি। যে মুনিয়াগুলো খাঁচায় নয় খোলা বাতাসেই বসবাস করে। উড়ে বেড়ায়। একদিন একজনকে বলেছিলাম, আমার একজোড়া মুনিয়ার জননী হবি? সে পাখিগুলোর জননী হতে রাজি ছিলো, কিন্তু পাখিগুলো তখন তার হয়ে যাবে, আমার কিছুই থাকবে না বলে শর্ত দিয়েছিলো। আমি সেই শর্তে তাঁকে পাখিগুলোর জননীর অধিকার দিতে পারি নি। তাই এখনো পাখিগুলো আমার হতে পারলো না, আমাদের হতে পারলো না। এই আক্ষেপ প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যা আমার বারান্দাজুড়ে এসে হানা দেয়। বারান্দার যন্ত্রণায় আমি কাতর হই।
সেই পাখি... হ্যা, পাখিদের নিয়ে এবার খেলা। নাম এ্যাংরি বার্ডস। খেলাটির পেছনে পাখিগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পেছনের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানলাম, অস্তিত্বের সংকটটা সেখানে বড় তীব্র। নিজেদের বাঁচিয়ে শত্রুদের ধ্বংস করার লক্ষ্যে তারা প্রতিবার ঝাপিয়ে পড়ে। ভাবে, আমি ধ্বংস হয়ে যাই তাতে আপত্তি নেই। আমার মাধ্যমে যদি শত্রুও ধ্বংস হয় তবে হয়তো আমার ভাই-বন্ধুরা বেঁচে যাবে। এই নিজেকে বিসর্জনের সাহস আর মানসিকতার কারণে তোমার নাম “এ্যাংরি বার্ডস”।

‘এ্যাংরি বার্ডস’ কেমন আছো?
আজ তোমাকে যে কবিতাটা পাঠিয়েছি, এই কবিতাটা তোমাকে নিয়ে ভাবতে বসে লিখা। সত্যি বলছি, তোমাকে যখন মাঝে মাঝে টেক্সট পাঠাই। উত্তর পেলে মনে হয় এ আমার বহু পরিচিত এক বন্ধু। মনে হয় তার হাত ধরে বহুদিন আমি অচেনা রাস্তায় হেঁটে গেছি গন্তব্য না জেনেই। আর তাই মাঝে মাঝে তোমাকে বলতে ইচ্ছে করে গোপন সব পাপ ও ব্যার্থতার হিসেব। অথচ তোমার ব্যস্ততার পরিসীমা নেই। এ নিয়ে অভিযোগ নেই। যতটুকু অনুভূতি প্রকাশে তুমি প্রশ্রয় দিয়েছো এতটুকুও যে এখন বন্ধুরা দেয় না। তারা তো ‘দূরের মানুষ’ হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন। নাকি আমিই সেই পাখি প্রেমিকটি আর নেই? ঠিক বলতে পারবো না। তবে একটি কথা আমি ঠিকই বলতে পারবো, তোমার প্রশ্রয় দক্ষিণের বারান্দা আর জোড়া মুনিয়ার জন্য হাকার করবে না।

‘এ্যাংরি বার্ড'কে চিঠি

at রবিবার, জানুয়ারি ১৩, ২০১৩  |  No comments

পাখি আমার বরাবরই ভালো লাগে। ছেলেবেলায় বাড়িতে পাখি পোষা হতো। পাখি আমার কাছে আত্মিয়-বন্ধুর মতো। যখন খুব ছোট ছিলাম বাসায় বসেই পড়াশোনা করতে হতো, স্কুলে যাওয়ার বয়স হয় নি তখন আমার বন্ধু ছিলো একটি টিয়া পাখি ও একটি ময়না পাখি। তবে তারা পৃথক সময়ে আমার বন্ধু হয়েছিলো। বনের পাখি পোষ মানে, মানুষের মন মানে না। এই বাক্য শিখেছিলাম তখনই, যখন আমাদের পোষ মানা পাখিগুলো মানুষ ধরে নিয়ে যেতো। সেই থেকে আমি একার বন্ধুকে হারিয়ে পাখি বন্ধুর নাম ভুলে যেতে চেয়ে ছিলাম। এইভাবেই দিন কাটে, বয়স