গদ্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
গদ্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬



গত ২২ জানুয়ারি ছিলো প্রিয় ব্যান্ড মেঘদলের এক যুগ পূর্তি। সেই দিনের বারো বছর আগে প্রতিষ্ঠা পাইছিলো এক বাংলা ব্যান্ড। যার নাম মেঘদল। তো প্রিয় ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠার যুগপূর্তিতে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলে নিচে আইসা সাইয়েদ জামিল কমেন্ট করে “‘মেঘদল-টা কী জিনিসরে কমল? আমি কোনও উত্তর দেই নাই। কারণ, আমার ধারণা জামিল খুব ভালো করেই জানে এইটা কি জিনিস। তাই হয়তো তার অন্য কোনও চিন্তা আছে প্রশ্নের পেছনে। তাই আমি সেই প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য একটু সময় চাইতেছিলাম। চাইতেছিলাম, একটু ডিটেইলে বলি। এই লেখা আসলে সাইয়েদ জামিলকে লেখা সেই উত্তর। যা আমি আরও বহু আগেই বলতে চাইছিলাম একা একা। নিজের জন্য, নিজের কাছে।


ফ্ল্যাশব্যাক
মেঘদল কী জিনিস এই কথা বলার জন্য আমাকে একটু পেছনে তাকাতে হয়। সেইটা ২০০৬ সালের কথা। আমি তখন পুরোদমে ছাত্র ইউনিয়ন ময়মনসিংহ জেলা কমিটিতে রাজনীতি করি। সেই সময় ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সম্মেলন ফেব্রুয়ারিতে। সেই সম্মেলনে যোগ দিতে ময়মনসিংহ থেকে সদলবলে ঢাকায় আসলাম। উদ্বোধনী দিনে রাজু ভাস্কর্য চত্বরে সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ছাত্র ইউনিয়নের আমন্ত্রিত ব্যান্ড চিৎকার আর মেঘদল। দুইটা ব্যান্ডের গান আমি সেবারই প্রথম শুনি। চিৎকারের কয়েকটা চমৎকার গান শোনার পর (যার মাঝে একটা ছিলো হাট্টিমাটিম টিম লইয়া গবেষণা চালাইছে) মেঘদল মঞ্চে দাঁড়ায়। সেই আমার মেঘদলকে চেনার শুরু। যা এখনও ধারাবাহিক। সেইবার মেঘদল ঔম, ক্রুসেডসহ চার-কি পাঁচটি গান গায়।  বায়োস্কোপের নেশা আমার যেমন ছাড়ে না, তেমনি চেপে বসে মেঘদলের গানের নেশাও। সম্মেলন শেষে ময়মনসিংহে গিয়ে দেখি মেঘদলের অডিও অ্যালবাম কেউ সেখানে নেয় নাই। নিবেই কিভাবে? তারা তো আর জনপ্রিয় ব্যান্ড না। কিন্তু মেঘদলের গান এইভাবে না শুনে কেমনে দিন কাটাই? তাই ঢাকা থেকে মেঘদলের অডিও সিডি কিনে ময়মনসিংহে নেয়া হলো। বন্ধুরা যেই কয়টা কপির চেষ্টা করছিলাম, ততগুলো পাওয়া গেলো না। পাওয়া গেলো মাত্র এক কপি। আর তাই পালা করে কম্পিউটারে কপি করা। তারপর সবার মুখস্থ। ময়মনসিংহে পরিচিত না হলেও মেঘদল ঢাকায় মোটামোটি পপুলার। হুট করে একদিন দেখি অতনু (অতনু তিয়াস) তাদের নিয়া ইত্তেফাকে একটা ফিচারও লিখলো। বাহ্ চমৎকার তো! আর কই যায়। সে বছরই আমি রাজনীতি থেকে সরাসরি সরে আসি। কিন্তু মেঘদলের সাথে সম্পর্কটা ছাড়া হয় নি। বরং বেড়েছেই বলা যায়। এইবার নিজেকে প্রশ্ন করি। আসলেই কি বেড়েছে? যদি বেড়েই থাকে তবে বলো দেখি, মেঘদল কি?


এই প্রশ্নের খোঁজা কি মূখ্য বিষয় কিনা জানিনা। তবে এ জানি মেঘদল আমাদের রোদের চিঠি, অথবা বনসাই বনের মালি। কারণ, এই যে আমাদের চারপাশ ঘিরে আছে বেদনারহিত অনুভূতির দেয়াল এর সীমানা কোনটা আমরা জানি না। জানি কখনও উসাইন বোল্টের মতো, কখনো ম্যারাথনের প্রতিযোগিদের মতো দৌড়াইতেছি কেবল। এই দৌড়ের মধ্যে চুপচাপ যে হাওয়া বাতাস আসে, মনে সাহস আর অনুপ্রেরণাও যোগায় সেইটা মেঘদলের গান।

রাজু ভাস্কর্যের সামনে ঐদিন ঐ মঞ্চে যেই লাইনআপ ছিলো এখন বোধহয় সেই লাইনআপ হুবহু নাই। সেদিন নগরের অতিথি আমি ভার্সিটির রাস্তায় নিজের জুতা পশ্চাদেশের নিচে দিয়া বসে পড়ছিলাম। গান শুনছিলাম সম্ভবত চারটা কি পাঁচটা। তার মধ্যে ঔম, চতুর্দিকে, ক্রুসেড, ব্যবচ্ছেদ গানগুলো ছিলো মনে করতে পারি।

তারপর রিপিটেশনের কালে, একই গান বারবার বারবার শুনছি ঔম। কেন শুনছি এই প্রশ্ন করলে এখনো চুপ হয়ে যাই। মনে হয়, কার কাছে দিবো এই উত্তর? সে কি গান শুনছিলো না সুর? নাকি কিছুটা হাওয়ায় ভেসে আসা একটা চড়কির মতো কথাবার্তায় ঘুরপাক খাচ্ছে কেবল? আমার নিজের কাছে প্রশ্নগুলোরই উত্তর মেলে না। অন্যকে কিভাবে উত্তর দেই!!!

ঔম গানটা আমি নানান ধরনে মানুষকে শোনাইছি। একবার এক মুর্শীদি ভক্ত কবিরাজরে শুনাইছিলাম। গান  শুনে তিনি আমাকে জড়াইয়া ধরলেন। বললেন, তুমি এমন সুন্দর গান কই পাইলা? তার চোখে মানুষের মুক্তির যে আনন্দ সেই আনন্দ দেখছিলাম। সত্যি বলছি, সেই মুক্তির আনন্দ অনেক দিন কারো চোখে দেখি না। সব পরাজিত যোদ্ধা দেখি। চোখের সামনে সব ক্লান্ত বিমর্ষ আর বিদঘুটে অন্ধকারময় খিলখিল হাসি। ঐদিন, ঐ মুর্শীদি ভক্ত তার ভাবনার ধর্ম অধর্মের বিশাল লেকচার শুনাইছিলো। তর্ক হইছিলো তার সাথে, হইছিলো আলোচনা। ভাবনার বিষয় বিস্তৃত হয়ে আর গানে ছিলো না। ছিলো ধর্ম আর মানুষে। দীর্ঘ সেই সংলাপ শেষে আমরা যখন সমাপ্তির পর্দা টানি, তখন আমরা একমত হইছিলাম এই চিন্তায় যে, মানুষ যে এত ধর্ম-ধর্ম করে-ধর্মেরও উচিত কিছু মানুষ-মানুষ করা। কিন্তু ঐ ধর্মই তো বায়বিয়। আমরা কেমনে তার ছায়া মাড়াই? আমাদেও দুনিয়ার হাওয়া বাতাসে বাড়তে বাড়তে আমাদের চাইতে বড় হয়ে যায় ধর্ম। কেমন বড়? তার কোনও আকার আয়তনের কথা আমরা বলতেই পারি না। তারে না যায় ধরা, না যায় ছোঁয়া।

এবার অন্য সুরে তাকাই, অন্য কথায়-সঙ্গীতে। আসলেই ধর্ম বলে কি কিছু আছে কি না, সেই প্রশ্নের চাইতে তখন আমাদের চিন্তা খেলা করে জগৎ সংসার নিয়ে। মনে প্রশ্ন জাগে মানুষের কজন ভগবান, কজনে ভাগ্য লেখে- কজনে জীবন সামলান? এই প্রশ্ন আর উত্তরের খেলা খেলতে গিয়ে আমরা হাওয়ার মতো অদৃশ্য কিছু উত্তরও তাদের কাছ থেকে পাই। তারা বলে দিয়ে যায়, আকাশে উড়ছে বোমারু ভগবান, মানুষ ধ্বংসে যিনি গণতন্ত্র এনে দেন। কিন্তু এই উত্তরে আমাদের স্বস্তি মেলে না। আমরা অস্বস্তি নিয়ে দৌড়ে উঠে বসি নিজ নিজ গন্তব্যের লোকাল বাসে। ফেরা আর না ফেরার এক অস্পৃশ্য প্রতিবন্ধকতাও আমাদের সঙ্গে বাসে উঠে পড়ে। দীর্ঘ ভ্রমণে ক্লান্তি পায় আমাদের, ভুলে যায় বিষাদময় রাত্রীদিনের কথা। তন্দ্রাচ্ছন্নতা ঘিরে ধরে। আধো ঘুম আধো জাগ্রত জগত থেকে অন্য এক জগতের দিকে হাঁটি আর তারাও কিনা বলে আমারই কথা, আমাদেরই কথা-
আমি হেঁটে যাই মেঘের কাছে
আমি হেঁটে যাই
হেঁটে যাই
প্রশ্বাসে ছুঁয়েছি আকাশ
দুঃখ ছুঁয়ে যায় বাতাসে বাতাসে
আমি হেঁটে যাই
আমার সকল পাপ ক্ষমা করে দিও তুমি মেঘ...
এক অদ্ভুত শূন্যতা ঘিরে ধরে আমাদের। গলা ভিজে আসে পাপবোধে। বাড়ি ফেরার পথ ভুলে যাই। মনে পরে সুদূরে প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা এক অবয়ব। কে সেই শান্তির দূত? যে অবয়বের চেয়ে বেশিকিছু নয়, অথবা নেই তারে ছুঁয়ে যাওয়ার কোনও ছুতো। কেবল বুকের ভেতর থেকে অস্ফুট স্বরে বলে উঠি... ভালোবাসা হইয়ো তুমি পরজনমে। কিন্তু তা হয় না। বরঙ ডানা মেলে অন্য এক ভূবনে, উড়ে যায় নিশিপাখির মতো, খুব করে ভুলে যাওয়া এক পাখির ডানার মতো উড়ে যায়। হারিয়ে যায়, বিভ্রান্ত পথিকের মতো অচেনা শহরে। সেই শহর কোথায়? কোন পথে ছুটলে সেই পথের সন্ধান মিলবে? আদৌ মিলবে কি না, তা জানা নেই। থাকবে কি করে? নাগরিক কবিয়ালকে খুঁজতে খুঁজতে নিজেকেই হারিয়েছে ফেলেছি চেনা অচেনা আলো আধারে, চলতি পথে কোনও বাসের ভীড়ে। অথচ প্রায় প্রতিরাতেই আমাদের শৈশব কান্না করে নগরীর নোনা ধরা দেয়ালে। দূরে কোথাও আকাশে বিদ্যুৎ চমকায়, আকাশে আলো ছায়ার খেলায় ভুলে যাই টানাপোড়েনের আলু-বেগুনের দাম আর লোকাল বাসের ভাড়া। মনে মনে খেলা করে মৃত বিপ্লবের আত্মা-কান্নার বৃষ্টি নামে শহরে আর-
আমার শহর খুব সহজে একলা পাখির মতো ভিজতে থাকে
কেউ জানে না কোন তীব্র শ্লোগান, মুখর হতে এই শহরে
জানি, শ্লোগান মুখর সময়ের গল্প আমাদের ভুরি-ভুরি। কিন্তু এই যে বন্ধ্যাকাল, ভেতর থেকে কোনও আওয়াজ নেই। নেই মানুষের ডাকে মানুষের সাড়া দেয়ার মতো ব্যাক্তিত্ব। একেবারেই হারিয়ে ফেলেছি মানবিকতা বোধের গোপন চিঠি। এমন সময়ে যারা সমাজে সবচেয়ে বেশী দায় বোধ করে, প্রকৃত সংস্কৃতিকর্মী তারাই। যদিও সমাজে তার কর্মের প্রভাব আসে খুব ধীরে, কিন্তু স্থায়ি হয় সেইটাই। এই দায়বোধটার অনেকটাই গ্রহণ করে মেঘদল। প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য ভাষায় তাদের চেতনার প্রকাশটাই অনেক সময় হয়ে উঠে সমাজের বেদনার ভাষা। এমন পরিস্থিতির কথাও কিন্তু তারা তাদের গানেই বলে দিয়েছে আরও বহু আগে।
অস্থিরতায়, নিমগ্নতায় পুড়ছে স্বদেশ পুড়ছে সবাই
তবু রুখে দাঁড়াই আমরা!
ঘুরে দাঁড়াই আমরা!! ফিরে দাঁড়াই!!!
এই হলো শিল্পীর দায়বোধ। যা এড়িয়ে গেলে তাকে আর শিল্পী ভাবতে পারি না আমি। আসলে আমি ভাবতে চাইও না। এই বিষয় নিয়ে অনেকের সাথে অনেক তর্ক আর আলোচনা হয়-হয়েছে। কিন্তু চিন্তার ক্ষেত্র বদলায়নি। হয়তো মেঘদলও আমার মতো ভাবে না, কিন্তু আমি তাদের কাজে নিজের ভাবনার ছায়া পাই। যা তাদেরকে নিজের মতো ভাবতে সহায়তা করে।

মেঘদল আসলে গোপন এক আশ্রয়ের নাম। যখন নিজের সাথে নিজের লড়াই করার প্রয়োজন, তখন অন্তর্গত অনুপ্রেরণা হিসেবে মেঘদল আসে। এই আশ্রয়ের অনুভূতি প্রকাশে বোদলেয়ারের আশ্রয় ছাড়া উপায় নেই; তাই সেই ভাষাতেই বলি-
আমি ভালোবাসি মেঘ... চলিষ্ণু মেঘ... ঐ উচুতে... ঐ উচুতে

আমি ভালোবাসি আশ্চর্য মেঘদল!

মেঘদল আমাদের রোদের চিঠি

at রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৬  |  No comments



গত ২২ জানুয়ারি ছিলো প্রিয় ব্যান্ড মেঘদলের এক যুগ পূর্তি। সেই দিনের বারো বছর আগে প্রতিষ্ঠা পাইছিলো এক বাংলা ব্যান্ড। যার নাম মেঘদল। তো প্রিয় ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠার যুগপূর্তিতে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলে নিচে আইসা সাইয়েদ জামিল কমেন্ট করে “‘মেঘদল-টা কী জিনিসরে কমল? আমি কোনও উত্তর দেই নাই। কারণ, আমার ধারণা জামিল খুব ভালো করেই জানে এইটা কি জিনিস। তাই হয়তো তার অন্য কোনও চিন্তা আছে প্রশ্নের পেছনে। তাই আমি সেই প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য একটু সময় চাইতেছিলাম। চাইতেছিলাম, একটু ডিটেইলে বলি। এই লেখা আসলে সাইয়েদ জামিলকে লেখা সেই উত্তর। যা আমি আরও বহু আগেই বলতে চাইছিলাম একা একা। নিজের জন্য, নিজের কাছে।


ফ্ল্যাশব্যাক
মেঘদল কী জিনিস এই কথা বলার জন্য আমাকে একটু পেছনে তাকাতে হয়। সেইটা ২০০৬ সালের কথা। আমি তখন পুরোদমে ছাত্র ইউনিয়ন ময়মনসিংহ জেলা কমিটিতে রাজনীতি করি। সেই সময় ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সম্মেলন ফেব্রুয়ারিতে। সেই সম্মেলনে যোগ দিতে ময়মনসিংহ থেকে সদলবলে ঢাকায় আসলাম। উদ্বোধনী দিনে রাজু ভাস্কর্য চত্বরে সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ছাত্র ইউনিয়নের আমন্ত্রিত ব্যান্ড চিৎকার আর মেঘদল। দুইটা ব্যান্ডের গান আমি সেবারই প্রথম শুনি। চিৎকারের কয়েকটা চমৎকার গান শোনার পর (যার মাঝে একটা ছিলো হাট্টিমাটিম টিম লইয়া গবেষণা চালাইছে) মেঘদল মঞ্চে দাঁড়ায়। সেই আমার মেঘদলকে চেনার শুরু। যা এখনও ধারাবাহিক। সেইবার মেঘদল ঔম, ক্রুসেডসহ চার-কি পাঁচটি গান গায়।  বায়োস্কোপের নেশা আমার যেমন ছাড়ে না, তেমনি চেপে বসে মেঘদলের গানের নেশাও। সম্মেলন শেষে ময়মনসিংহে গিয়ে দেখি মেঘদলের অডিও অ্যালবাম কেউ সেখানে নেয় নাই। নিবেই কিভাবে? তারা তো আর জনপ্রিয় ব্যান্ড না। কিন্তু মেঘদলের গান এইভাবে না শুনে কেমনে দিন কাটাই? তাই ঢাকা থেকে মেঘদলের অডিও সিডি কিনে ময়মনসিংহে নেয়া হলো। বন্ধুরা যেই কয়টা কপির চেষ্টা করছিলাম, ততগুলো পাওয়া গেলো না। পাওয়া গেলো মাত্র এক কপি। আর তাই পালা করে কম্পিউটারে কপি করা। তারপর সবার মুখস্থ। ময়মনসিংহে পরিচিত না হলেও মেঘদল ঢাকায় মোটামোটি পপুলার। হুট করে একদিন দেখি অতনু (অতনু তিয়াস) তাদের নিয়া ইত্তেফাকে একটা ফিচারও লিখলো। বাহ্ চমৎকার তো! আর কই যায়। সে বছরই আমি রাজনীতি থেকে সরাসরি সরে আসি। কিন্তু মেঘদলের সাথে সম্পর্কটা ছাড়া হয় নি। বরং বেড়েছেই বলা যায়। এইবার নিজেকে প্রশ্ন করি। আসলেই কি বেড়েছে? যদি বেড়েই থাকে তবে বলো দেখি, মেঘদল কি?


এই প্রশ্নের খোঁজা কি মূখ্য বিষয় কিনা জানিনা। তবে এ জানি মেঘদল আমাদের রোদের চিঠি, অথবা বনসাই বনের মালি। কারণ, এই যে আমাদের চারপাশ ঘিরে আছে বেদনারহিত অনুভূতির দেয়াল এর সীমানা কোনটা আমরা জানি না। জানি কখনও উসাইন বোল্টের মতো, কখনো ম্যারাথনের প্রতিযোগিদের মতো দৌড়াইতেছি কেবল। এই দৌড়ের মধ্যে চুপচাপ যে হাওয়া বাতাস আসে, মনে সাহস আর অনুপ্রেরণাও যোগায় সেইটা মেঘদলের গান।

রাজু ভাস্কর্যের সামনে ঐদিন ঐ মঞ্চে যেই লাইনআপ ছিলো এখন বোধহয় সেই লাইনআপ হুবহু নাই। সেদিন নগরের অতিথি আমি ভার্সিটির রাস্তায় নিজের জুতা পশ্চাদেশের নিচে দিয়া বসে পড়ছিলাম। গান শুনছিলাম সম্ভবত চারটা কি পাঁচটা। তার মধ্যে ঔম, চতুর্দিকে, ক্রুসেড, ব্যবচ্ছেদ গানগুলো ছিলো মনে করতে পারি।

তারপর রিপিটেশনের কালে, একই গান বারবার বারবার শুনছি ঔম। কেন শুনছি এই প্রশ্ন করলে এখনো চুপ হয়ে যাই। মনে হয়, কার কাছে দিবো এই উত্তর? সে কি গান শুনছিলো না সুর? নাকি কিছুটা হাওয়ায় ভেসে আসা একটা চড়কির মতো কথাবার্তায় ঘুরপাক খাচ্ছে কেবল? আমার নিজের কাছে প্রশ্নগুলোরই উত্তর মেলে না। অন্যকে কিভাবে উত্তর দেই!!!

ঔম গানটা আমি নানান ধরনে মানুষকে শোনাইছি। একবার এক মুর্শীদি ভক্ত কবিরাজরে শুনাইছিলাম। গান  শুনে তিনি আমাকে জড়াইয়া ধরলেন। বললেন, তুমি এমন সুন্দর গান কই পাইলা? তার চোখে মানুষের মুক্তির যে আনন্দ সেই আনন্দ দেখছিলাম। সত্যি বলছি, সেই মুক্তির আনন্দ অনেক দিন কারো চোখে দেখি না। সব পরাজিত যোদ্ধা দেখি। চোখের সামনে সব ক্লান্ত বিমর্ষ আর বিদঘুটে অন্ধকারময় খিলখিল হাসি। ঐদিন, ঐ মুর্শীদি ভক্ত তার ভাবনার ধর্ম অধর্মের বিশাল লেকচার শুনাইছিলো। তর্ক হইছিলো তার সাথে, হইছিলো আলোচনা। ভাবনার বিষয় বিস্তৃত হয়ে আর গানে ছিলো না। ছিলো ধর্ম আর মানুষে। দীর্ঘ সেই সংলাপ শেষে আমরা যখন সমাপ্তির পর্দা টানি, তখন আমরা একমত হইছিলাম এই চিন্তায় যে, মানুষ যে এত ধর্ম-ধর্ম করে-ধর্মেরও উচিত কিছু মানুষ-মানুষ করা। কিন্তু ঐ ধর্মই তো বায়বিয়। আমরা কেমনে তার ছায়া মাড়াই? আমাদেও দুনিয়ার হাওয়া বাতাসে বাড়তে বাড়তে আমাদের চাইতে বড় হয়ে যায় ধর্ম। কেমন বড়? তার কোনও আকার আয়তনের কথা আমরা বলতেই পারি না। তারে না যায় ধরা, না যায় ছোঁয়া।

এবার অন্য সুরে তাকাই, অন্য কথায়-সঙ্গীতে। আসলেই ধর্ম বলে কি কিছু আছে কি না, সেই প্রশ্নের চাইতে তখন আমাদের চিন্তা খেলা করে জগৎ সংসার নিয়ে। মনে প্রশ্ন জাগে মানুষের কজন ভগবান, কজনে ভাগ্য লেখে- কজনে জীবন সামলান? এই প্রশ্ন আর উত্তরের খেলা খেলতে গিয়ে আমরা হাওয়ার মতো অদৃশ্য কিছু উত্তরও তাদের কাছ থেকে পাই। তারা বলে দিয়ে যায়, আকাশে উড়ছে বোমারু ভগবান, মানুষ ধ্বংসে যিনি গণতন্ত্র এনে দেন। কিন্তু এই উত্তরে আমাদের স্বস্তি মেলে না। আমরা অস্বস্তি নিয়ে দৌড়ে উঠে বসি নিজ নিজ গন্তব্যের লোকাল বাসে। ফেরা আর না ফেরার এক অস্পৃশ্য প্রতিবন্ধকতাও আমাদের সঙ্গে বাসে উঠে পড়ে। দীর্ঘ ভ্রমণে ক্লান্তি পায় আমাদের, ভুলে যায় বিষাদময় রাত্রীদিনের কথা। তন্দ্রাচ্ছন্নতা ঘিরে ধরে। আধো ঘুম আধো জাগ্রত জগত থেকে অন্য এক জগতের দিকে হাঁটি আর তারাও কিনা বলে আমারই কথা, আমাদেরই কথা-
আমি হেঁটে যাই মেঘের কাছে
আমি হেঁটে যাই
হেঁটে যাই
প্রশ্বাসে ছুঁয়েছি আকাশ
দুঃখ ছুঁয়ে যায় বাতাসে বাতাসে
আমি হেঁটে যাই
আমার সকল পাপ ক্ষমা করে দিও তুমি মেঘ...
এক অদ্ভুত শূন্যতা ঘিরে ধরে আমাদের। গলা ভিজে আসে পাপবোধে। বাড়ি ফেরার পথ ভুলে যাই। মনে পরে সুদূরে প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা এক অবয়ব। কে সেই শান্তির দূত? যে অবয়বের চেয়ে বেশিকিছু নয়, অথবা নেই তারে ছুঁয়ে যাওয়ার কোনও ছুতো। কেবল বুকের ভেতর থেকে অস্ফুট স্বরে বলে উঠি... ভালোবাসা হইয়ো তুমি পরজনমে। কিন্তু তা হয় না। বরঙ ডানা মেলে অন্য এক ভূবনে, উড়ে যায় নিশিপাখির মতো, খুব করে ভুলে যাওয়া এক পাখির ডানার মতো উড়ে যায়। হারিয়ে যায়, বিভ্রান্ত পথিকের মতো অচেনা শহরে। সেই শহর কোথায়? কোন পথে ছুটলে সেই পথের সন্ধান মিলবে? আদৌ মিলবে কি না, তা জানা নেই। থাকবে কি করে? নাগরিক কবিয়ালকে খুঁজতে খুঁজতে নিজেকেই হারিয়েছে ফেলেছি চেনা অচেনা আলো আধারে, চলতি পথে কোনও বাসের ভীড়ে। অথচ প্রায় প্রতিরাতেই আমাদের শৈশব কান্না করে নগরীর নোনা ধরা দেয়ালে। দূরে কোথাও আকাশে বিদ্যুৎ চমকায়, আকাশে আলো ছায়ার খেলায় ভুলে যাই টানাপোড়েনের আলু-বেগুনের দাম আর লোকাল বাসের ভাড়া। মনে মনে খেলা করে মৃত বিপ্লবের আত্মা-কান্নার বৃষ্টি নামে শহরে আর-
আমার শহর খুব সহজে একলা পাখির মতো ভিজতে থাকে
কেউ জানে না কোন তীব্র শ্লোগান, মুখর হতে এই শহরে
জানি, শ্লোগান মুখর সময়ের গল্প আমাদের ভুরি-ভুরি। কিন্তু এই যে বন্ধ্যাকাল, ভেতর থেকে কোনও আওয়াজ নেই। নেই মানুষের ডাকে মানুষের সাড়া দেয়ার মতো ব্যাক্তিত্ব। একেবারেই হারিয়ে ফেলেছি মানবিকতা বোধের গোপন চিঠি। এমন সময়ে যারা সমাজে সবচেয়ে বেশী দায় বোধ করে, প্রকৃত সংস্কৃতিকর্মী তারাই। যদিও সমাজে তার কর্মের প্রভাব আসে খুব ধীরে, কিন্তু স্থায়ি হয় সেইটাই। এই দায়বোধটার অনেকটাই গ্রহণ করে মেঘদল। প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য ভাষায় তাদের চেতনার প্রকাশটাই অনেক সময় হয়ে উঠে সমাজের বেদনার ভাষা। এমন পরিস্থিতির কথাও কিন্তু তারা তাদের গানেই বলে দিয়েছে আরও বহু আগে।
অস্থিরতায়, নিমগ্নতায় পুড়ছে স্বদেশ পুড়ছে সবাই
তবু রুখে দাঁড়াই আমরা!
ঘুরে দাঁড়াই আমরা!! ফিরে দাঁড়াই!!!
এই হলো শিল্পীর দায়বোধ। যা এড়িয়ে গেলে তাকে আর শিল্পী ভাবতে পারি না আমি। আসলে আমি ভাবতে চাইও না। এই বিষয় নিয়ে অনেকের সাথে অনেক তর্ক আর আলোচনা হয়-হয়েছে। কিন্তু চিন্তার ক্ষেত্র বদলায়নি। হয়তো মেঘদলও আমার মতো ভাবে না, কিন্তু আমি তাদের কাজে নিজের ভাবনার ছায়া পাই। যা তাদেরকে নিজের মতো ভাবতে সহায়তা করে।

মেঘদল আসলে গোপন এক আশ্রয়ের নাম। যখন নিজের সাথে নিজের লড়াই করার প্রয়োজন, তখন অন্তর্গত অনুপ্রেরণা হিসেবে মেঘদল আসে। এই আশ্রয়ের অনুভূতি প্রকাশে বোদলেয়ারের আশ্রয় ছাড়া উপায় নেই; তাই সেই ভাষাতেই বলি-
আমি ভালোবাসি মেঘ... চলিষ্ণু মেঘ... ঐ উচুতে... ঐ উচুতে

আমি ভালোবাসি আশ্চর্য মেঘদল!

Read More

রবিবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০১৬

পৃথিবীর কাল্পনিক প্রেমিকাদের মতো তুমি, এই কথা ভাবতে ভাবতে আমি ঘুমিয়ে যাই। ঘুম ছড়িয়ে পরে দেয়ালে দেয়ালে। অথচ এই প্রেম প্রকাশের ভাষা নেই। যাতনার নেই নির্দিষ্ট সুর, তবুও তাকেই ডাকে যেই প্রেম তা থেকেই কেবল শুভবার্তা জানাতে পারি।
হয়তো অনেকটা এরকম একটা ভাবনা বা তারও চেয়ে সহজভাবে হৃদয়ের আকুলতা প্রকাশে লেড বেলি লিখেছিলেন তার অমর গান ‌গুডনাইট আইরিন

একটা শুভ কামনার সাথে যাতনা আর অন্তর্গত কান্নার কথা লেড বেলি বলেছিলেন গানে গানে। কালে কালে এই গানই বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে গেয়েছেন। মাঝখান দিয়ে ইংরেজি ফোক গানের ভান্ডারে নিজের এক শক্তিশালি জায়গা করে নিয়েছে গুডনাইট আইরিন। এই ফোক শিল্পীর বয়স যখন বিশ তখন, খুব সম্ভবত ১৯০৮ সালে এই গানটা লেখা হয়। আর সেই প্রথম তা রেকর্ড করায় ১৯৩৪ সালে। ২৬ বছর একটানা দেশের বিভিন্নস্থানে এই গান গেয়ে বেড়ান লেড বেলি। বেলির গান রেকর্ডের পরও এই গান একাধিকবার পুর্নলিখন হয়েছে। বিভিন্ন শিল্পী মূল সুর অবিকৃত রেখে নিজেদের মতো করে গেয়েছে। তবে পৃথিবীব্যাপি এই গান অনেকটাই ছড়িয়েছে এরিক ক্ল্যাপটন। ক্ল্যাপটনের গাওয়া গানে আধুনিকতার ছাপ পাওয়া যায়। আর তার নিজস্ব গায়কী ও সঙ্গীতায়োজনও এর জনপ্রিয়তা বাড়ানোয় বড় ভূমিকা রাখে। তবে লেড বেলি ছাড়াও গুডনাইট আইরিন এর জনপ্রিয়তা বাড়ানোয় বড় ভূমিকা ছিলো ৪০ এর দশকের শেষ দিকে গড়ে উঠা ব্যান্ড দ্যা ওয়েভার্স। যেই ব্যান্ডে এক সময় কিনা পৃথিবী বিখ্যাত ফোক শিল্পী পিট সিগারও গান গাইতো। বেলির পর ওয়েভার্সই দ্বিতীয় কোনও ব্যক্তি বা ব্যন্ড যারা গুডনাইট আইরিন কোরাস করে রেকর্ড করছিলো।
মূল গানটার নামে ইউটিউবে একটা ভিডিও আছে। যাতে নাকি লেড বেলি নিজেই গানটা গাইছে এমন। কিন্তু আমার কিছুটা সন্দেহ হয় এই ভিডিওটায়। কারণ, ১৯৪৯ সালে লেড বেলি মারা যান। তার আগে এত চমৎকার ভিডিও আর রেকর্ড কিছুটা বিশ্বাসহীনতার তৈরি করেই।
এক প্রকার ভালোলাগা-ভালোবাসা থেকেই গুডনাইট আইরিন গানটার প্রথম ভার্সনটা অনুবাদ করি।
আইরিন শুভরাত্রী, আইরিন শুভ রাত্রী,
শুভ রাত্রী আইরিন, শুভরাত্রী আইরিন
তুমি আসবে স্বপ্নে ফিরে আসবে।

গেলো শনিবার আমি বিয়ে করেছিলাম
একসাথেই ছিলাম আমরা
এখন আর নেই
এবার আবার আমি ফিরে যাবো আমার শহরে।

হয়তো থাকবো এই দেশেই
কখনো এই শহরেই
কখনো হয়তো ভাববো অনেক কিছু
নদীতে কাটবো সাঁতার, ডুব দিবো অতলে

আইরিনকেই ভালোবাসি আমি, ঈশ্বর তা জানে
তারেই ভালোবাসবো, যতদিন সাগর না শুকায়
যদি আমাকে সে ফেরায়
মরে যাবো আমি বিষ পানে।

এলোমেলো হয়ো না, জুয়া খেলো না আর
রাতে করে বাড়ি ফিরো
বাড়ি যাও, স্ত্রীর কাছে পরিবারের কাছে
ফায়ারপ্লেসের মতো আরো উজ্জ্বল করো চারপাশ


লেড ভেলির গলায় গাওয়া দাবি করা ভিডিও


দ্যা ওয়েভার্স ব্যান্ডের গাওয়া ভিডিও 


এরিক ক্ল্যাপটন এর গানের লিংক দেয়া হলো। 

'গুডনাইট আইরিন' : পৃথিবীর কাল্পনিক প্রেমিকাদের মতো তুমি

at রবিবার, জানুয়ারি ১৭, ২০১৬  |  No comments

পৃথিবীর কাল্পনিক প্রেমিকাদের মতো তুমি, এই কথা ভাবতে ভাবতে আমি ঘুমিয়ে যাই। ঘুম ছড়িয়ে পরে দেয়ালে দেয়ালে। অথচ এই প্রেম প্রকাশের ভাষা নেই। যাতনার নেই নির্দিষ্ট সুর, তবুও তাকেই ডাকে যেই প্রেম তা থেকেই কেবল শুভবার্তা জানাতে পারি।
হয়তো অনেকটা এরকম একটা ভাবনা বা তারও চেয়ে সহজভাবে হৃদয়ের আকুলতা প্রকাশে লেড বেলি লিখেছিলেন তার অমর গান ‌গুডনাইট আইরিন