বাড়ে, স্কুলে পড়ি। স্কুলের/ পাড়ার বন্ধুদের সময় ও সঙ্গ অতিক্রম করে চেষ্টা করি নিজেকে অতিক্রম করতে। কিন্তু পারি না। কোথায় যেনো একটা শূন্যতা। সেই শূন্যতার বাস এখনো রয়ে গেছে। কিন্তু আমার পাখি প্রেম কমে নি। বলতে পারি, ইনাম আল হকের মতো পাখি প্রেমিক আমি নই। আমার প্রেমটা গোপনে আরও গোপনে। আমি ভালোবাসি একজোড়া পাখি। একটা নই। আর এজন্য ভালোবাসি মানুষ। সেই পাখির মতো, পাখির গল্পের মতো। কিন্তু সেই জোড়া পাখির দেখা তো নেই চারপাশে।
হ্যা, সেই একজোড়া পাখির স্বপ্ন আমি দেখি। স্বপ্ন দেখি একজোড়া মুনিয়ার জনক আমি। যে মুনিয়াগুলো খাঁচায় নয় খোলা বাতাসেই বসবাস করে। উড়ে বেড়ায়। একদিন একজনকে বলেছিলাম, আমার একজোড়া মুনিয়ার জননী হবি? সে পাখিগুলোর জননী হতে রাজি ছিলো, কিন্তু পাখিগুলো তখন তার হয়ে যাবে, আমার কিছুই থাকবে না বলে শর্ত দিয়েছিলো। আমি সেই শর্তে তাঁকে পাখিগুলোর জননীর অধিকার দিতে পারি নি। তাই এখনো পাখিগুলো আমার হতে পারলো না, আমাদের হতে পারলো না। এই আক্ষেপ প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যা আমার বারান্দাজুড়ে এসে হানা দেয়। বারান্দার যন্ত্রণায় আমি কাতর হই।
সেই পাখি... হ্যা, পাখিদের নিয়ে এবার খেলা। নাম এ্যাংরি বার্ডস। খেলাটির পেছনে পাখিগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পেছনের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানলাম, অস্তিত্বের সংকটটা সেখানে বড় তীব্র। নিজেদের বাঁচিয়ে শত্রুদের ধ্বংস করার লক্ষ্যে তারা প্রতিবার ঝাপিয়ে পড়ে। ভাবে, আমি ধ্বংস হয়ে যাই তাতে আপত্তি নেই। আমার মাধ্যমে যদি শত্রুও ধ্বংস হয় তবে হয়তো আমার ভাই-বন্ধুরা বেঁচে যাবে। এই নিজেকে বিসর্জনের সাহস আর মানসিকতার কারণে তোমার নাম “এ্যাংরি বার্ডস”।

‘এ্যাংরি বার্ডস’ কেমন আছো?
আজ তোমাকে যে কবিতাটা পাঠিয়েছি, এই কবিতাটা তোমাকে নিয়ে ভাবতে বসে লিখা। সত্যি বলছি, তোমাকে যখন মাঝে মাঝে টেক্সট পাঠাই। উত্তর পেলে মনে হয় এ আমার বহু পরিচিত এক বন্ধু। মনে হয় তার হাত ধরে বহুদিন আমি অচেনা রাস্তায় হেঁটে গেছি গন্তব্য না জেনেই। আর তাই মাঝে মাঝে তোমাকে বলতে ইচ্ছে করে গোপন সব পাপ ও ব্যার্থতার হিসেব। অথচ তোমার ব্যস্ততার পরিসীমা নেই। এ নিয়ে অভিযোগ নেই। যতটুকু অনুভূতি প্রকাশে তুমি প্রশ্রয় দিয়েছো এতটুকুও যে এখন বন্ধুরা দেয় না। তারা তো ‘দূরের মানুষ’ হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন। নাকি আমিই সেই পাখি প্রেমিকটি আর নেই? ঠিক বলতে পারবো না। তবে একটি কথা আমি ঠিকই বলতে পারবো, তোমার প্রশ্রয় দক্ষিণের বারান্দা আর জোড়া মুনিয়ার জন্য হাকার করবে না।

Read More

শনিবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০১২