একটা শুভ কামনার সাথে যাতনা আর অন্তর্গত কান্নার কথা লেড বেলি বলেছিলেন গানে গানে। কালে কালে এই গানই বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে গেয়েছেন। মাঝখান দিয়ে ইংরেজি ফোক গানের ভান্ডারে নিজের এক শক্তিশালি জায়গা করে নিয়েছে গুডনাইট আইরিন। এই ফোক শিল্পীর বয়স যখন বিশ তখন, খুব সম্ভবত ১৯০৮ সালে এই গানটা লেখা হয়। আর সেই প্রথম তা রেকর্ড করায় ১৯৩৪ সালে। ২৬ বছর একটানা দেশের বিভিন্নস্থানে এই গান গেয়ে বেড়ান লেড বেলি। বেলির গান রেকর্ডের পরও এই গান একাধিকবার পুর্নলিখন হয়েছে। বিভিন্ন শিল্পী মূল সুর অবিকৃত রেখে নিজেদের মতো করে গেয়েছে। তবে পৃথিবীব্যাপি এই গান অনেকটাই ছড়িয়েছে এরিক ক্ল্যাপটন। ক্ল্যাপটনের গাওয়া গানে আধুনিকতার ছাপ পাওয়া যায়। আর তার নিজস্ব গায়কী ও সঙ্গীতায়োজনও এর জনপ্রিয়তা বাড়ানোয় বড় ভূমিকা রাখে। তবে লেড বেলি ছাড়াও গুডনাইট আইরিন এর জনপ্রিয়তা বাড়ানোয় বড় ভূমিকা ছিলো ৪০ এর দশকের শেষ দিকে গড়ে উঠা ব্যান্ড দ্যা ওয়েভার্স। যেই ব্যান্ডে এক সময় কিনা পৃথিবী বিখ্যাত ফোক শিল্পী পিট সিগারও গান গাইতো। বেলির পর ওয়েভার্সই দ্বিতীয় কোনও ব্যক্তি বা ব্যন্ড যারা গুডনাইট আইরিন কোরাস করে রেকর্ড করছিলো।
মূল গানটার নামে ইউটিউবে একটা ভিডিও আছে। যাতে নাকি লেড বেলি নিজেই গানটা গাইছে এমন। কিন্তু আমার কিছুটা সন্দেহ হয় এই ভিডিওটায়। কারণ, ১৯৪৯ সালে লেড বেলি মারা যান। তার আগে এত চমৎকার ভিডিও আর রেকর্ড কিছুটা বিশ্বাসহীনতার তৈরি করেই।
এক প্রকার ভালোলাগা-ভালোবাসা থেকেই গুডনাইট আইরিন গানটার প্রথম ভার্সনটা অনুবাদ করি।
আইরিন শুভরাত্রী, আইরিন শুভ রাত্রী,
শুভ রাত্রী আইরিন, শুভরাত্রী আইরিন
তুমি আসবে স্বপ্নে ফিরে আসবে।

গেলো শনিবার আমি বিয়ে করেছিলাম
একসাথেই ছিলাম আমরা
এখন আর নেই
এবার আবার আমি ফিরে যাবো আমার শহরে।

হয়তো থাকবো এই দেশেই
কখনো এই শহরেই
কখনো হয়তো ভাববো অনেক কিছু
নদীতে কাটবো সাঁতার, ডুব দিবো অতলে

আইরিনকেই ভালোবাসি আমি, ঈশ্বর তা জানে
তারেই ভালোবাসবো, যতদিন সাগর না শুকায়
যদি আমাকে সে ফেরায়
মরে যাবো আমি বিষ পানে।

এলোমেলো হয়ো না, জুয়া খেলো না আর
রাতে করে বাড়ি ফিরো
বাড়ি যাও, স্ত্রীর কাছে পরিবারের কাছে
ফায়ারপ্লেসের মতো আরো উজ্জ্বল করো চারপাশ


লেড ভেলির গলায় গাওয়া দাবি করা ভিডিও


দ্যা ওয়েভার্স ব্যান্ডের গাওয়া ভিডিও 


এরিক ক্ল্যাপটন এর গানের লিংক দেয়া হলো। 

Read More

শুক্রবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৫

 

ধরেন মগবাজারের জ্যামে বইসা আছেন। তখন নিজেরে নিশ্চয়ই আপনে গালি দিবেন, তিরস্কার করবেন। বলবেন, ঢাকা শহরের মানুষ না হইলে কত্ত আরাম। মগবাজারের জ্যাম-এ পরতে হয় না। আবার একই রকম মনে হইবো আপ্নের রামপুরা ব্রীজ, মালিবাগ, বনানী সিগনাল, পুরান ঢাকার সর্বত্র। আর রাতের বেলা যখন রাস্তা ফাঁকা থাকে তখন? উত্তরা থেকে পলাশির মোড় যাইতে সর্বোচ্চ ২০ মিনিট। অন্য সময়ে আপনার হয়তো এইটুক রাস্তা যাইতে দুই ঘন্টা বা তার বেশী লাগে। কিন্তু আপনার যেই গতিতে চলার কথা, সেই গতিতে চলতেছেন। রাস্তায়ও কোনও জ্যাম নাই। কিন্তু ত্রিশ মিনিট আগে যেইখানে ছিলেন এখনো সেইখানেই তখন আপনার কেমন লাগবে? আপনার কেমন লাগবে আমি জানি না। তবে আমি এই রকমই বিভ্রান্ত হইছিলাম দুই দিন আগে।

হাওড়ের জীবনটা নদী থেকে দেখার ইচ্ছায়, ট্রলারে করে ফিরতেছি। দূরে একটা গ্রাম দেখাইয়া পাশের মুরুব্বীরে জিগাইলাম, মুরব্বী এইটা কোন গ্রাম? মুরুব্বী জানাইলেন, গ্রামের নাম জগন্নাথপুর। আচ্ছা। আধঘন্টা পর আবারো আরেকটা গ্রাম দেখাইয়া জিগাইলাম। ট্রলারের ছাদের বিকেলের রোদে বসা মুরুব্বী একবার তাকাইলেন গ্রামের দিকে। উত্তর দিলেন, জগন্নাথপুর! মানে? আধাঘন্টা ধইরা কি তবে আগাইতেছি না? আমার প্রশ্নে মুরুব্বী স্মিত হেসে উত্তর দিলেন। নদী পথ তো, এই রকমই। আমরা এতক্ষণ পূবে ছিলাম, এখন উত্তরে। তার মানে নদী যেদিক দিয়া গেছে আমরাও এইদিক দিয়াই যাইতেছি। অ আচ্ছা।

এইটা হৈলো খালিয়াজুড়ি থেকে ট্রলারে করে নাওটানা ফেরার অভিজ্ঞতা। কুয়াশা না থাকলে নাওটানা থেকে ট্রলারের ছাদে উঠলে খালিয়াজুড়ি দেখা যায়। উপজেলা সদরটা এত ছোট যে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাইতে পাঁচ-দশ মিনিট হাঁটলেই চলে। শুকনা মৌসুমে তবুও নৌকা ছাড়া যাতায়াত করার উপায় আছে। মানে দুই ধরনের ট্রান্সপোর্ট আছে। এক হইলো ভটভটি, আর এক হইলো ভাড়ায় চালিত মোটর সাইকেল। কিন্তু বর্ষা মৌসুমে? নৌকা ছাড়া কোনও উপায় নাই। চারপাশে তাকালে কেবল মনে হয় ঢেউ ছাড়া সমুদ্র। আর গ্রামগুলো হঠাৎ হঠাৎ একটা দ্বীপের মতোন।

বলা যায় বাংলাদেশের অন্যতম দুর্গম উপজেলাগুলোর একটা হইলো এই খালিয়াজুড়ি। ঢাকা থেকে সবচে সহজ পথেও যাইতে হইলে আপনাকে চারবার ট্রান্সপোর্ট বদল করতে হবে। এর মাঝে স্থলপথ ও নদীপথের একাধিক মাধ্যম আপনাকে গ্রহণ করতে হবেই। এক কথায় খালিয়াজুড়ির এই হৈলো বিশেষত্য। এখানকার মানুষ খুব বেশী কিছু চায় না। তাদের প্রয়োজনীয় যা যা দরকার তারা কেবল তাই চায়। যেমন? তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না। যা আছে তাতেই তারা সন্তুষ্ট। তবে যেই বিষয়টা এখানকার মানুষদের কথা চিন্তা করলে সবচে বেশী যন্ত্রণা দেয় তা হইলো এখানকার অর্থনৈতিক জীবন কাঠামো খুবই দুর্বল। বছরে ছয় মাস তাদের কোনও রোজগার থাকে না। কেবলমাত্র মাছ ধরা ছাড়া। কেউ কেউ এই সময় অর্থের অভাবে এলাকা ছেড়ে ডাঙ্গায় কাজের উদ্দেশ্যে পারি জমায়। অথচ আপাত দৃষ্টিতে খুব স্বাধারণ একটা জায়গা হইলেও শীতের সকালে এইসব গ্রামগুলো কি যে সুন্দর হয়ে উঠে। আর কি যে অপার্থিব নীরবতা সেইসব গ্রামে। আমার ব্যার্থতা সেই নীরবতাকে আমি ধারণ করতে পারিনি। উল্টো আরো মুখর হয়ে ফিরে এসেছি। আসা যাওয়ার পথে বয়ে বেড়িয়েছি অন্য যাতনা। অথচ যা স্বাভাবিক ছিলো না কিছুতেই।
খালিয়াজুড়ির খুব ধীর গতির। যেহেতু ছোট মফস্বল। তাই সেখানকার অধিকাংশ মানুষের মন ছোট, এমনটা সেইখানে যারা কাজ করতে যায় তারা বলে। তবে এর বিপরীত চিত্রও আমরা দেখতে পাই।

তবে অর্থনৈতিক কাঠামো দুর্বল হইলেও বাংলাদেশের আদী ও অকৃত্রিম যে রূপ তার অনেকটাই কিন্তু সেই খালিয়াজুড়িতে পাওয়া যায়। শীত মৌসুমে যখন হাওর অঞ্চল শুকনো থাকে তখন সেখানে শীত যাপনের জন্য পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে স্থানীয়দের অর্থের সংকটটা কমতো। আমার এমনই ভাবনা। তাই শীত থাকতে থাকতে আমি মনে হয় আবারো যাবো খালিয়াজুড়ি।



কীভাবে যেতে পারেন খালিয়াজুড়ি
দুই পথে খালিয়াজুড়ি যাওয়া যায়। তবে সবচে সহজ ও দ্রুততর পথ হলো মোহনগঞ্জ হয়ে। ঢাকা থেকে হাওর এক্সপ্রেস এ চড়ে সোজা মোহনগঞ্জ। ভাড়া চেয়ার কোচে ২১০ টাকা। শোভন ১৫০। মোহনগঞ্জ স্টেশনের কাছ থেকেই সিএনজি চলে বোয়ালিয়া পর্যন্ত। প্রতিটা সিএনজিতে ৫জন করে তোলে। জন প্রতি ভাড়া ৬০ টাকা। বোয়ালিয়া গিয়ে একটা নদী পার হইতে হবে। ব্রীজ আছে। এইখান থেকেই মূলত: হাওর অঞ্চল শুরু। বর্ষায় এইখান থেকেই সরাসরি খালিয়াজুড়ি বা হাওরের যে কোনও থানা, গ্রামের ট্রলার যায়। ব্রীজ পার হয়ে মোটর সাইকেলে করে সরাসরি খালিয়াজুড়ি যাওয়া যায়। এতে সময় কম লাগে। আর মূল পাকা রাস্তাটাও চেনা হয়ে যাওয়ার একটা সুযোগ থাকে। তবে খরচ একটু বেশী। দুইজন যাত্রী তোলে। ভাড়া ৩শ টাকা। সময় লাগে মাত্র ৪০ মিনিট। আর এখান থেকে মোটরসাইকেলে নাওটানা গিয়ে সেখান থেকে সকাল ৮টার ট্রলারে খালিয়াজুড়ি যাওয়া যায়। নদীপথে, ভাড়া মাত্র ৪০ টাকা। তবে নদীপথে সময় লাগে দেড় ঘন্টা। তারপর নাওটানা পর্যন্ত তো যেতেই মোটরসাইকেলে ১৫ মিনিটের বেশী লাগে না। দুইজনে ভাড়া নেয় ১শ টাকা।

একে তো দুর্গম পথ তারওপর, জনপ্রিয় কোনও ট্যুরিস্ট স্পট না। তবুও আপনার ভালো লাগবে। যদিও মন্দ লাগার মতোও অনেক কিছু আছে সেখানে, আপনি তো আর সেগুলোর জন্য যাচ্ছেন না। 

সবগুলো ছবি তুলেছেন তানভীর আশিক

যেইখানে একই নিয়মে সূর্য উঠে ও ডুবে

at শুক্রবার, ডিসেম্বর ১১, ২০১৫  |  No comments

 

ধরেন মগবাজারের জ্যামে বইসা আছেন। তখন নিজেরে নিশ্চয়ই আপনে গালি দিবেন, তিরস্কার করবেন। বলবেন, ঢাকা শহরের মানুষ না হইলে কত্ত আরাম। মগবাজারের জ্যাম-এ পরতে হয় না। আবার একই রকম মনে হইবো আপ্নের রামপুরা ব্রীজ, মালিবাগ, বনানী সিগনাল, পুরান ঢাকার সর্বত্র। আর রাতের বেলা যখন রাস্তা ফাঁকা থাকে তখন? উত্তরা থেকে পলাশির মোড় যাইতে সর্বোচ্চ ২০ মিনিট। অন্য সময়ে আপনার হয়তো এইটুক রাস্তা যাইতে দুই ঘন্টা বা তার বেশী লাগে। কিন্তু আপনার যেই গতিতে চলার কথা, সেই গতিতে চলতেছেন। রাস্তায়ও কোনও জ্যাম নাই। কিন্তু ত্রিশ মিনিট আগে যেইখানে ছিলেন এখনো সেইখানেই তখন আপনার কেমন লাগবে? আপনার কেমন লাগবে আমি জানি না। তবে আমি এই রকমই বিভ্রান্ত হইছিলাম দুই দিন আগে।

হাওড়ের জীবনটা নদী থেকে দেখার ইচ্ছায়, ট্রলারে করে ফিরতেছি। দূরে একটা গ্রাম দেখাইয়া পাশের মুরুব্বীরে জিগাইলাম, মুরব্বী এইটা কোন গ্রাম? মুরুব্বী জানাইলেন, গ্রামের নাম জগন্নাথপুর। আচ্ছা। আধঘন্টা পর আবারো আরেকটা গ্রাম দেখাইয়া জিগাইলাম। ট্রলারের ছাদের বিকেলের রোদে বসা মুরুব্বী একবার তাকাইলেন গ্রামের দিকে। উত্তর দিলেন, জগন্নাথপুর! মানে? আধাঘন্টা ধইরা কি তবে আগাইতেছি না? আমার প্রশ্নে মুরুব্বী স্মিত হেসে উত্তর দিলেন। নদী পথ তো, এই রকমই। আমরা এতক্ষণ পূবে ছিলাম, এখন উত্তরে। তার মানে নদী যেদিক দিয়া গেছে আমরাও এইদিক দিয়াই যাইতেছি। অ আচ্ছা।

এইটা হৈলো খালিয়াজুড়ি থেকে ট্রলারে করে নাওটানা ফেরার অভিজ্ঞতা। কুয়াশা না থাকলে নাওটানা থেকে ট্রলারের ছাদে উঠলে খালিয়াজুড়ি দেখা যায়। উপজেলা সদরটা এত ছোট যে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাইতে পাঁচ-দশ মিনিট হাঁটলেই চলে। শুকনা মৌসুমে তবুও নৌকা ছাড়া যাতায়াত করার উপায় আছে। মানে দুই ধরনের ট্রান্সপোর্ট আছে। এক হইলো ভটভটি, আর এক হইলো ভাড়ায় চালিত মোটর সাইকেল। কিন্তু বর্ষা মৌসুমে? নৌকা ছাড়া কোনও উপায় নাই। চারপাশে তাকালে কেবল মনে হয় ঢেউ ছাড়া সমুদ্র। আর গ্রামগুলো হঠাৎ হঠাৎ একটা দ্বীপের মতোন।

বলা যায় বাংলাদেশের অন্যতম দুর্গম উপজেলাগুলোর একটা হইলো এই খালিয়াজুড়ি। ঢাকা থেকে সবচে সহজ পথেও যাইতে হইলে আপনাকে চারবার ট্রান্সপোর্ট বদল করতে হবে। এর মাঝে স্থলপথ ও নদীপথের একাধিক মাধ্যম আপনাকে গ্রহণ করতে হবেই। এক কথায় খালিয়াজুড়ির এই হৈলো বিশেষত্য। এখানকার মানুষ খুব বেশী কিছু চায় না। তাদের প্রয়োজনীয় যা যা দরকার তারা কেবল তাই চায়। যেমন? তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না। যা আছে তাতেই তারা সন্তুষ্ট। তবে যেই বিষয়টা এখানকার মানুষদের কথা চিন্তা করলে সবচে বেশী যন্ত্রণা দেয় তা হইলো এখানকার অর্থনৈতিক জীবন কাঠামো খুবই দুর্বল। বছরে ছয় মাস তাদের কোনও রোজগার থাকে না। কেবলমাত্র মাছ ধরা ছাড়া। কেউ কেউ এই সময় অর্থের অভাবে এলাকা ছেড়ে ডাঙ্গায় কাজের উদ্দেশ্যে পারি জমায়। অথচ আপাত দৃষ্টিতে খুব স্বাধারণ একটা জায়গা হইলেও শীতের সকালে এইসব গ্রামগুলো কি যে সুন্দর হয়ে উঠে। আর কি যে অপার্থিব নীরবতা সেইসব গ্রামে। আমার ব্যার্থতা সেই নীরবতাকে আমি ধারণ করতে পারিনি। উল্টো আরো মুখর হয়ে ফিরে এসেছি। আসা যাওয়ার পথে বয়ে বেড়িয়েছি অন্য যাতনা। অথচ যা স্বাভাবিক ছিলো না কিছুতেই।
খালিয়াজুড়ির খুব ধীর গতির। যেহেতু ছোট মফস্বল। তাই সেখানকার অধিকাংশ মানুষের মন ছোট, এমনটা সেইখানে যারা কাজ করতে যায় তারা বলে। তবে এর বিপরীত চিত্রও আমরা দেখতে পাই।

তবে অর্থনৈতিক কাঠামো দুর্বল হইলেও বাংলাদেশের আদী ও অকৃত্রিম যে রূপ তার অনেকটাই কিন্তু সেই খালিয়াজুড়িতে পাওয়া যায়। শীত মৌসুমে যখন হাওর অঞ্চল শুকনো থাকে তখন সেখানে শীত যাপনের জন্য পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে স্থানীয়দের অর্থের সংকটটা কমতো। আমার এমনই ভাবনা। তাই শীত থাকতে থাকতে আমি মনে হয় আবারো যাবো খালিয়াজুড়ি।



কীভাবে যেতে পারেন খালিয়াজুড়ি
দুই পথে খালিয়াজুড়ি যাওয়া যায়। তবে সবচে সহজ ও দ্রুততর পথ হলো মোহনগঞ্জ হয়ে। ঢাকা থেকে হাওর এক্সপ্রেস এ চড়ে সোজা মোহনগঞ্জ। ভাড়া চেয়ার কোচে ২১০ টাকা। শোভন ১৫০। মোহনগঞ্জ স্টেশনের কাছ থেকেই সিএনজি চলে বোয়ালিয়া পর্যন্ত। প্রতিটা সিএনজিতে ৫জন করে তোলে। জন প্রতি ভাড়া ৬০ টাকা। বোয়ালিয়া গিয়ে একটা নদী পার হইতে হবে। ব্রীজ আছে। এইখান থেকেই মূলত: হাওর অঞ্চল শুরু। বর্ষায় এইখান থেকেই সরাসরি খালিয়াজুড়ি বা হাওরের যে কোনও থানা, গ্রামের ট্রলার যায়। ব্রীজ পার হয়ে মোটর সাইকেলে করে সরাসরি খালিয়াজুড়ি যাওয়া যায়। এতে সময় কম লাগে। আর মূল পাকা রাস্তাটাও চেনা হয়ে যাওয়ার একটা সুযোগ থাকে। তবে খরচ একটু বেশী। দুইজন যাত্রী তোলে। ভাড়া ৩শ টাকা। সময় লাগে মাত্র ৪০ মিনিট। আর এখান থেকে মোটরসাইকেলে নাওটানা গিয়ে সেখান থেকে সকাল ৮টার ট্রলারে খালিয়াজুড়ি যাওয়া যায়। নদীপথে, ভাড়া মাত্র ৪০ টাকা। তবে নদীপথে সময় লাগে দেড় ঘন্টা। তারপর নাওটানা পর্যন্ত তো যেতেই মোটরসাইকেলে ১৫ মিনিটের বেশী লাগে না। দুইজনে ভাড়া নেয় ১শ টাকা।

একে তো দুর্গম পথ তারওপর, জনপ্রিয় কোনও ট্যুরিস্ট স্পট না। তবুও আপনার ভালো লাগবে। যদিও মন্দ লাগার মতোও অনেক কিছু আছে সেখানে, আপনি তো আর সেগুলোর জন্য যাচ্ছেন না। 

সবগুলো ছবি তুলেছেন তানভীর আশিক

Read More

শুক্রবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৫

'এমন না যে রমিজের জীবনে এ ঘটনা অনেকবার ঘটেছে। তবুও যেদিন বিষ্যুদবার, কুলুকুলু হাওয়া বয়। রমিজ গাছে উঠে, ভোরে। শালিখ পাখির বাসা পার হয়ে বিমান ধরে।'

বাস্তব নয়, তবে ভিস্যুয়াল বা ভার্চুয়াল যাই বলি না কেন রমিজের সাথে আমার পরিচয় প্রায় দশ বছর আগে। ময়মনসিংহের তিন কোনা পুকুর পাড়ের মেস বাড়িতে আমাদের কয়েকজনের মধ্যরাতের বিনোদন ছিলো দুটি টিভি ধারাবাহিক। যার একটা ছিলো রঙের মানুষ আর একটা রমিজের আয়নাসেইটা ছিলো আমাদের অনেকের দেখা সবশেষ টিভি ধারাবাহিক। তারপর আর টিভি ধারাবাহিক দেখার সময়-সুযোগ ও আগ্রহ কোনওটাই হয় নি। যদিও বিদেশী টিভি সিরিজ দেখা হয় কিছু। তবে এর মাঝে হালের জনপ্রিয় গেইম অব থ্রোনস এর মতো সিরিজও আমি মিস করছি। আগ্রহই তৈরি হয় নি। আমার এরকম হয়। আবার শার্লকের মতো সিরিজ আমি নিয়মিত দেখি। আগ্রহ তৈরি হয় বলেই আমি দেখি। যাই হোক, টিভি ধারাবাহিক নিয়ে বকর বকর মুখ্য বিষয় না।  মুখ্য হলো রমিজ। যেই রমিজের আয়নায় আমার ভার্চুয়াল/পর্দার রমিজের সাথে পরিচয়। যেই রমিজ কাজের খোঁজে ঢাকায় এসে এক অদ্ভুত জটিলতার মুখোমুখি হয়। সেই রমিজ যাপিত জীবনের তাগিদে ধীরে ধীরে এক পঙ্কিল পৃথিবীতে ঢুকে যায়। যেমন আমরাও ঢুকে আছি। কেউ হয়তো স্বীকার করবেন, কেউ করবেন না। কিন্তু প্রত্যেকটা মানুষের জীবনেই নাটুকে রমিজের মতো পঙ্কিলতা আছে। তবে নাটকের রমিজও কিন্তু আমার আলোচনার বিষয় নয়। আমার আলোচনার বিষয় অন্য রমিজ। সেই রমিজও নাটকের রমিজের মতো জ্যামে বসে থাকে। গরমে ঘেমে একাকার হয়। বিরক্তিতে মুখ বাকানো ছাড়া আর কিছু করতে পারে না। তবে সেই রমিজও স্বপ্ন দেখে এইসব পঙ্কিলতা, যন্ত্রণাকে এড়িয়ে একটা সুন্দর পৃথিবীর। সেই সুন্দর পৃথিবীটা কি হইতে পারে সেই আলোচনা অন্য কোনও দিন করা যাইতে পারে। যেহেতু আমাদের ‌এই দিন দিন না, আরও দিন আছে
রমিজের প্রসঙ্গটা আসছে সে আসলে আমাদের কাছে বাস্তব হয়ে দাঁড়াইছে বলে। কারণ আমাদের রমিজের বাড়িও আছে। শেষবার আমি রমিজের সেই বাড়ি গেছিলাম তখন শুক্রবার। তার আগেও গেছিলাম। সেইটাও শুক্রবার ছিলো। শুক্রবারে রমিজের বাড়িতে মনে হয় গেস্ট একটু বেশী থাকে। যাই হোক, রমিজের বাড়িটা বেশিদিন টিকবে না। সেখানে অন্য কেউ বাড়ি করবে। কারণ রমিজ বাড়ি করছে ঢাকার মোহাম্মদপুরের আর্টস গ্যালারি কলা কেন্দ্রতে। তার বাড়ির মেয়াদ ডিসেম্বরের দশ তারিখ পর্যন্ত। এই কয়দিন পর্যন্ত রমিজের বাড়িটার প্রাতিষ্ঠানিক নাম হাউ ডু আই রেন্ট এ প্লেইনএইটা কবি ও শিল্পী রাজীব দত্তর প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনী।
রাজীবের সেই পৃথিবীকে রাজীব বলে অর্থহীন। আসলেই তো অর্থহীন। কিন্তু বললেই কি অর্থহীনতা দাঁড়ায়। বিষয়টা আসলে কি? পরীক্ষার প্রশ্নের মতো যদি উত্তর খুঁজি, অর্থহীনতা বলতে কি বুঝি? কীভাবে অর্থহীনতা বাস্তবতায় রূপ নেয়? এইসব জটিল প্রশ্নের আপাত: সহজ উত্তর আসলে ঐ প্রদর্শনীটা। এক ধরনের প্রশ্ন ফাঁস করে দেয়ার মতো। তবে এই প্রশ্ন আর এই উত্তর হাতে পেলেও আপনি রমিজ সম্পর্কে ঠিক উত্তরটি লিখতে পারবেন না। রাজীবের জগৎটা এমনই। কেমন? এক টিভি সাংবাদিক তাকে জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা আপনার প্রদর্শনীর নাম হাউ ডু আই রেন্ট এ প্লেইন কেনো? ছোটখাটো মানুষটার উত্তরটাও ছোট। বলে কী না, আমার যদি একটা প্লেইন থাকতো তাইলে তো জ্যামের মধ্যে গরমের মধ্যে বসে কষ্ট করতে হইতো না। তো রমিজেরও এই রকম ইচ্ছা করে। আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে একটা করে রমিজ আছেআরে বলে কি! প্রত্যেকের মধ্যে রমিজ আছে? এই কথাই তো শুরুতে বলতে চাইছিলাম।
হ্যা, আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে যে রমিজ আছে। আর সেই রমিজ যে বিভিন্ন সময় এলোমেলো ভাবনাগুলো ভাবে সেগুলোই অনেকাংশে এই প্রদর্শনীর দেয়াল জুড়ে। যেমন রমিজকে আমরা পলাশীর আম বাগানে দেখতে পাই। সেইখানে গিয়া রমিজ কি করে? রাজীবের ভাষ্যে যদি উত্তর খুঁজি তবে পাই, পলাশীর আম্র কাননে রমিজ। এই রমিজকে ১৭৫৭ সালের আগে দেখা যায় নাই। সিরাজ ও রমিজ লর্ড ক্লাইভের হাতে মরিচ আর নুন জিম্মা রাখছে। পলাশীর আম বাগানে যদি বাংলার স্বাধীনতার প্রথম পতন হিসেবে দেখি, তাহলে ভাবতেই পারি এই যে আমরা যারা ইতিহাসের কিছু সংখ্যা আর তাদের ভাব সম্প্রসারণ জানি, তারা সবাই তো রমিজই। কারণ সিরাজ তো আমাদের নিয়া সেই সময় ক্লাইভের কাছেই সব কিছু সমর্পণ করছিলো। ইতিহাস তো তাই বলে। এইভাবে রমিজের আপাত: অর্থহীন ভাষ্য আমাদের একটা নয়া দুইন্যার সামনে দাঁড় করাইয়া দেয়। আমরা অর্থহীনতার মাঝেও অর্থ পাইছি।

রাজীবের এই জগতের সাথে পরিচিত হইতে পারা দারুন। যারা ভার্চুয়াল জীবন কিছুটা হৈলেও যাপন করেন, তাদের কাছে তার এই জগৎ পুরোপুরি নতুন না হইলেও একেবারে পুরাতনও না। কিন্তু যেই বিষয়টা না বললেই নয়, তা হইলো দৈত্য (রাজীব দত্ত কে আমি দৈত্যই ডাকি, হয়তো আরও কেউ কেউ ডাকে) তার শিল্পকলার মধ্য দিয়ে একটা অর্থহীন গল্প বলছেন। এই গল্পেরও একটা খন্ড খন্ড অর্থ যেহেতু আমাদের কাছে দাঁড়ায়া যায়, তাই একটা সামগ্রিক অর্থও দাঁড়াইতে পারে। যেমন দৈত্যর ছবিতে যখন লেখা থাকে পাখিরা কখনো রান্না করা মাছ খেয়ে দেখে নি। তাই তার পোষা রাখির জন্য রমিজ রান্না মাছ নিয়ে যায়। রমিজ গাছে উঠে পাখিকে পাখির মতো ডাকে- আসো খাই, মাছ খাই। (পাখিদের একটা পায়ে লোম থাকে)তখন কি মনে হয় আপনার? মনে হয় না একটা ভিন্ন কল্পনার জগতের কথা? যেই জগতের কথা আমরা ভাবি না। ভাবতে গেলে অস্পষ্ট একটা পৃথিবীর ছবি আমরা দেখতে পাই। চিত্রকলার ভাষায় তারে কি কয়? আমি চিত্রকলা বুঝি না। আমি বুঝি একটা অধিবাস্তব পৃথিবী, যা আমাদের চারপাশ ঘিরে রেখেছে সেই ছবি এঁকেছেন রাজীব। আর সাথে বলেছেন সেই পৃথিবীর গল্প।
এমন না যে রমিজ ইতিহাসের হাস্যকর কল্পনা আর চলমান পৃথিবীর অধিবাস্তব গল্পেই জীবন যাপন করে। সে অধিকতর বাস্তবেও বসবাস করে। যেমন রমিজ বলে, হাতিরঝিল হাতিদের কাছে কেমন, তা রমিজ জানে নাআপনি জানেন? আপনার কি একটা লেজ আছে?  যেইটা বালিশের নিচে লুকিয়ে রাখেন? নাই তো! দেখুন তো আছে কি না। আপনার সহপাঠি, সহকর্মী বা বন্ধুর প্রশংসাই তো করেন তার সামনে। আর আড়ালে? তাকে যে ঈর্ষা বা ঘৃণাটা করেন সেইটা কি আপনার একটা লেজ না? আমার এই যুক্তি আপনার পছন্দ নাও হৈতে পারে। আদতে পছন্দ হইতেই হবে এমন কোনও কথাও না। কিন্তু দেখেন এইভাবে আপনার ভেতর যে মানবিকতাবোধ আছে, তার আড়ালে তো একটা পশুত্বও আছে। সেই পশুত্বকে যদি একটা হাতি ভাবতে চাই তবে খুব বেশী কি অপরাধ হবে? আপনার পশুটার চাওয়াগুলোও তো পশুটার মতো বিশাল! তাই বলে এই ছবি দৈত্য এঁকে ফেলছে। বুঝলেন মশাই! সেই ছবিটা কেমন? রমিজ যেভাবে হাতি ভাবে। এমন না যে সে প্রতিদিন হাতি ভাবে। তবে ভাবা হাতির ২টা লেজ থাকবে, ২টা শুঁড়। ১টা লেজ এবং ১টা শুঁড় রমিজের নিজের। এগুলো সে বালিশের নিচে রাখে ছবিটা এমন।


‘পাখিদের ছায়া ভিজে গেলে এরোপ্লেন তৈরি হয়’

at শুক্রবার, ডিসেম্বর ০৪, ২০১৫  |  1 comment

'এমন না যে রমিজের জীবনে এ ঘটনা অনেকবার ঘটেছে। তবুও যেদিন বিষ্যুদবার, কুলুকুলু হাওয়া বয়। রমিজ গাছে উঠে, ভোরে। শালিখ পাখির বাসা পার হয়ে বিমান ধরে।'