নাট্য পরিচালক হিসেবে পরিচালিত রেদওয়ান রনির প্রথম চলচ্চিত্র ‘চোরাবালি’। এই নির্মাতার নাটকগুলো যেমন বিনোদনের খোরাক জুগিয়েছে, তেমন নাটকের ট্রাডিশনাল গল্পের বাইরে কিছু ব্যতিক্রম গল্পও উপহার দিয়েছে। নাট্যনির্মাতা হিসেবে রনির পথচলাটা বেশ কয়েকবছরের। বলতে গেলে তা প্রায় ছয় সাত বছরেরও বেশী। এই দীর্ঘ সময়ের মাঝে এই নির্মাতা সিনেমা বানানোর স্বপ্নই লালন করেছেন কেবল। তার প্রথম ছবির সংলাপ ‘চোরাবালিতে পড়লে কেউ উঠতে পারে না’র মতোই এই সে ছবি বানানোর স্বপ্নে ছিলেন। সেই ছবি ‘চোরাবালি’। ভিডিও পাইরেসি বা টেলিভিশন প্রিমিয়ারের ধার না ধরে সিনেমাহলেই তিনি মুক্তি দিলেন। আমিও প্রিমিয়ারে যাওয়ার সুযোগ মিস করের গাটের টাকা খরচ করেই সেই ছবি দেখে এসেছি। ছবি দেখার পর এক কথায় যদি আমাকে কেউ প্রশ্ন করেন কেমন ছবি? আমি বলবো আপনার ছবিটা সিনেমা হলে দেখা উচিত। ভালো মন্দের প্রশ্ন পরে। সে আলোচনার প্রসঙ্গ আরও পরে। তার কারণ বাংলাদেশের সিনেমা শিল্পের মুমূর্ষু পরিস্থিতিতে বেঁচে উঠার সম্ভাবনা নিয়ে এই ছবি একটা মাইলফলক না হলেও বেশ বড় অবদান নিয়ে দাঁড়াবে বলেই ছবিটা আপনার দেখা উচিত। ছবিটা কেন দেখবেন? এই প্রশ্নের উত্তরগুলো আমি আগে দেই। প্রথমত ছবিটা সবার জন্য নির্মিত। দ্বিতীয়ত ছবিটা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের নবতর সূচনার সম্ভাবনাময় একটি ছবি। ছবিটিতে মিউজিক করেছেন আইয়ুব বাচ্চু ও অনপমের মতো শিল্পী। তাদের গান শোনার জন্য ছবি। কলকাতার অভিনেতা ইন্দ্রনীল অভিনয় করেছেন তার জন্য। সবার আগে যে কারণে এই ছবিটা দেখবেন, তা হলো যেই দেশে কলকাতার জঘন্য ছবিগুলো এসে বাজার দখল করতে চেষ্টা করছে, বলিউডের নজরকাড়া নায়ক-নায়িকার ছবি এসে সিনেমাহল দখল করতে চাইছে, সেই সময় বাংলাদেশের তরুণ পরিচালকের একটি ছবি। এসব কারণেই তো ছবিটা দেখাই উচিত আপনার। তাই ছবিটা দেখতেই বলবো আপনাকে। আপনি যদি এই ছবি দেখেন আগামী পাঁচ বছরে এর চেয়ে ভালো ছবি আপনি আপনার সিনেমাহলেই দেখতে পাবেন। আর তার জন্যও এই ছবি আপনাকে সিনেমাহলে গিয়েই দেখতে হবে।
এবার আসি ছবির ভেতরে। ছবির জার্নিটা ছিলো তিন বছরের। মানে ২০১০ এর শেষ দিকে রেদওয়ান রনির ঘোষণা আসে সে ছবি বানাবে। ২০১১ অতিক্রম করে ২০১২’র শেষ মাসের তৃতীয় সপ্তাহে এসে এই ছবি মুক্তি পেয়েছে। এই দীর্ঘ যাত্রায় রনি নিজে যে ছবির গল্প দাঁড় করিয়েছে তার বেশ কিছু জায়গায় আমার ঘোর আপত্তি আছে। প্রথমত এমন আন্ডারগ্রাউন্ড স্টোরি নিয়ে বাংলাদেশের নিয়মিত নির্মাতারা একাধিক ছবি বানিয়েছে। কিন্তু সেসব সিনেমা সিনেমার ধারে কাছেও না যাওয়ায়, রেদওয়ান রনির কাছে এই জায়গায় প্রত্যাশা আরও বেশী ছিলো। সে প্রত্যাশা পুরোপুরি পুরণ করতে পারেন নি তিনি। তবে তিনি যে পদ্ধতিতে শুরু করেছেন, তার জন্য তাঁকে সাধুবাদ। ছবির গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র সুমন (ইন্দ্রনীল) একজন প্রফেশনাল খুনি। যে কিনা তার গডফাদার (শহীদুজ্জামান সেলিম) এর পোশা মানুষ। খুন করা তার কাছে ডালভাত। কারণ, বারো/তেরো বছরেই সে একাধিক খুন করেছে। প্রথম খুনটা সে করে তার মা’র ধর্ষণকারী স্থানীয় চেয়ারম্যানকে। দ্বিতীয় খুন করে বস্তির এক ড্রাগ ব্যবসায়ী তাঁর মাকে বেশ্যা বলায়। দ্বিতীয় খুনের পরই সে চলে আসে তাঁর গডফাদারের হাওলায়। তার ছত্রছায়ায় তার আর খুনের কোনও হিসাব থাকেনা তখন। এমন একজন খুনী কিনা পেছন থেকে একজন প্রেগনেন্ট মহিলাকে খুন করেই তার ১৩/১৪ বছরের খুনী জীবন থেকে বেড়িয়ে আসতে পারবে? অবিশ্বাস্য হলেও এমন ঘটনাই ঘটেছে এই ছবিতে। এই ইন্দ্রনীল এই খুনের পর থেকে ছবির গল্পে পরিবর্তন আসতে থাকে। গল্পে সে ভিলেন থেকে নায়ক হতে থাকে। যদিও ছবিতে কেন্দ্রীয় নায়ক চরিত্র বলে আসলে তেমন কাউকে পাওয়া যায় না। ইন্দ্রনীলের করা সুমন চরিত্র সিনেমার প্রথমভাগেও কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে দাঁড়াতে পারে না। যতটা দাঁড়ায় সেলিমের করা চরিত্র। ছবির অধিকাংশ সময়ই মনে হয় সুমন চরিত্রটি কেবল একটি ক্রীড়নক মাত্র। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে এসে সুমনের নায়ক হওয়ার প্রচেষ্টা দেখা যায়। দেখা যায় সে আর খুনী থাকতে চায় না। ভালো মানুষ হতে চায়। ছবির নায়িকা নাবিলার (জয়া) চরত্রিটিও তেমন চ্যালেঞ্জিং হওয়ার কথা ছিলো, ততটা চ্যালেঞ্জিং হয় নি। টেলিভিশনের নিয়মিত নিয়ম ভাঙা জয়া এখানে অনুপস্থিত। কিন্তু ছোট চরিত্র হলেও এই ছবিতে নিজের মতো শক্তি আর চমৎকারিত্ব নিয়ে হাজির হয়েছেন এটিএম সামসুজ্জামান। তাঁর ক্ষমতা তিনি পরিমিতই দেখিয়েছেন। পরিমিত অভিনয় ক্ষমতা দেখিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন সব কিছু পরিমিত হওয়াই বাঞ্ছনিয়, অতিরঞ্জিত নয়। ঠিক এই কাজটিই করেছেন অভিনেতা শহীদুজ্জামান সেলিম। শক্তিমান অভিনেতা হিসেবে তার প্রতিষ্ঠা পরিচিতি থাকলেও সিনেমায় অভিনয়ের যে ভিন্ন একটা আবেদন আছে, তা তার অভিনয়ে পাওয়া যায় নি। বরং তার অভিনয়ে যা পাওয়া গেছে তা হলো তার অতিঅভিনয়ের বাড়াবাড়ি। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রই বলতে গেলে তা। আর তা এই অভিনেতার বাড়াবাড়ির কারণে এক প্রকার নষ্টই হয়েছে। খুব সীমিত পরিসরে চমৎকার অভিনয় করেছে হুমায়ূন সাধু। তাঁকে সাধুবাদ। ছবির প্রথম অর্ধ যখন শেষই হচ্ছে না তখন আমার মনে হচ্ছিলো ছবির গল্প অনেক বড়। আর এই গল্প দ্বিতীয়ার্ধে এসে কিনা কেমন জানি খাপছাড়া খাপছাড়া মনে