বাস্তব নয়, তবে ভিস্যুয়াল বা ভার্চুয়াল যাই বলি না কেন রমিজের সাথে আমার পরিচয় প্রায় দশ বছর আগে। ময়মনসিংহের তিন কোনা পুকুর পাড়ের মেস বাড়িতে আমাদের কয়েকজনের মধ্যরাতের বিনোদন ছিলো দুটি টিভি ধারাবাহিক। যার একটা ছিলো রঙের মানুষ আর একটা রমিজের আয়নাসেইটা ছিলো আমাদের অনেকের দেখা সবশেষ টিভি ধারাবাহিক। তারপর আর টিভি ধারাবাহিক দেখার সময়-সুযোগ ও আগ্রহ কোনওটাই হয় নি। যদিও বিদেশী টিভি সিরিজ দেখা হয় কিছু। তবে এর মাঝে হালের জনপ্রিয় গেইম অব থ্রোনস এর মতো সিরিজও আমি মিস করছি। আগ্রহই তৈরি হয় নি। আমার এরকম হয়। আবার শার্লকের মতো সিরিজ আমি নিয়মিত দেখি। আগ্রহ তৈরি হয় বলেই আমি দেখি। যাই হোক, টিভি ধারাবাহিক নিয়ে বকর বকর মুখ্য বিষয় না।  মুখ্য হলো রমিজ। যেই রমিজের আয়নায় আমার ভার্চুয়াল/পর্দার রমিজের সাথে পরিচয়। যেই রমিজ কাজের খোঁজে ঢাকায় এসে এক অদ্ভুত জটিলতার মুখোমুখি হয়। সেই রমিজ যাপিত জীবনের তাগিদে ধীরে ধীরে এক পঙ্কিল পৃথিবীতে ঢুকে যায়। যেমন আমরাও ঢুকে আছি। কেউ হয়তো স্বীকার করবেন, কেউ করবেন না। কিন্তু প্রত্যেকটা মানুষের জীবনেই নাটুকে রমিজের মতো পঙ্কিলতা আছে। তবে নাটকের রমিজও কিন্তু আমার আলোচনার বিষয় নয়। আমার আলোচনার বিষয় অন্য রমিজ। সেই রমিজও নাটকের রমিজের মতো জ্যামে বসে থাকে। গরমে ঘেমে একাকার হয়। বিরক্তিতে মুখ বাকানো ছাড়া আর কিছু করতে পারে না। তবে সেই রমিজও স্বপ্ন দেখে এইসব পঙ্কিলতা, যন্ত্রণাকে এড়িয়ে একটা সুন্দর পৃথিবীর। সেই সুন্দর পৃথিবীটা কি হইতে পারে সেই আলোচনা অন্য কোনও দিন করা যাইতে পারে। যেহেতু আমাদের ‌এই দিন দিন না, আরও দিন আছে
রমিজের প্রসঙ্গটা আসছে সে আসলে আমাদের কাছে বাস্তব হয়ে দাঁড়াইছে বলে। কারণ আমাদের রমিজের বাড়িও আছে। শেষবার আমি রমিজের সেই বাড়ি গেছিলাম তখন শুক্রবার। তার আগেও গেছিলাম। সেইটাও শুক্রবার ছিলো। শুক্রবারে রমিজের বাড়িতে মনে হয় গেস্ট একটু বেশী থাকে। যাই হোক, রমিজের বাড়িটা বেশিদিন টিকবে না। সেখানে অন্য কেউ বাড়ি করবে। কারণ রমিজ বাড়ি করছে ঢাকার মোহাম্মদপুরের আর্টস গ্যালারি কলা কেন্দ্রতে। তার বাড়ির মেয়াদ ডিসেম্বরের দশ তারিখ পর্যন্ত। এই কয়দিন পর্যন্ত রমিজের বাড়িটার প্রাতিষ্ঠানিক নাম হাউ ডু আই রেন্ট এ প্লেইনএইটা কবি ও শিল্পী রাজীব দত্তর প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনী।
রাজীবের সেই পৃথিবীকে রাজীব বলে অর্থহীন। আসলেই তো অর্থহীন। কিন্তু বললেই কি অর্থহীনতা দাঁড়ায়। বিষয়টা আসলে কি? পরীক্ষার প্রশ্নের মতো যদি উত্তর খুঁজি, অর্থহীনতা বলতে কি বুঝি? কীভাবে অর্থহীনতা বাস্তবতায় রূপ নেয়? এইসব জটিল প্রশ্নের আপাত: সহজ উত্তর আসলে ঐ প্রদর্শনীটা। এক ধরনের প্রশ্ন ফাঁস করে দেয়ার মতো। তবে এই প্রশ্ন আর এই উত্তর হাতে পেলেও আপনি রমিজ সম্পর্কে ঠিক উত্তরটি লিখতে পারবেন না। রাজীবের জগৎটা এমনই। কেমন? এক টিভি সাংবাদিক তাকে জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা আপনার প্রদর্শনীর নাম হাউ ডু আই রেন্ট এ প্লেইন কেনো? ছোটখাটো মানুষটার উত্তরটাও ছোট। বলে কী না, আমার যদি একটা প্লেইন থাকতো তাইলে তো জ্যামের মধ্যে গরমের মধ্যে বসে কষ্ট করতে হইতো না। তো রমিজেরও এই রকম ইচ্ছা করে। আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে একটা করে রমিজ আছেআরে বলে কি! প্রত্যেকের মধ্যে রমিজ আছে? এই কথাই তো শুরুতে বলতে চাইছিলাম।
হ্যা, আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে যে রমিজ আছে। আর সেই রমিজ যে বিভিন্ন সময় এলোমেলো ভাবনাগুলো ভাবে সেগুলোই অনেকাংশে এই প্রদর্শনীর দেয়াল জুড়ে। যেমন রমিজকে আমরা পলাশীর আম বাগানে দেখতে পাই। সেইখানে গিয়া রমিজ কি করে? রাজীবের ভাষ্যে যদি উত্তর খুঁজি তবে পাই, পলাশীর আম্র কাননে রমিজ। এই রমিজকে ১৭৫৭ সালের আগে দেখা যায় নাই। সিরাজ ও রমিজ লর্ড ক্লাইভের হাতে মরিচ আর নুন জিম্মা রাখছে। পলাশীর আম বাগানে যদি বাংলার স্বাধীনতার প্রথম পতন হিসেবে দেখি, তাহলে ভাবতেই পারি এই যে আমরা যারা ইতিহাসের কিছু সংখ্যা আর তাদের ভাব সম্প্রসারণ জানি, তারা সবাই তো রমিজই। কারণ সিরাজ তো আমাদের নিয়া সেই সময় ক্লাইভের কাছেই সব কিছু সমর্পণ করছিলো। ইতিহাস তো তাই বলে। এইভাবে রমিজের আপাত: অর্থহীন ভাষ্য আমাদের একটা নয়া দুইন্যার সামনে দাঁড় করাইয়া দেয়। আমরা অর্থহীনতার মাঝেও অর্থ পাইছি।

রাজীবের এই জগতের সাথে পরিচিত হইতে পারা দারুন। যারা ভার্চুয়াল জীবন কিছুটা হৈলেও যাপন করেন, তাদের কাছে তার এই জগৎ পুরোপুরি নতুন না হইলেও একেবারে পুরাতনও না। কিন্তু যেই বিষয়টা না বললেই নয়, তা হইলো দৈত্য (রাজীব দত্ত কে আমি দৈত্যই ডাকি, হয়তো আরও কেউ কেউ ডাকে) তার শিল্পকলার মধ্য দিয়ে একটা অর্থহীন গল্প বলছেন। এই গল্পেরও একটা খন্ড খন্ড অর্থ যেহেতু আমাদের কাছে দাঁড়ায়া যায়, তাই একটা সামগ্রিক অর্থও দাঁড়াইতে পারে। যেমন দৈত্যর ছবিতে যখন লেখা থাকে পাখিরা কখনো রান্না করা মাছ খেয়ে দেখে নি। তাই তার পোষা রাখির জন্য রমিজ রান্না মাছ নিয়ে যায়। রমিজ গাছে উঠে পাখিকে পাখির মতো ডাকে- আসো খাই, মাছ খাই। (পাখিদের একটা পায়ে লোম থাকে)তখন কি মনে হয় আপনার? মনে হয় না একটা ভিন্ন কল্পনার জগতের কথা? যেই জগতের কথা আমরা ভাবি না। ভাবতে গেলে অস্পষ্ট একটা পৃথিবীর ছবি আমরা দেখতে পাই। চিত্রকলার ভাষায় তারে কি কয়? আমি চিত্রকলা বুঝি না। আমি বুঝি একটা অধিবাস্তব পৃথিবী, যা আমাদের চারপাশ ঘিরে রেখেছে সেই ছবি এঁকেছেন রাজীব। আর সাথে বলেছেন সেই পৃথিবীর গল্প।
এমন না যে রমিজ ইতিহাসের হাস্যকর কল্পনা আর চলমান পৃথিবীর অধিবাস্তব গল্পেই জীবন যাপন করে। সে অধিকতর বাস্তবেও বসবাস করে। যেমন রমিজ বলে, হাতিরঝিল হাতিদের কাছে কেমন, তা রমিজ জানে নাআপনি জানেন? আপনার কি একটা লেজ আছে?  যেইটা বালিশের নিচে লুকিয়ে রাখেন? নাই তো! দেখুন তো আছে কি না। আপনার সহপাঠি, সহকর্মী বা বন্ধুর প্রশংসাই তো করেন তার সামনে। আর আড়ালে? তাকে যে ঈর্ষা বা ঘৃণাটা করেন সেইটা কি আপনার একটা লেজ না? আমার এই যুক্তি আপনার পছন্দ নাও হৈতে পারে। আদতে পছন্দ হইতেই হবে এমন কোনও কথাও না। কিন্তু দেখেন এইভাবে আপনার ভেতর যে মানবিকতাবোধ আছে, তার আড়ালে তো একটা পশুত্বও আছে। সেই পশুত্বকে যদি একটা হাতি ভাবতে চাই তবে খুব বেশী কি অপরাধ হবে? আপনার পশুটার চাওয়াগুলোও তো পশুটার মতো বিশাল! তাই বলে এই ছবি দৈত্য এঁকে ফেলছে। বুঝলেন মশাই! সেই ছবিটা কেমন? রমিজ যেভাবে হাতি ভাবে। এমন না যে সে প্রতিদিন হাতি ভাবে। তবে ভাবা হাতির ২টা লেজ থাকবে, ২টা শুঁড়। ১টা লেজ এবং ১টা শুঁড় রমিজের নিজের। এগুলো সে বালিশের নিচে রাখে ছবিটা এমন।


Read More

বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৫



বিনয় মজুমদার
এক আশ্চর্য প্রদীপযে প্রদীপ নিজে জ্বলে-পুড়ে শুধু আলোই দেয় না মনের ভেতর জ্বালায় শিখার বুদবুদযেখান থেকে তরল আগুন এক সময় দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয়ে দেহের ভেতর, মনের ভেতর জ্বলে উঠে বিনয়কিন্তু মোটেও বিনয় তৈরি হয় না বিপরীতে আগ্রাসন তৈরি হয়এই আগ্রাসনে বিনয় পাঠের ইচ্ছা-আকাঙ্খার অন্য সকল পাঠ্য তালিকা স্থগিত হয়ে যায়কদাচিৎ যদিও অন্য কোনও পাঠ্যপুস্তক (যে বই পড়ার প্রয়োজন) হাতের কাছে চলে আসে তাও টেকে নাযদিও নিজের মনের মতো করে ভাবলে বিনয়ের কবিতা ও তার ব্যক্তি জীবনে তুমুল বৈপরিত্য চোখে পরেহতে পারে তা আমার সাময়িক ভাবনার পরিণতিকিন্তু বৈপরিত্য তার জীবনে ও কবিতার রয়েছেইতা জীবন ও কবিতা একই সমান্তরালে দেখলেই বেড়িয়ে আসেসেই বিনয়ের সাথে আমার পরিচয় খুব অল্প দিনেরঅবশ্য এর চেয়ে অল্পদিনের পরিচয়েও আমার বন্ধু হওয়া সহজ

বিনয়কে নিয়ে সম্ভবত প্রথম যে বাক্যটি শুনেছিলাম তা হলো- অসম্ভব অভিমানী কবিতখন বিনয়ের দ্বার খুলে দেয়ার ভূমিকাকারী বিনয়কে দেখাত বোদলেয়ারের মতো করেতখন পর্যন্ত বিনয়ের দুটো কবিতাই মাত্র পড়া হয়েছেআর বিনয় সম্পর্কে কিছু আলোচনা-সমালোচনাএই আলোচনা-সমালোচনা পড়ার পর কেবল তাঁর কবিতায় জীবন খুঁজেছি, জীবনে কবিতা খুঁজেছিযখন মিল খুঁজে পেয়েছি তখন ভালো লেগেছেযখন অমিল খুঁজে পেয়েছি তখন মন্দ লেগেছেজীবন ও বাস্তবতার সাথে কবিতার খোজা-খোঁজিতে যত বৈপরিত্য দেখেছি তখনই তাকে তাঁর কবিতার দূর্বলতা হিসেবে চোখে লেগেছেবাস্তব জীবনে যে কবির ভগ্নদশার পরিচালক গায়ত্রী চক্রবর্তিসেই চক্রবর্তিকে নিয়ে কেন কবিতা লেখা হলো প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন - কাউকে নিয়ে তো লিখতে হয়- আমগাছ, কাঠালগাছ, রজনীগন্ধ্যা নিয়ে কি চিরকাল লেখা যায়?’ বিনয় মূলত এই ধাঁচেরই একজন কবিনির্মাণ বিনির্মাণের মাঝে তিনি স্বতন্ত্র

তাঁর কবিতার ভেতরকার গুপ্ততা ধীরে ধীরে আবার হঠাৎই ঔজ্জ্বল্যতা ছড়ায়ব্যক্তির জীবন বৈপরিত্য পেয়ে কবিতায় এসেছেকবিতা এই বৈপরিত্য পেয়ে রূপসীও হয়েছে মাঝে মাঝেকিন্তু কিছু কিছু বৈপরিত্য তীব্র আকারে ধরা পড়ে চোখেবিনয়ের কবিতায় বিনয় কিছু আপ্তবাক্য বা দর্শন তৈরি করেছেনএই দর্শনের মাঝে একটা হলো-
মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়
       এই আপ্তবাক্য বা দর্শনটির কথা আমাদের জানাই আছেতা জানতে গিয়েই আমারা তার কবিতার শুরুটা নিশ্চয়ই পড়ে থাকিশুরুর ভাবনায় একটা বৈপরিত্য বসবাস করছে যেমন শুরুতেই রয়েছে-
মুকুরে প্রতিফলিত সূর্যালোক স্বল্পকাল হাসে
এই বাক্য দিয়ে শুরু করে যখন পূর্বোক্ত বাক্যে শেষ হয় সে ক্ষেত্রে আমাদের লক্ষ্য যদি শেষ বাক্যটি না হয়ে যদি সম্পূর্ণ কবিতাটি হয় তাহলে মনে করতে পারি একই ভাবনার প্রকাশ তিনি সম্পূর্ণ কবিতাটিতে দেখান নিএই ক্ষেত্রে খুব সহজেই আরা ভেবে নিতে পারি দুইটি সমাধান- এক. বিনয়ের কবিতার স্টাইল বা ফর্মই এটা, একই কথা ঘুরিয়ে বলা; দুই. বিনয় হয়তো প্রথম বাক্যটি ভেবেই লিখতে বসেছিলেন, সর্বশেষ বাক্যটি স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে চলে এসেছেযদি তা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই চলে আসে তবে তা এটা রূপান্তরের ধারাপাতে বন্দি হয়ে যায় ফলে শুরুর কথাকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়েই সকল কথার অবতারণ নয়আর কবিতার শেষটাও অন্য কোথাওযা একই কবিতায় বৈপরিত্য উপস্থাপন করেঅন্ততঃপক্ষে আমি মনে করি কবি ও কবিতার ভেতর বৈপরিত্য থাকা সম্ভবকিন্তু একই কবিতার ভাবে বক্তব্যে তা কাম্য নয়তবে যদি তাই বিনয়-এর নিজস্ব ঢং এর হয়ে থাকে তবে তাই হোক!

বিনয়কে নিয়ে অনুভূতির কথামালা

at বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৫  |  No comments



বিনয় মজুমদার
এক আশ্চর্য প্রদীপযে প্রদীপ নিজে জ্বলে-পুড়ে শুধু আলোই দেয় না মনের ভেতর জ্বালায় শিখার বুদবুদযেখান থেকে তরল আগুন এক সময় দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয়ে দেহের ভেতর, মনের ভেতর জ্বলে উঠে বিনয়কিন্তু মোটেও বিনয় তৈরি হয় না বিপরীতে আগ্রাসন তৈরি হয়এই আগ্রাসনে বিনয় পাঠের ইচ্ছা-আকাঙ্খার অন্য সকল পাঠ্য তালিকা স্থগিত হয়ে যায়কদাচিৎ যদিও অন্য কোনও পাঠ্যপুস্তক (যে বই পড়ার প্রয়োজন) হাতের কাছে চলে আসে তাও টেকে নাযদিও নিজের মনের মতো করে ভাবলে বিনয়ের কবিতা ও তার ব্যক্তি জীবনে তুমুল বৈপরিত্য চোখে পরেহতে পারে তা আমার সাময়িক ভাবনার পরিণতিকিন্তু বৈপরিত্য তার জীবনে ও কবিতার রয়েছেইতা জীবন ও কবিতা একই সমান্তরালে দেখলেই বেড়িয়ে আসেসেই বিনয়ের সাথে আমার পরিচয় খুব অল্প দিনেরঅবশ্য এর চেয়ে অল্পদিনের পরিচয়েও আমার বন্ধু হওয়া সহজ

বিনয়কে নিয়ে সম্ভবত প্রথম যে বাক্যটি শুনেছিলাম তা হলো- অসম্ভব অভিমানী কবিতখন বিনয়ের দ্বার খুলে দেয়ার ভূমিকাকারী বিনয়কে দেখাত বোদলেয়ারের মতো করেতখন পর্যন্ত বিনয়ের দুটো কবিতাই মাত্র পড়া হয়েছেআর বিনয় সম্পর্কে কিছু আলোচনা-সমালোচনাএই আলোচনা-সমালোচনা পড়ার পর কেবল তাঁর কবিতায় জীবন খুঁজেছি, জীবনে কবিতা খুঁজেছিযখন মিল খুঁজে পেয়েছি তখন ভালো লেগেছেযখন অমিল খুঁজে পেয়েছি তখন মন্দ লেগেছেজীবন ও বাস্তবতার সাথে কবিতার খোজা-খোঁজিতে যত বৈপরিত্য দেখেছি তখনই তাকে তাঁর কবিতার দূর্বলতা হিসেবে চোখে লেগেছেবাস্তব জীবনে যে কবির ভগ্নদশার পরিচালক গায়ত্রী চক্রবর্তিসেই চক্রবর্তিকে নিয়ে কেন কবিতা লেখা হলো প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন - কাউকে নিয়ে তো লিখতে হয়- আমগাছ, কাঠালগাছ, রজনীগন্ধ্যা নিয়ে কি চিরকাল লেখা যায়?’ বিনয় মূলত এই ধাঁচেরই একজন কবিনির্মাণ বিনির্মাণের মাঝে তিনি স্বতন্ত্র

তাঁর কবিতার ভেতরকার গুপ্ততা ধীরে ধীরে আবার হঠাৎই ঔজ্জ্বল্যতা ছড়ায়ব্যক্তির জীবন বৈপরিত্য পেয়ে কবিতায় এসেছেকবিতা এই বৈপরিত্য পেয়ে রূপসীও হয়েছে মাঝে মাঝেকিন্তু কিছু কিছু বৈপরিত্য তীব্র আকারে ধরা পড়ে চোখেবিনয়ের কবিতায় বিনয় কিছু আপ্তবাক্য বা দর্শন তৈরি করেছেনএই দর্শনের মাঝে একটা হলো-
মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়
       এই আপ্তবাক্য বা দর্শনটির কথা আমাদের জানাই আছেতা জানতে গিয়েই আমারা তার কবিতার শুরুটা নিশ্চয়ই পড়ে থাকিশুরুর ভাবনায় একটা বৈপরিত্য বসবাস করছে যেমন শুরুতেই রয়েছে-
মুকুরে প্রতিফলিত সূর্যালোক স্বল্পকাল হাসে
এই বাক্য দিয়ে শুরু করে যখন পূর্বোক্ত বাক্যে শেষ হয় সে ক্ষেত্রে আমাদের লক্ষ্য যদি শেষ বাক্যটি না হয়ে যদি সম্পূর্ণ কবিতাটি হয় তাহলে মনে করতে পারি একই ভাবনার প্রকাশ তিনি সম্পূর্ণ কবিতাটিতে দেখান নিএই ক্ষেত্রে খুব সহজেই আরা ভেবে নিতে পারি দুইটি সমাধান- এক. বিনয়ের কবিতার স্টাইল বা ফর্মই এটা, একই কথা ঘুরিয়ে বলা; দুই. বিনয় হয়তো প্রথম বাক্যটি ভেবেই লিখতে বসেছিলেন, সর্বশেষ বাক্যটি স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে চলে এসেছেযদি তা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই চলে আসে তবে তা এটা রূপান্তরের ধারাপাতে বন্দি হয়ে যায় ফলে শুরুর কথাকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়েই সকল কথার অবতারণ নয়আর কবিতার শেষটাও অন্য কোথাওযা একই কবিতায় বৈপরিত্য উপস্থাপন করেঅন্ততঃপক্ষে আমি মনে করি কবি ও কবিতার ভেতর বৈপরিত্য থাকা সম্ভবকিন্তু একই কবিতার ভাবে বক্তব্যে তা কাম্য নয়তবে যদি তাই বিনয়-এর নিজস্ব ঢং এর হয়ে থাকে তবে তাই হোক!

Read More

শুক্রবার, ১২ জুলাই, ২০১৩



















হৃদয়ের ভূত মাথায় চড়ে বসলে জানালা ভর্তি শাপ কিলবিল করে। যেটুকু বাতাস বুকে ধরে রাখতে পারতাম, সেটুকুও ফুরিয়ে যায় দ্রুত। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। চারপাশে তাকিয়ে একটা মুখ খুঁজি, তালপাখা হাতে নিয়ে বসে আছে এমন নয়। কেবল একটা স্বস্তির মুখ। সেই মুখ হারিয়ে যায়, দেখি একটি সবুজ টিয়া পাখি বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। তাকায় আমার চোখে। তার চোখে চোখ রেখে পাঠ করি আত্মসমালোচনা-
পাশের বাড়ির জানালা প্রতিদিন গিলে খাচ্ছে লোভগুলো।
আমি তো সকাল সকাল ঘুমিয়ে যাই,
ঘুম ভাঙে আর একটা লোভের জগতে।
এইসব জাদুবাস্তবতার কলরব আমি প্রতিদিনই শুনি। ঘুমিয়ে যাওয়ার আগে অথবা ঘুমের ঘোরে সে এসে চেপে ধরে কণ্ঠনালি। কি যেন বলতে চেয়ে ভুলে যাই। মুখ দিয়ে গোঙানির শব্দ আসতে চায়। তার চেয়ে মনে হয় এই সেই অব্যক্ত কথা, যা কিনা তোতা পাখিটা বারবার স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছিলো। তোতার চোখে ঘুমের আহ্বান। আমি তার কাছে সকালের ঘুমের গল্প শুনতে চাই। সে বলে পাখিপুরাণ একটি সংসারের গল্প। অথচ আমার তেমন কোনও কথাই হয় নি তার সাথে।
মগজে যে ধরে আছি ভুতের ওসিলা, তার সাথে কি আর দোনামোনা চলে? সে তো ভাবের দুনিয়ায় নাও ভাসাইয়া কই যে হারায়, তার কোনও ইয়ত্তা নাই।

২.
বন্ধু তার লাল গোলাপের বাগানে প্রতিদিন তিন বেলা পানি দেয়। বিনিময়ে ঘ্রাণ নেয় বেলি ফুলের। তার কি একবারও মনে হয় না, যেই জীবন আসলে একটা ইলিশের তার চেয়ে মহিমান্বিত জীবনের সময় সে অতিক্রম করতে পারে? তারও তো একটা পাখির জীবন আছে। যা কিনা টিয়া পাখির মতো সবুজ না হলেও ধেনুর চেয়েও কোনও অংশে কম জীবন্ত না। তার কাছে ঘাস ফড়িঙ এর মতো প্রতিদিন শৈশব উড়ে বেড়ায়। আমি বলি, ধরো না? সে উত্তর দেয়, এইসব শৈশবের কাছে আরো কিছু জীবন গেঁথে সে হেঁটে হেঁটে চাঁদে যাবে। আমি তার মুখের দিকে তাকায় থাকি। বিষন্ন সন্ধ্যায় ডুবে যাওয়া আলোর মৃত্যুর মতো সেও হেঁটে যায় নদী তীর ঘেঁষে।


৩.
পাসপোর্টের কথা আমি মনে রাখি না। মনে রাখি মৌ মৌ করা গন্ধের শরীর। এই কথা বলে বারান্দার বৃক্ষগুলো দারুণ দুলে ওঠলো। তাদের সাথে বুঝি বাতাসের সন্ধি? তাই কি সংবাদপত্রের ভাজে লুকিয়ে রেখেছো গোপন প্রেমের সব গল্প? আমি আর এইসব গল্পের ভেতর মৃত্যু খোঁজতে যাবো না। কেবল জেনে রেখো, আমার বাতাসের সংসারে প্রতিদিনই একই হাওয়া এসে দোলা দেয় না।

বাতাসের সংসার

at শুক্রবার, জুলাই ১২, ২০১৩  |  No comments



















হৃদয়ের ভূত মাথায় চড়ে বসলে জানালা ভর্তি শাপ কিলবিল করে। যেটুকু বাতাস বুকে ধরে রাখতে পারতাম, সেটুকুও ফুরিয়ে যায় দ্রুত। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। চারপাশে তাকিয়ে একটা মুখ খুঁজি, তালপাখা হাতে নিয়ে বসে আছে এমন নয়। কেবল একটা স্বস্তির মুখ। সেই মুখ হারিয়ে যায়, দেখি একটি সবুজ টিয়া পাখি বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। তাকায় আমার চোখে। তার চোখে চোখ রেখে পাঠ করি আত্মসমালোচনা-
পাশের বাড়ির জানালা প্রতিদিন গিলে খাচ্ছে লোভগুলো।
আমি তো সকাল সকাল ঘুমিয়ে যাই,
ঘুম ভাঙে আর একটা লোভের জগতে।
এইসব জাদুবাস্তবতার কলরব আমি প্রতিদিনই শুনি। ঘুমিয়ে যাওয়ার আগে অথবা ঘুমের ঘোরে সে এসে চেপে ধরে কণ্ঠনালি। কি যেন বলতে চেয়ে ভুলে যাই। মুখ দিয়ে গোঙানির শব্দ আসতে চায়। তার চেয়ে মনে হয় এই সেই অব্যক্ত কথা, যা কিনা তোতা পাখিটা বারবার স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছিলো। তোতার চোখে ঘুমের আহ্বান। আমি তার কাছে সকালের ঘুমের গল্প শুনতে চাই। সে বলে পাখিপুরাণ একটি সংসারের গল্প। অথচ আমার তেমন কোনও কথাই হয় নি তার সাথে।
মগজে যে ধরে আছি ভুতের ওসিলা, তার সাথে কি আর দোনামোনা চলে? সে তো ভাবের দুনিয়ায় নাও ভাসাইয়া কই যে হারায়, তার কোনও ইয়ত্তা নাই।

২.
বন্ধু তার লাল গোলাপের বাগানে প্রতিদিন তিন বেলা পানি দেয়। বিনিময়ে ঘ্রাণ নেয় বেলি ফুলের। তার কি একবারও মনে হয় না, যেই জীবন আসলে একটা ইলিশের তার চেয়ে মহিমান্বিত জীবনের সময় সে অতিক্রম করতে পারে? তারও তো একটা পাখির জীবন আছে। যা কিনা টিয়া পাখির মতো সবুজ না হলেও ধেনুর চেয়েও কোনও অংশে কম জীবন্ত না। তার কাছে ঘাস ফড়িঙ এর মতো প্রতিদিন শৈশব উড়ে বেড়ায়। আমি বলি, ধরো না? সে উত্তর দেয়, এইসব শৈশবের কাছে আরো কিছু জীবন গেঁথে সে হেঁটে হেঁটে চাঁদে যাবে। আমি তার মুখের দিকে তাকায় থাকি। বিষন্ন সন্ধ্যায় ডুবে যাওয়া আলোর মৃত্যুর মতো সেও হেঁটে যায় নদী তীর ঘেঁষে।


৩.
পাসপোর্টের কথা আমি মনে রাখি না। মনে রাখি মৌ মৌ করা গন্ধের শরীর। এই কথা বলে বারান্দার বৃক্ষগুলো দারুণ দুলে ওঠলো। তাদের সাথে বুঝি বাতাসের সন্ধি? তাই কি সংবাদপত্রের ভাজে লুকিয়ে রেখেছো গোপন প্রেমের সব গল্প? আমি আর এইসব গল্পের ভেতর মৃত্যু খোঁজতে যাবো না। কেবল জেনে রেখো, আমার বাতাসের সংসারে প্রতিদিনই একই হাওয়া এসে দোলা দেয় না।

Read More

সোমবার, ২০ মে, ২০১৩



 ০১.

গত বেশ কয়েকদিন যাবৎ একটা গল্প ভাবছিলাম। গল্প লিখবো বলে না, একটা ছোট সিনেমা বানাবো বলে। কিন্তু সেই গল্পটা আমার লেখা হয়ে উঠতেছে না। আমার বন্ধ্যাকাল চলতেছে কিনা জানিনা। আমি কিছুই লিখতে পারতেছিনা। আর এই না পারার দরুন সেই গল্পটাও একটা সম্ভাবনা হয়ে আমার দরজার কাছ  দিয়ে কেবল ঘুরঘুর করতেছে। তবে গল্পটা আমি লিখবোই এই বিষয়ে নিশ্চিত হই নিজের কাছে। তার আগে ভাবি, এই গল্পের চিত্রনাট্য লেখার আগে এর ভিজ্যুয়ালের মতো কিছু পাই কিনা। হ্যা, এই রকম খুঁজতে গিয়াই হঠাৎ ‘ট্রাইজ’ ছবিটা পাইয়া গেলাম। ছবিটা আন্তর্জাতিক মহলে তেমন কোনও প্রশংসিত ছবি না। আমি যুদ্ধ নিয়া কি কি ছবি আছে এমন ছবির রেফারেন্স ঘাটতে গিয়া এই ছবির খোঁজ পাই। এই ছবি সম্পর্কে আমি কিছু বলতে চাই না। এইখানে অন্য কথা বলার ইচ্ছা আমার।

ছোট ছবি মানে শর্ট ফিল্মের কথা বলতেছিলাম। দীর্ঘদিন আমি ভিজ্যুয়ালে কোনও কাজ করতেছিও না, কোনও কাজের সাথে সরাসরি সম্পৃক্তও না। আর এই কাজ না করার ফলে আমি নিজেরে বহু দূরের মনে করতেছি। মনে হইতেছে, আমার ভেতরকার আমিটা কই জানি হারায়া গেছে। এই হারায়া যাওয়া আমিকেই খুঁজতে এই ছোট সিনেমার চিন্তা। কারণ ছোট সিনেমাই বানাইতে হইবো এইটা এখন নিশ্চিত। যেহেতু বড় মানে ফুল লেংথের সিনেমাবা বানারো সক্ষমতা ও সুযোগ কোনওটাই আমার এখনো আসে নাই। তাই ছোট সিনেমাই বানাইতে হইবো। তবে ছোট সিনেমার যেহেতু কোনও বাজার নাই, তাই ছোট সিনেমার জন্য প্রযোজকও নাই। আর তাই নো-বাজেটে কিভাবে ছোট সিনেমা বানানো যায়, তার চিন্তা করা দরকার। বলতে পারেন, ছোট সিনেমা না বানাইয়া আপনি নাটক বানান না কেন? নাটক বানাইলে তো অন্তত ভিজ্যুয়াল প্র্যাক্টিসটা হৈতো। আপনারে বলি, ভাই কেন যে নাটক বানাইনা এই কথাই কইতে আইছি। একটু সবুর করেন।

 ০২.

একদিন ছবির হাটে বইসা ছিলাম। মহিম জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা ভাই এই সময়টাতে তো ছবি বানানোর হিড়িক পড়ছে। আপনি তো হিড়িকে গা ভাসানোর মানুষ না। আপনি কেন ছবি বানাবেন বইলা সিদ্ধান্ত নিছেন? আমি তারে নানান্ কথা বুঝাইলাম। কিন্তু সে বুঝবার চায় না। বলে, এইটা না আপনার আরো কোনও কথা আছে সেইটা বলেন। তখন আমি বলছিলাম, হিড়িকে গা ভাসানোর জন্য তো না’ই। বরং আমার মনে হয় সিনেমাটা আমার বানানো উচিত। অন্তত দেশের সিনেমার জার্নি আর বড় হওয়ার পর বিদেশী সিনেমা দেইখ্যা যেইভাবে বড় হইতেছি, তাতে মনে হইছিলো সিনেমারে আমার কিছুটা অন্তত দেয়ার আছে। সে আর কথা না বাড়াইয়া বলছিলো, এইবার মনে হয় আপনে ভেতরকার কথাটা কইছেন। হ্যা, এই সময়ে বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে এই সিনেমা বানানোর প্রবণতাটা প্রচুর বাড়ছে। কেবল বাড়ছে বললে ভুল হবে, বলতে হবে এইটা একটা ক্রেজি রূপ নিছে। গত দশকে মানে শূন্য দশকে তেমনই কবিতা লেখার অবস্থা ছিলো। এই শূন্য দশকে কবিতর সংখ্যা ছিলো শত শত। এই এত এত কবির মধ্য থেইক্যা এখন গুনতে গেলে দশজন উল্লেখযোগ্য কবিকে খুইজ্যা বের করা মুশকিল হইয়া যায়। তার পরিবর্তে শাহবাগ, ছবির হাট, টিএসসিতে বসলেই এখন ডিরেক্টর। আর শুধু ডিরেক্টরই না। ঐখানে তিনটা ঢিল মারলেও আড়াইটাই মনে হয় কোনও না কোনও ডিরেক্টরের গায়ে গিয়া পরবো এমন অবস্থা। সবাই সিনেমা বানানোর স্বপ্ন দেখে বা কেউ কেউ বানায়। তো এই অবস্থায় সিনেমার একটা সম্ভাবনা চোখে পড়ে না? শূন্য দশকে তেমন কবিতারও সম্ভাবনা ছিলো। এই সম্ভাবনায় যারা সাতরাইতে সাতরাইতে কুলের দিকে আসতেছেন তারা হয়ত পাড় দেখতে পারতেছেন। এর চেয়ে ভালো কথা, পরবর্তী দশকে এর দারুণ প্রভাবে কবিতা লেখকের সংখ্যা কইম্যা গেছে। আর এর ফলে যারা লিখতেছে অধিকাংশই যথেষ্ট সম্ভাবনাময় লেখাই লিখতেছে। এইটাও বিগত দশকের একটা ফল হিসাবে ধরলে ভবিষ্যতে সিনেমার এই সময়টা সত্যিই সম্ভাবনায়। তবে এত বিপুল নির্মাতা শ্রেণী কি আসলে তৈরি হৈতেছে? এইটা একটা প্রশ্ন বটে। আর এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আশপাশে তাকালে দেখি, তেমন একটা তৈরি হইতেছে না। কেমনে হবে? সেই সুযোগই তো তারা পাইতেছে না। এখন প্রশ্ন আসতে পারে এই সুযোগটা আসলে কি? সুযোগটা নানান্ ভাবেই হইতে পারে। প্রথমত, ছোট ছোট সিনেমা বানাইয়া তারা প্রস্তুতিটা নিতে পারে বড় সিনেমার জন্য। এই ছোট সিনেমাই সবচে ভালো প্রস্তুতির ব্যবস্থা হৈতে পারতো। কিন্তু বাংলাদেশে ছোট সিনেমার কোনও ভাবেই কোনও বেইল করা করা গেলো না। আমাদের পূর্ব পুরুষ চলচ্চিত্র নির্মাতারাও তেমন একটা পারলেন না, আমারাও পারতেছিনা। অবশ্য সারা পৃথিবীতেই এইটা মানে এই ছোট সিনেমার বাজার তৈরি করাটা একটা মহা চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জে জিততে পারলে পৃথিবীর সিনেমা আরও বহু আগেই যে বদলাইয়া যাইতো তা আর বলতে হয় না। তো এই ছোট সিনেমার বাজার যেহেতু নাই, সেহেতু আর যেই বিকল্প মাধ্যমটা আমাদের হাতে আছে, সেইটাতেই চিন্তা করতেছিলো এই তরুণ প্রজন্মের সম্ভাবনাময় নির্মাতারা। অন্তত গল্প বলার প্র্যাক্টিসটা এইখানে করতে পারে। কিন্তু এই জায়গাটাও আর সেই আগের মতো নাই। সেই জায়গাটা কি? সেই জায়গাটা টিভির এক খন্ডের নাটক। এইখানে একজন স্বপ্নবাজ তরুণ নির্মাতা তার পূর্ণাঙ্গ স্বপ্নের রূপায়্নের আগে, নানা ধরনের প্রস্তুতি নিতে পারতো। আমাদের টেলিভিশন মিডিয়ার এক জাদুকর মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেছিলো, পৃথিবীর অন্য সব দেশের টেলিভিশন সিনেমার ধ্বংস করে, আর আমাদের দেশের টেলিভিশন সিনেমা নির্মাতা বানায়।  এই কথা পুরোপুরি সত্য নয়। তবে বেশ কিছুটা সত্য। তিনি যখন এই কথা বলছিলেন, তখন ফারুকীর মতো আরো অনেক তরুণ নির্মাতা টিভিতে এই খন্ড নাটক বানাইয়া নিজেদের ডিরেক্টর হিসেবে এস্টাব্লিশমেন্ট করে ফেলছে। আর তাই টিভিতে এমন সব কাজও হৈছে, যেগুলো নিয়া আমরা আক্ষেপও করতে পারি এই কারণে যে, এইসব প্রডাকশন টিভিতে না হইলে থার্টি ফাইভে হইলে বা টিভিতে না দেখাইয়া যদি আন্তর্জাতিক ফ্যাস্টিভ্যালে প্রিমিয়ার হইয়া যাইতো, তাইলে তা নতুন সিনামায় রূপ পাইতো। কিন্তু সরয়ার ভাইয়ের এই কথা এখন তাই পুরোপুরি সত্য নয়। তার কারণে এই দেশে যেসব তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতারা টিভিতে নাটক বানিয়ে সিনেমার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছেন, তাদের পরবর্তী প্রজন্ম আর তাদের মতো সেই ক্ষেত্রটা পাচ্ছে না বলে। তাদের মতো তো দূরের কথা কোনও ক্ষেত্রই পাচ্ছে না বলা যায়। কারণ, একটা সময় টিভি স্টেশন মানেই নতুন নতুন আইডিয়া আর নতুন নতুন প্রোগ্রাম পাওয়া যাইতো। নতুন নতুন গল্প বলার চেষ্টা থাকতো। নতুন নতুন টিভিগুলো সেইসব নতুন গল্পের পেছনে ছুটতোও। কিন্তু একটা টিভি স্টেশন হওয়ার আগে চিন্তা করে ঐ চ্যানেলের এই অনুষ্ঠানটা জনপ্রিয়। সুতরাং আমারো এমন একটা বানাইতে হইবো। আর এমন করতে গিয়া তার অনুষ্ঠানে নতুনত্ব থাকে না। আর ঐ এক পর্বের খন্ড নাটক, যা পৃথিবীর বিরলতম একটা টিভি অনুষ্ঠান। এই নাটকে সবচে তীব্র ভাবে ঢুকে গেছে স্থুলতা। আর তাই এই স্থুল নাটকগুলোকে প্রশ্রয় দিচ্ছে আমাদের টিভি স্ট্যাশনগুলো। কারণ, ঐটাতে তার ব্যবসা হয় বিশেষ। এই স্থুল অনুষ্ঠান নির্মাণ আর স্থুল গল্পের নাটক নির্মাণের কারণে তার টিভির দর্শক যে হারিয়ে যাচ্ছে, সেই দিকে তার কোনও ভ্রুক্ষেপ নাই। তার কেবল দরকার ব্যবসা। আরে ভাই তোমার ব্যবসা টিকাইয়া রাখার জন্যও তো তোমার ভালো কিছু করতে হইবো, নাকি? আর টিভি স্ট্যাশনগুলোর এই ব্যবসার জন্যই তরুণ প্রজন্মের সিনেমার স্বপ্নটা ধূসর হয়ে যাচ্ছে।

 ০৩.

টিভিতে নাটক বানানোর মাধ্যমে সিনেমার প্রস্তুতি নেয়া যায় কারণ, টিভিতে নাটক বানানোর যে পদ্ধতিটা, এই পদ্ধতিটা সিনেমা বানানোর পদ্ধতিরই একটা প্রাথমিক সংস্করণ। আর এই মাধ্যমটাতে কাজ করে তাই আমাদের প্রজন্মের তরুণরা সিনেমার কথা ভাবতেছিলো। এখন এই নাটকের সাথে সিনেমার সম্পর্কটা কোন জায়গায় আর পার্থক্যটা কোন জায়গায় এইটাতে চোখ বুলাইলেই বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে যায়। প্রথমত সিনেমা বড় ক্যানভাসের একটা শিল্প। আর এই শিল্পটাকে পূর্ণাঙ্গ শিল্প বলা হয়। এই প্রসঙ্গে শুরুতে যে ‘ট্রাইজ’ ছবির কথা বললাম তার পরিচালকের একটু কথা উদ্ধৃতি করি। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলছিলেন, ‘আমি মনে করি সিনেমা বানানো পৃথিবীর সবচে পূর্ণাঙ্গ কাজের একটা। এইখানে তোমাকে লেখক হইতে হইবো, রাজনীতিবিদ হইতে হইবো, ব্যবসায়ী হইতে হইবো, জীবনের রং দেখার ক্ষমতা থাকতে হইবো, তোমার জানতে হইবো কেমনে সিনামা হয়, কিভাবে কাটতে হয় তা জানতে হইবো, অভিনয়টা কি তাও জানতে হৈবো, মিউজিক তো বটেই। তারপরে না তুমি সিনেমা বানাইবা।’ এখন সিনেমার এইসব বিষয়ের অধিকাংশ বিষয়ই নাটকের সাথে জড়িত। সেই হিসেবে টিভি নাটক বলতে গেলে সিনেমার ড্রেস রিহার্সাল। কিন্তু সিনেমার পর্দা, দর্শক থেকে শুরু করে বিস্তৃতির জায়গা পর্যন্ত বিশাল হওয়ায় এর বাজেটটা ও আয়োজনেও বিশালত্ত্বটা থাকে। কিন্তু নাটকটা ড্রয়িং রুম মাধ্যম বলে তার সেই অনুপাতিক বাজেট থাকে না। কিন্তু তারপরও তুলনামূলক কম বাজেটে সেই প্রস্তুতিটা নেওয়ার চিন্তা কিন্তু করাই যায়। কিন্তু তার বিপরীতে কি হয়? একটু বাস্তব চিত্রটা দেখি।

 ০৪.

আমাদের দেশে অনুষ্ঠান প্রচার হয় এমন চ্যানেল আছে প্রায় এক ডজনেরো বেশী। প্রত্যেকটা চ্যানেলে যদি সপ্তাহে দুইটা করেও নতুন একটা করে খন্ড নাটক চালায় তাহলে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৩০টা নতুন নাটক নির্মাণ করতে হয়।  এখন এই নাটকের অধিকাংশই যদি প্রতিষ্ঠিত নাট্য নির্মাতারা নির্মাণ করতো, তাহলেও মাসে কমপক্ষে ১০টা নতুন নাটক নির্মাণের সুযোগ পাইতো একজন তরুণ নাট্য নির্মাতা। এই সুযোগটা তারা পায় না। আর এর বাইরে তার একটা নাটক নির্মাণ করতে গেলে যে ধকলটা পোহাইতে হয়, তাও রীতিমত কম না। সবচে বড় যে বিষয়টা তার প্রথমেই ফেইস করতে হয় তা হৈলো টাকা বা প্রডিউসার যোগার করা। বাংলাদেশে ট্রাডিশনাল ওয়েতে টিভি নাটকের প্রডিউসার যোগার করা রীতিমত এলাহি কাণ্ড। পুরনো যারা প্রতিষ্ঠিত নির্মাতা, তারা শুরুতে এইসব ঝামেলা পোহাইছে বইলা এখন তারা নিজেরাই নিজেদের প্রোডাকশন হাউজগুলোর অধীনে কাজ করে। তারা আর কেবলমাত্র নির্মাতা থাকে না। তাই এক প্রকার প্রযোজক হওয়ার চিন্তা নিয়াই পরিচালনার কথা চিন্তা করতে হয় সিনেমার স্বপ্ন দেখা তরুণের। আর যদি কোনও ভাবে একজন প্রযোজক যোগার হয়েই যায়, তবে কি? কাজ শেষ? মোটেও না। এইখানে আছে অনেক কিন্তু। প্রযোজক তো বাণিজ্য করার জন্য টাকা দিচ্ছে। এখন একজন তরুণ নির্মাতার প্রোডাকশনে যখন একজন প্রযোজক টাকা লগ্নি করেন, তখন তার ব্যবসা ছাড়াও একাধিক দিকে সুবিধা আদায় করার চিন্তা থাকে। তার অন্যতম কারণ তার লগ্নিকৃত টাকা কবে ফেরৎ আসবে তার অনিশ্চয়তা। কারণ একটা নাটক যখন নির্মাণ হয় প্রযোজকের পকেট থেকে টাকাটা ব্যায় হয়ে যায় তখনই। বিপরীত দিকে এই টাকা ফেরৎ আনার প্রসেসটা কেবল দীর্ঘই নয়, অনেক ক্ষেত্রে তা অনির্দিষ্টকালের হয়ে যায়। যেমন, একটা নাটক যদি টিভি চ্যানেলের এ্যাসাইন করা না থাকে (তরুণ নির্মাতাদের নাটক কখনোই এ্যাসাইন করা থাকে না) তাহলে এই নাটক বিক্রির জন্য কম পক্ষে ১০টা টিভি চ্যানেলে প্রিভিউ এর জন্য জমা দিতে হয়। তাদের অনেকে নতুন পরিচালকের নাটক দেখেই না। অনেক চ্যানেলের তো প্রিভিউ কমিটিই নাই। কোনওটার থাকলেও তা কাজ করে না। এইসব উজিয়ে নাটকটা লাভ আর লস যাই হোক কোনও একটা জায়গায় গিয়ে যখন বিক্রি হয়, তার কিছুদিনের মাঝে তা প্রচারও হয়ে যায়। আর প্রচারের সময় দেখা যায় প্রতি বিরতিতে বিজ্ঞাপনের অভাব নেই। এত এত বিজ্ঞাপন নিয়ে নাটক প্রচার করলেও এই নাটকের মূল্য কিন্তু পরিশোধ কবে করবে তার নিশ্চয়তা নেই। হাতে গোনা দুই একটা টিভি চ্যানেল এই জায়গায় ব্যতিক্রম। তাই নাটকের পেছনে লগ্নিকারী প্রযোজক নাট্য নির্মাতা, অভিনেতা, অভিনেত্রীদের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা আদায়ের চিন্তা প্রায়ই করে থাকে।  তার জন্য এক দিক দিয়ে অবশ্য দায়ি আমাদের টিভি স্ট্যাশনগুলো। টিভি স্ট্যাশনগুলো একটা নাটক প্রচারের পর আর কোনও কিছুর চিন্তা করতে চায় না। দেশের টিভি স্টেশনগুলো যদি ন্যুনতম প্রফেশনাল চরিত্রটা ধরে রাখতো, তাহলে তরুণ নির্মাতাদের স্বপ্ন ও সম্ভাবনাটা এই তুমুল চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না। অথচ দেড়-দুই লাখ টাকা দিয়ে যখন একটা নাটক টিভি চ্যানেল কিনে, তার মাঝে যে পরিমাণ বিজ্ঞাপন তারা চালায় তার শতকরা ১০% ভাগও যদি প্রডাকশন কোম্পানী পায় তাহলে প্রযোজনা ব্যবসাটাই একটা বিশাল শিল্পে রূপান্তরিত হয়ে যেতে পারতো। টিভি স্টেশনগুলো বুঝতেই চায়না একটা তরুণ নির্মাতা কতটা কষ্ট কইরা এই দেড়-দুই লাখ টাকায় একটা নাটক দাঁড় করায়। কারণ সিনিয়ার নির্মাতারা যেখানে প্রতি নাটকে চার থেকে-আট লাখ টাকা পায়, সেখানে তার একটা নাটকের দেড় লাখ টাকা বাজেটে তার নিজের জন্য কিছুই থাকে না। অথচ তরুণদের প্রতিটা প্রডাকশনের প্রতিটা ভাজে লুকানো থাকে তার শ্রম। কারণ সে ভাল লেখকের চিত্রনাট্য কিনতে পারে না টাকার অভাবে। নিজেরই গল্প, চিত্রনাট্য লিখতে হয়। ভালো এসিস্ট্যান্ট নিতে গেলেও যে টাকা দেয়া লাগে তাও দেয়ার ক্ষমতা থাকে না। ভালো সিনেমাটোগ্রাফারের তো আর বড় বাজেট থাকে। আর তরুণদের জন্য ভালো অভিনয়শিল্পীদের কাছ থেকে শিডিউল নিতে নিতে যে ফোন বিল হয় সেইটাই তো বিশাল অংকে রূপ নেয়। আর তাদের আচরণ তো কারো অজানা না। এই হবে না, এই করবো না, এই করি না। কত যে বাহানা! এইসব বাহানার মাঝ দিয়েও তার উপর চাপ থাকে প্রডিউসারের, তিনদিনের শিডিউল দুই দিনে শেষ করেন। নইলে টাকায় কুলাইতে পারবো না। এই ভাবনা নিয়া তারা কাজ করে। আর বিক্রির পর এই টাকা চ্যানেল থেকে তুলতে গেলে স্যান্ডেল ক্ষয় হয় কয়েক জোড়া। এইসব প্রতিবন্ধকতার কারণে টিভি স্টেশন থেকে তরুণরা মুখ ফিরায়ে নিতেছে। ভিড়তেছে এনজিও বা বিজ্ঞাপনের দিকে। কিন্তু এনজিও বা বিজ্ঞাপন তো সবার কাছে ধরা দেয় না। তাই বলে কি সিনেমার স্বপ্ন তারা বাস্তবায়ন করার চেষ্ট করবে না? তারা সেই সংগ্রামটা করতেছে সমাজ ব্যবস্থা আর নিজেদের সাথেই। অথচ টিভি স্টেশনগুলো একটু দায়িত্ব নিলেই আগামী ৫ বছরেই আমুল বদলে যেতে পারতো বাংলাদেশের সিনেমার চেহারা। যেহেতু এত সহজে হচ্ছে না, তারপরও তো হচ্ছে। ধীরে ধীরে, সেই ধীরে ধীরে হওয়ার চিন্তাই করি। কি আর করা!

কোন পথে সিনেমার স্বপ্ন?

at সোমবার, মে ২০, ২০১৩  |  No comments



 ০১.