হচ্ছিলো। ইন্দ্রনিলের করা চরিত্রটির ট্রান্সপোর্টেশন খুব দুর্বল। প্রকৃত অর্থে কেবল ইন্দ্রনিলকে নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যেই এই ট্রান্সপোর্টেশন। কিন্তু এই ট্রান্সপোর্টেশনটা আরও মজবুত হলে ছবি দেখে আরও উপভোগ করা যেতো। দুইঘন্টার ছবি দেখে ছবিতে সবচেয়ে বেশী যে জিনিসগুলো আমার কাছে আকর্ষনীয় মনে হয়েছে তার মাঝে হলো ইন্দ্রনীলের ফ্লাশব্যাক। এই সময়টার কালারটোন ছিলো ভিন্ন। অতীতের গল্প বলার জন্য সেপিয়া টোন ব্যবহার করেছে পরিচালক। তারচেয়ে বড় কথা এই সময়টার নির্মাণ কৌশলেই পাওয়া গেছে চলচ্চিত্রকার রেদওয়ান রনিকে। বাকি সময়টায় রনি ছিলো ট্রাডিশনাল টিভি নাট্য পরিচালকের মতোই।
এছাড়া এই ছবির সবচে বড় দুর্বলতা ছিলো সংলাপে। সংলাপ আরও কি চমৎকারই না হতে পারতো। এই আক্ষেপের সাথে আরও একটা আক্ষেপ বড় ভুগিয়েছে তা হলো ছবির কন্টিনিটি। ইন্দ্রনীলকে যে পিস্তলটা শহীদুজ্জামান সেলিম সেই কবে উপহার দিয়েছিলো এই পিস্তলটাই তার সাথে থাকার কথা। কিন্তু এই পিস্তলটার স্থলে ভিন্ন সময় ভিন্ন পিস্তল কি চোখে পড়েছে? আমি আমার পাশের দর্শককে জিজ্ঞেস করায় সেও সায় দিলো এই স্থানে। এমন ছোটখাটো বেশকিছু ভুল আছে সেগুলোকে অতিক্রম করার জন্য ছিলো চমৎকার ব্যকগ্রাউন্ড মিউজিক স্কোর। অরিজিনাল স্কোরের চেয়ে গল্পের সাথে ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর মানিয়েছে চমৎকার। আর একটা আইটেম গান? প্রাণহীন একটা মেয়ে আর একদল ছেলের শরীর দেখালেই কি আইটেম গান হয়? তাও আর গল্পের সাথে কোনও সামঞ্জস্য না রেখে হুট করে দিলেই হলো? তাহলে এই আইটেম গানটা ছবিতে ব্যবহার না করে কেবল মার্কেটিং এ ব্যবহার করলেও ছবির দর্শক আগ্রহী হতো বলে আমার মনে হয়।
ছবির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবচে বিরক্তিকর বিষয় হৈলো ইন্দ্রনীলের লিপে শতাব্দী ওয়াদুদের কন্ঠ আর মডেল কন্যার কণ্ঠে দীপা খন্দকারের কণ্ঠ। একদমই মানায়নাই বলে মনে হৈছে আমার।
এতকিছুর পরও আমি এই পরিচালককে নিয়ে আসাবাদী। আমি চাইবো রেদওয়ান রনি নিয়মিত ছবিই বানাক। আর নাটক না বানিয়ে এর চেয়ে ভালো ছবিই বানাক। তখন একই ছবি বারবার দেখার জন্য আমিই সিনেমাহলে যাবো। আমার মনে হয় এর চেয়ে আর একটু ভালো হলে আমার মতো দর্শক আরও তৈরি হবে। একই ছবি বারবার দেখার জন্য সিনেমাহলে যাবে। আর তা না হলে চলচ্চিত্র শিল্প যে অপারেশন টেবিলে এখন আছে, সেখান থেকে সে আর সুস্থ্য হয়ে ফিরে আসতে পারবে না। আর ভালো ছবি হলে চলচ্চিত্র উঠে দাঁড়াবে, হাসবে খেলবে। যা খুব প্রয়োজন আমাদের জন্য।

‘চোরাবালি’ দর্শনের ভুল-ভাল

at শনিবার, ডিসেম্বর ২২, ২০১২  |  1 comment

নাট্য পরিচালক হিসেবে পরিচালিত রেদওয়ান রনির প্রথম চলচ্চিত্র ‘চোরাবালি’। এই নির্মাতার নাটকগুলো যেমন বিনোদনের খোরাক জুগিয়েছে, তেমন নাটকের ট্রাডিশনাল গল্পের বাইরে কিছু ব্যতিক্রম গল্পও উপহার দিয়েছে। নাট্যনির্মাতা হিসেবে রনির পথচলাটা বেশ কয়েকবছরের। বলতে গেলে তা প্রায় ছয় সাত বছরেরও বেশী। এই দীর্ঘ সময়ের মাঝে এই নির্মাতা সিনেমা বানানোর স্বপ্নই লালন করেছেন কেবল। তার প্রথম ছবির সংলাপ ‘চোরাবালিতে পড়লে কেউ উঠতে পারে না’র মতোই এই সে ছবি বানানোর স্বপ্নে ছিলেন। সেই ছবি ‘চোরাবালি’। ভিডিও পাইরেসি বা টেলিভিশন প্রিমিয়ারের ধার না ধরে সিনেমাহলেই তিনি মুক্তি দিলেন। আমিও প্রিমিয়ারে যাওয়ার সুযোগ মিস করের গাটের টাকা খরচ করেই সেই ছবি দেখে এসেছি। ছবি দেখার পর এক কথায় যদি আমাকে কেউ প্রশ্ন করেন কেমন ছবি? আমি বলবো আপনার ছবিটা সিনেমা হলে দেখা উচিত। ভালো মন্দের প্রশ্ন পরে। সে আলোচনার প্রসঙ্গ আরও পরে। তার কারণ বাংলাদেশের সিনেমা শিল্পের মুমূর্ষু পরিস্থিতিতে বেঁচে উঠার সম্ভাবনা নিয়ে এই ছবি একটা মাইলফলক না হলেও বেশ বড় অবদান নিয়ে দাঁড়াবে বলেই ছবিটা আপনার দেখা উচিত। ছবিটা কেন দেখবেন? এই প্রশ্নের উত্তরগুলো আমি আগে দেই। প্রথমত ছবিটা সবার জন্য নির্মিত। দ্বিতীয়ত ছবিটা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের নবতর সূচনার সম্ভাবনাময় একটি ছবি। ছবিটিতে মিউজিক করেছেন আইয়ুব বাচ্চু ও অনপমের মতো শিল্পী। তাদের গান শোনার জন্য ছবি। কলকাতার অভিনেতা ইন্দ্রনীল অভিনয় করেছেন তার জন্য। সবার আগে যে কারণে এই ছবিটা দেখবেন, তা হলো যেই দেশে কলকাতার জঘন্য ছবিগুলো এসে বাজার দখল করতে চেষ্টা করছে, বলিউডের নজরকাড়া নায়ক-নায়িকার ছবি এসে সিনেমাহল দখল করতে চাইছে, সেই সময় বাংলাদেশের তরুণ পরিচালকের একটি ছবি। এসব কারণেই তো ছবিটা দেখাই উচিত আপনার। তাই ছবিটা দেখতেই বলবো আপনাকে। আপনি যদি এই ছবি দেখেন আগামী পাঁচ বছরে এর চেয়ে ভালো ছবি আপনি আপনার সিনেমাহলেই দেখতে পাবেন। আর তার জন্যও এই ছবি আপনাকে সিনেমাহলে গিয়েই দেখতে হবে।
এবার আসি ছবির ভেতরে। ছবির জার্নিটা ছিলো তিন বছরের। মানে ২০১০ এর শেষ দিকে রেদওয়ান রনির ঘোষণা আসে সে ছবি বানাবে। ২০১১ অতিক্রম করে ২০১২’র শেষ মাসের তৃতীয় সপ্তাহে এসে এই ছবি মুক্তি পেয়েছে। এই দীর্ঘ যাত্রায় রনি নিজে যে ছবির গল্প দাঁড় করিয়েছে তার বেশ কিছু জায়গায় আমার ঘোর আপত্তি আছে। প্রথমত এমন আন্ডারগ্রাউন্ড স্টোরি নিয়ে বাংলাদেশের নিয়মিত নির্মাতারা একাধিক ছবি বানিয়েছে। কিন্তু সেসব সিনেমা সিনেমার ধারে কাছেও না যাওয়ায়, রেদওয়ান রনির কাছে এই জায়গায় প্রত্যাশা আরও বেশী ছিলো। সে প্রত্যাশা পুরোপুরি পুরণ করতে পারেন নি তিনি। তবে তিনি যে পদ্ধতিতে শুরু করেছেন, তার জন্য তাঁকে সাধুবাদ। ছবির গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র সুমন (ইন্দ্রনীল) একজন প্রফেশনাল খুনি। যে কিনা তার গডফাদার (শহীদুজ্জামান সেলিম) এর পোশা মানুষ। খুন করা তার কাছে ডালভাত। কারণ, বারো/তেরো বছরেই সে একাধিক খুন করেছে। প্রথম খুনটা সে করে তার মা’র ধর্ষণকারী স্থানীয় চেয়ারম্যানকে। দ্বিতীয় খুন করে বস্তির এক ড্রাগ ব্যবসায়ী তাঁর মাকে বেশ্যা বলায়। দ্বিতীয় খুনের পরই সে চলে আসে তাঁর গডফাদারের হাওলায়। তার ছত্রছায়ায় তার আর খুনের কোনও হিসাব থাকেনা তখন। এমন একজন খুনী কিনা পেছন থেকে একজন প্রেগনেন্ট মহিলাকে খুন করেই তার ১৩/১৪ বছরের খুনী জীবন থেকে বেড়িয়ে আসতে পারবে? অবিশ্বাস্য হলেও এমন ঘটনাই ঘটেছে এই ছবিতে। এই ইন্দ্রনীল এই খুনের পর থেকে ছবির গল্পে পরিবর্তন আসতে থাকে। গল্পে সে ভিলেন থেকে নায়ক হতে থাকে। যদিও ছবিতে কেন্দ্রীয় নায়ক চরিত্র বলে আসলে তেমন কাউকে পাওয়া যায় না। ইন্দ্রনীলের করা সুমন চরিত্র সিনেমার প্রথমভাগেও কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে দাঁড়াতে পারে না। যতটা দাঁড়ায় সেলিমের করা চরিত্র। ছবির অধিকাংশ সময়ই মনে হয় সুমন চরিত্রটি কেবল একটি ক্রীড়নক মাত্র। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে এসে সুমনের নায়ক হওয়ার প্রচেষ্টা দেখা যায়। দেখা যায় সে আর খুনী থাকতে চায় না। ভালো মানুষ হতে চায়। ছবির নায়িকা নাবিলার (জয়া) চরত্রিটিও তেমন চ্যালেঞ্জিং হওয়ার কথা ছিলো, ততটা চ্যালেঞ্জিং হয় নি। টেলিভিশনের নিয়মিত নিয়ম ভাঙা জয়া এখানে অনুপস্থিত। কিন্তু ছোট চরিত্র হলেও এই ছবিতে নিজের মতো শক্তি আর চমৎকারিত্ব নিয়ে হাজির হয়েছেন এটিএম সামসুজ্জামান। তাঁর ক্ষমতা তিনি পরিমিতই দেখিয়েছেন। পরিমিত অভিনয় ক্ষমতা দেখিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন সব কিছু পরিমিত হওয়াই বাঞ্ছনিয়, অতিরঞ্জিত নয়। ঠিক এই কাজটিই করেছেন অভিনেতা শহীদুজ্জামান সেলিম। শক্তিমান অভিনেতা হিসেবে তার প্রতিষ্ঠা পরিচিতি থাকলেও সিনেমায় অভিনয়ের যে ভিন্ন একটা আবেদন আছে, তা তার অভিনয়ে পাওয়া যায় নি। বরং তার অভিনয়ে যা পাওয়া গেছে তা হলো তার অতিঅভিনয়ের বাড়াবাড়ি। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রই বলতে গেলে তা। আর তা এই অভিনেতার বাড়াবাড়ির কারণে এক প্রকার নষ্টই হয়েছে। খুব সীমিত পরিসরে চমৎকার অভিনয় করেছে হুমায়ূন সাধু। তাঁকে সাধুবাদ। ছবির প্রথম অর্ধ যখন শেষই হচ্ছে না তখন আমার মনে হচ্ছিলো ছবির গল্প অনেক বড়। আর এই গল্প দ্বিতীয়ার্ধে এসে কিনা কেমন জানি খাপছাড়া খাপছাড়া মনে হচ্ছিলো। ইন্দ্রনিলের করা চরিত্রটির ট্রান্সপোর্টেশন খুব দুর্বল। প্রকৃত অর্থে কেবল ইন্দ্রনিলকে নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যেই এই ট্রান্সপোর্টেশন। কিন্তু এই ট্রান্সপোর্টেশনটা আরও মজবুত হলে ছবি দেখে আরও উপভোগ করা যেতো। দুইঘন্টার ছবি দেখে ছবিতে সবচেয়ে বেশী যে জিনিসগুলো আমার কাছে আকর্ষনীয় মনে হয়েছে তার মাঝে হলো ইন্দ্রনীলের ফ্লাশব্যাক। এই সময়টার কালারটোন ছিলো ভিন্ন। অতীতের গল্প বলার জন্য সেপিয়া টোন ব্যবহার করেছে পরিচালক। তারচেয়ে বড় কথা এই সময়টার নির্মাণ কৌশলেই পাওয়া গেছে চলচ্চিত্রকার রেদওয়ান রনিকে। বাকি সময়টায় রনি ছিলো ট্রাডিশনাল টিভি নাট্য পরিচালকের মতোই।
এছাড়া এই ছবির সবচে বড় দুর্বলতা ছিলো সংলাপে। সংলাপ আরও কি চমৎকারই না হতে পারতো। এই আক্ষেপের সাথে আরও একটা আক্ষেপ বড় ভুগিয়েছে তা হলো ছবির কন্টিনিটি। ইন্দ্রনীলকে যে পিস্তলটা শহীদুজ্জামান সেলিম সেই কবে উপহার দিয়েছিলো এই পিস্তলটাই তার সাথে থাকার কথা। কিন্তু এই পিস্তলটার স্থলে ভিন্ন সময় ভিন্ন পিস্তল কি চোখে পড়েছে? আমি আমার পাশের দর্শককে জিজ্ঞেস করায় সেও সায় দিলো এই স্থানে। এমন ছোটখাটো বেশকিছু ভুল আছে সেগুলোকে অতিক্রম করার জন্য ছিলো চমৎকার ব্যকগ্রাউন্ড মিউজিক স্কোর। অরিজিনাল স্কোরের চেয়ে গল্পের সাথে ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর মানিয়েছে চমৎকার। আর একটা আইটেম গান? প্রাণহীন একটা মেয়ে আর একদল ছেলের শরীর দেখালেই কি আইটেম গান হয়? তাও আর গল্পের সাথে কোনও সামঞ্জস্য না রেখে হুট করে দিলেই হলো? তাহলে এই আইটেম গানটা ছবিতে ব্যবহার না করে কেবল মার্কেটিং এ ব্যবহার করলেও ছবির দর্শক আগ্রহী হতো বলে আমার মনে হয়।
ছবির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবচে বিরক্তিকর বিষয় হৈলো ইন্দ্রনীলের লিপে শতাব্দী ওয়াদুদের কন্ঠ আর মডেল কন্যার কণ্ঠে দীপা খন্দকারের কণ্ঠ। একদমই মানায়নাই বলে মনে হৈছে আমার।
এতকিছুর পরও আমি এই পরিচালককে নিয়ে আসাবাদী। আমি চাইবো রেদওয়ান রনি নিয়মিত ছবিই বানাক। আর নাটক না বানিয়ে এর চেয়ে ভালো ছবিই বানাক। তখন একই ছবি বারবার দেখার জন্য আমিই সিনেমাহলে যাবো। আমার মনে হয় এর চেয়ে আর একটু ভালো হলে আমার মতো দর্শক আরও তৈরি হবে। একই ছবি বারবার দেখার জন্য সিনেমাহলে যাবে। আর তা না হলে চলচ্চিত্র শিল্প যে অপারেশন টেবিলে এখন আছে, সেখান থেকে সে আর সুস্থ্য হয়ে ফিরে আসতে পারবে না। আর ভালো ছবি হলে চলচ্চিত্র উঠে দাঁড়াবে, হাসবে খেলবে। যা খুব প্রয়োজন আমাদের জন্য।

Read More

এই সাইটের যে কোনও লেখা যে কেউ অনলাইনে ব্যবহার করতে পারবে। তবে লেখকের নাম ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক।

Blogger template Proudly Powered by Blogger. Arranged By: এতক্ষণে অরিন্দম