গত বেশ কয়েকদিন যাবৎ একটা গল্প ভাবছিলাম। গল্প লিখবো বলে না, একটা ছোট সিনেমা বানাবো বলে। কিন্তু সেই গল্পটা আমার লেখা হয়ে উঠতেছে না। আমার বন্ধ্যাকাল চলতেছে কিনা জানিনা। আমি কিছুই লিখতে পারতেছিনা। আর এই না পারার দরুন সেই গল্পটাও একটা সম্ভাবনা হয়ে আমার দরজার কাছ  দিয়ে কেবল ঘুরঘুর করতেছে। তবে গল্পটা আমি লিখবোই এই বিষয়ে নিশ্চিত হই নিজের কাছে। তার আগে ভাবি, এই গল্পের চিত্রনাট্য লেখার আগে এর ভিজ্যুয়ালের মতো কিছু পাই কিনা। হ্যা, এই রকম খুঁজতে গিয়াই হঠাৎ ‘ট্রাইজ’ ছবিটা পাইয়া গেলাম। ছবিটা আন্তর্জাতিক মহলে তেমন কোনও প্রশংসিত ছবি না। আমি যুদ্ধ নিয়া কি কি ছবি আছে এমন ছবির রেফারেন্স ঘাটতে গিয়া এই ছবির খোঁজ পাই। এই ছবি সম্পর্কে আমি কিছু বলতে চাই না। এইখানে অন্য কথা বলার ইচ্ছা আমার।

ছোট ছবি মানে শর্ট ফিল্মের কথা বলতেছিলাম। দীর্ঘদিন আমি ভিজ্যুয়ালে কোনও কাজ করতেছিও না, কোনও কাজের সাথে সরাসরি সম্পৃক্তও না। আর এই কাজ না করার ফলে আমি নিজেরে বহু দূরের মনে করতেছি। মনে হইতেছে, আমার ভেতরকার আমিটা কই জানি হারায়া গেছে। এই হারায়া যাওয়া আমিকেই খুঁজতে এই ছোট সিনেমার চিন্তা। কারণ ছোট সিনেমাই বানাইতে হইবো এইটা এখন নিশ্চিত। যেহেতু বড় মানে ফুল লেংথের সিনেমাবা বানারো সক্ষমতা ও সুযোগ কোনওটাই আমার এখনো আসে নাই। তাই ছোট সিনেমাই বানাইতে হইবো। তবে ছোট সিনেমার যেহেতু কোনও বাজার নাই, তাই ছোট সিনেমার জন্য প্রযোজকও নাই। আর তাই নো-বাজেটে কিভাবে ছোট সিনেমা বানানো যায়, তার চিন্তা করা দরকার। বলতে পারেন, ছোট সিনেমা না বানাইয়া আপনি নাটক বানান না কেন? নাটক বানাইলে তো অন্তত ভিজ্যুয়াল প্র্যাক্টিসটা হৈতো। আপনারে বলি, ভাই কেন যে নাটক বানাইনা এই কথাই কইতে আইছি। একটু সবুর করেন।

 ০২.

একদিন ছবির হাটে বইসা ছিলাম। মহিম জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা ভাই এই সময়টাতে তো ছবি বানানোর হিড়িক পড়ছে। আপনি তো হিড়িকে গা ভাসানোর মানুষ না। আপনি কেন ছবি বানাবেন বইলা সিদ্ধান্ত নিছেন? আমি তারে নানান্ কথা বুঝাইলাম। কিন্তু সে বুঝবার চায় না। বলে, এইটা না আপনার আরো কোনও কথা আছে সেইটা বলেন। তখন আমি বলছিলাম, হিড়িকে গা ভাসানোর জন্য তো না’ই। বরং আমার মনে হয় সিনেমাটা আমার বানানো উচিত। অন্তত দেশের সিনেমার জার্নি আর বড় হওয়ার পর বিদেশী সিনেমা দেইখ্যা যেইভাবে বড় হইতেছি, তাতে মনে হইছিলো সিনেমারে আমার কিছুটা অন্তত দেয়ার আছে। সে আর কথা না বাড়াইয়া বলছিলো, এইবার মনে হয় আপনে ভেতরকার কথাটা কইছেন। হ্যা, এই সময়ে বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে এই সিনেমা বানানোর প্রবণতাটা প্রচুর বাড়ছে। কেবল বাড়ছে বললে ভুল হবে, বলতে হবে এইটা একটা ক্রেজি রূপ নিছে। গত দশকে মানে শূন্য দশকে তেমনই কবিতা লেখার অবস্থা ছিলো। এই শূন্য দশকে কবিতর সংখ্যা ছিলো শত শত। এই এত এত কবির মধ্য থেইক্যা এখন গুনতে গেলে দশজন উল্লেখযোগ্য কবিকে খুইজ্যা বের করা মুশকিল হইয়া যায়। তার পরিবর্তে শাহবাগ, ছবির হাট, টিএসসিতে বসলেই এখন ডিরেক্টর। আর শুধু ডিরেক্টরই না। ঐখানে তিনটা ঢিল মারলেও আড়াইটাই মনে হয় কোনও না কোনও ডিরেক্টরের গায়ে গিয়া পরবো এমন অবস্থা। সবাই সিনেমা বানানোর স্বপ্ন দেখে বা কেউ কেউ বানায়। তো এই অবস্থায় সিনেমার একটা সম্ভাবনা চোখে পড়ে না? শূন্য দশকে তেমন কবিতারও সম্ভাবনা ছিলো। এই সম্ভাবনায় যারা সাতরাইতে সাতরাইতে কুলের দিকে আসতেছেন তারা হয়ত পাড় দেখতে পারতেছেন। এর চেয়ে ভালো কথা, পরবর্তী দশকে এর দারুণ প্রভাবে কবিতা লেখকের সংখ্যা কইম্যা গেছে। আর এর ফলে যারা লিখতেছে অধিকাংশই যথেষ্ট সম্ভাবনাময় লেখাই লিখতেছে। এইটাও বিগত দশকের একটা ফল হিসাবে ধরলে ভবিষ্যতে সিনেমার এই সময়টা সত্যিই সম্ভাবনায়। তবে এত বিপুল নির্মাতা শ্রেণী কি আসলে তৈরি হৈতেছে? এইটা একটা প্রশ্ন বটে। আর এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আশপাশে তাকালে দেখি, তেমন একটা তৈরি হইতেছে না। কেমনে হবে? সেই সুযোগই তো তারা পাইতেছে না। এখন প্রশ্ন আসতে পারে এই সুযোগটা আসলে কি? সুযোগটা নানান্ ভাবেই হইতে পারে। প্রথমত, ছোট ছোট সিনেমা বানাইয়া তারা প্রস্তুতিটা নিতে পারে বড় সিনেমার জন্য। এই ছোট সিনেমাই সবচে ভালো প্রস্তুতির ব্যবস্থা হৈতে পারতো। কিন্তু বাংলাদেশে ছোট সিনেমার কোনও ভাবেই কোনও বেইল করা করা গেলো না। আমাদের পূর্ব পুরুষ চলচ্চিত্র নির্মাতারাও তেমন একটা পারলেন না, আমারাও পারতেছিনা। অবশ্য সারা পৃথিবীতেই এইটা মানে এই ছোট সিনেমার বাজার তৈরি করাটা একটা মহা চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জে জিততে পারলে পৃথিবীর সিনেমা আরও বহু আগেই যে বদলাইয়া যাইতো তা আর বলতে হয় না। তো এই ছোট সিনেমার বাজার যেহেতু নাই, সেহেতু আর যেই বিকল্প মাধ্যমটা আমাদের হাতে আছে, সেইটাতেই চিন্তা করতেছিলো এই তরুণ প্রজন্মের সম্ভাবনাময় নির্মাতারা। অন্তত গল্প বলার প্র্যাক্টিসটা এইখানে করতে পারে। কিন্তু এই জায়গাটাও আর সেই আগের মতো নাই। সেই জায়গাটা কি? সেই জায়গাটা টিভির এক খন্ডের নাটক। এইখানে একজন স্বপ্নবাজ তরুণ নির্মাতা তার পূর্ণাঙ্গ স্বপ্নের রূপায়্নের আগে, নানা ধরনের প্রস্তুতি নিতে পারতো। আমাদের টেলিভিশন মিডিয়ার এক জাদুকর মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেছিলো, পৃথিবীর অন্য সব দেশের টেলিভিশন সিনেমার ধ্বংস করে, আর আমাদের দেশের টেলিভিশন সিনেমা নির্মাতা বানায়।  এই কথা পুরোপুরি সত্য নয়। তবে বেশ কিছুটা সত্য। তিনি যখন এই কথা বলছিলেন, তখন ফারুকীর মতো আরো অনেক তরুণ নির্মাতা টিভিতে এই খন্ড নাটক বানাইয়া নিজেদের ডিরেক্টর হিসেবে এস্টাব্লিশমেন্ট করে ফেলছে। আর তাই টিভিতে এমন সব কাজও হৈছে, যেগুলো নিয়া আমরা আক্ষেপও করতে পারি এই কারণে যে, এইসব প্রডাকশন টিভিতে না হইলে থার্টি ফাইভে হইলে বা টিভিতে না দেখাইয়া যদি আন্তর্জাতিক ফ্যাস্টিভ্যালে প্রিমিয়ার হইয়া যাইতো, তাইলে তা নতুন সিনামায় রূপ পাইতো। কিন্তু সরয়ার ভাইয়ের এই কথা এখন তাই পুরোপুরি সত্য নয়। তার কারণে এই দেশে যেসব তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতারা টিভিতে নাটক বানিয়ে সিনেমার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছেন, তাদের পরবর্তী প্রজন্ম আর তাদের মতো সেই ক্ষেত্রটা পাচ্ছে না বলে। তাদের মতো তো দূরের কথা কোনও ক্ষেত্রই পাচ্ছে না বলা যায়। কারণ, একটা সময় টিভি স্টেশন মানেই নতুন নতুন আইডিয়া আর নতুন নতুন প্রোগ্রাম পাওয়া যাইতো। নতুন নতুন গল্প বলার চেষ্টা থাকতো। নতুন নতুন টিভিগুলো সেইসব নতুন গল্পের পেছনে ছুটতোও। কিন্তু একটা টিভি স্টেশন হওয়ার আগে চিন্তা করে ঐ চ্যানেলের এই অনুষ্ঠানটা জনপ্রিয়। সুতরাং আমারো এমন একটা বানাইতে হইবো। আর এমন করতে গিয়া তার অনুষ্ঠানে নতুনত্ব থাকে না। আর ঐ এক পর্বের খন্ড নাটক, যা পৃথিবীর বিরলতম একটা টিভি অনুষ্ঠান। এই নাটকে সবচে তীব্র ভাবে ঢুকে গেছে স্থুলতা। আর তাই এই স্থুল নাটকগুলোকে প্রশ্রয় দিচ্ছে আমাদের টিভি স্ট্যাশনগুলো। কারণ, ঐটাতে তার ব্যবসা হয় বিশেষ। এই স্থুল অনুষ্ঠান নির্মাণ আর স্থুল গল্পের নাটক নির্মাণের কারণে তার টিভির দর্শক যে হারিয়ে যাচ্ছে, সেই দিকে তার কোনও ভ্রুক্ষেপ নাই। তার কেবল দরকার ব্যবসা। আরে ভাই তোমার ব্যবসা টিকাইয়া রাখার জন্যও তো তোমার ভালো কিছু করতে হইবো, নাকি? আর টিভি স্ট্যাশনগুলোর এই ব্যবসার জন্যই তরুণ প্রজন্মের সিনেমার স্বপ্নটা ধূসর হয়ে যাচ্ছে।

 ০৩.

টিভিতে নাটক বানানোর মাধ্যমে সিনেমার প্রস্তুতি নেয়া যায় কারণ, টিভিতে নাটক বানানোর যে পদ্ধতিটা, এই পদ্ধতিটা সিনেমা বানানোর পদ্ধতিরই একটা প্রাথমিক সংস্করণ। আর এই মাধ্যমটাতে কাজ করে তাই আমাদের প্রজন্মের তরুণরা সিনেমার কথা ভাবতেছিলো। এখন এই নাটকের সাথে সিনেমার সম্পর্কটা কোন জায়গায় আর পার্থক্যটা কোন জায়গায় এইটাতে চোখ বুলাইলেই বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে যায়। প্রথমত সিনেমা বড় ক্যানভাসের একটা শিল্প। আর এই শিল্পটাকে পূর্ণাঙ্গ শিল্প বলা হয়। এই প্রসঙ্গে শুরুতে যে ‘ট্রাইজ’ ছবির কথা বললাম তার পরিচালকের একটু কথা উদ্ধৃতি করি। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলছিলেন, ‘আমি মনে করি সিনেমা বানানো পৃথিবীর সবচে পূর্ণাঙ্গ কাজের একটা। এইখানে তোমাকে লেখক হইতে হইবো, রাজনীতিবিদ হইতে হইবো, ব্যবসায়ী হইতে হইবো, জীবনের রং দেখার ক্ষমতা থাকতে হইবো, তোমার জানতে হইবো কেমনে সিনামা হয়, কিভাবে কাটতে হয় তা জানতে হইবো, অভিনয়টা কি তাও জানতে হৈবো, মিউজিক তো বটেই। তারপরে না তুমি সিনেমা বানাইবা।’ এখন সিনেমার এইসব বিষয়ের অধিকাংশ বিষয়ই নাটকের সাথে জড়িত। সেই হিসেবে টিভি নাটক বলতে গেলে সিনেমার ড্রেস রিহার্সাল। কিন্তু সিনেমার পর্দা, দর্শক থেকে শুরু করে বিস্তৃতির জায়গা পর্যন্ত বিশাল হওয়ায় এর বাজেটটা ও আয়োজনেও বিশালত্ত্বটা থাকে। কিন্তু নাটকটা ড্রয়িং রুম মাধ্যম বলে তার সেই অনুপাতিক বাজেট থাকে না। কিন্তু তারপরও তুলনামূলক কম বাজেটে সেই প্রস্তুতিটা নেওয়ার চিন্তা কিন্তু করাই যায়। কিন্তু তার বিপরীতে কি হয়? একটু বাস্তব চিত্রটা দেখি।

 ০৪.

আমাদের দেশে অনুষ্ঠান প্রচার হয় এমন চ্যানেল আছে প্রায় এক ডজনেরো বেশী। প্রত্যেকটা চ্যানেলে যদি সপ্তাহে দুইটা করেও নতুন একটা করে খন্ড নাটক চালায় তাহলে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৩০টা নতুন নাটক নির্মাণ করতে হয়।  এখন এই নাটকের অধিকাংশই যদি প্রতিষ্ঠিত নাট্য নির্মাতারা নির্মাণ করতো, তাহলেও মাসে কমপক্ষে ১০টা নতুন নাটক নির্মাণের সুযোগ পাইতো একজন তরুণ নাট্য নির্মাতা। এই সুযোগটা তারা পায় না। আর এর বাইরে তার একটা নাটক নির্মাণ করতে গেলে যে ধকলটা পোহাইতে হয়, তাও রীতিমত কম না। সবচে বড় যে বিষয়টা তার প্রথমেই ফেইস করতে হয় তা হৈলো টাকা বা প্রডিউসার যোগার করা। বাংলাদেশে ট্রাডিশনাল ওয়েতে টিভি নাটকের প্রডিউসার যোগার করা রীতিমত এলাহি কাণ্ড। পুরনো যারা প্রতিষ্ঠিত নির্মাতা, তারা শুরুতে এইসব ঝামেলা পোহাইছে বইলা এখন তারা নিজেরাই নিজেদের প্রোডাকশন হাউজগুলোর অধীনে কাজ করে। তারা আর কেবলমাত্র নির্মাতা থাকে না। তাই এক প্রকার প্রযোজক হওয়ার চিন্তা নিয়াই পরিচালনার কথা চিন্তা করতে হয় সিনেমার স্বপ্ন দেখা তরুণের। আর যদি কোনও ভাবে একজন প্রযোজক যোগার হয়েই যায়, তবে কি? কাজ শেষ? মোটেও না। এইখানে আছে অনেক কিন্তু। প্রযোজক তো বাণিজ্য করার জন্য টাকা দিচ্ছে। এখন একজন তরুণ নির্মাতার প্রোডাকশনে যখন একজন প্রযোজক টাকা লগ্নি করেন, তখন তার ব্যবসা ছাড়াও একাধিক দিকে সুবিধা আদায় করার চিন্তা থাকে। তার অন্যতম কারণ তার লগ্নিকৃত টাকা কবে ফেরৎ আসবে তার অনিশ্চয়তা। কারণ একটা নাটক যখন নির্মাণ হয় প্রযোজকের পকেট থেকে টাকাটা ব্যায় হয়ে যায় তখনই। বিপরীত দিকে এই টাকা ফেরৎ আনার প্রসেসটা কেবল দীর্ঘই নয়, অনেক ক্ষেত্রে তা অনির্দিষ্টকালের হয়ে যায়। যেমন, একটা নাটক যদি টিভি চ্যানেলের এ্যাসাইন করা না থাকে (তরুণ নির্মাতাদের নাটক কখনোই এ্যাসাইন করা থাকে না) তাহলে এই নাটক বিক্রির জন্য কম পক্ষে ১০টা টিভি চ্যানেলে প্রিভিউ এর জন্য জমা দিতে হয়। তাদের অনেকে নতুন পরিচালকের নাটক দেখেই না। অনেক চ্যানেলের তো প্রিভিউ কমিটিই নাই। কোনওটার থাকলেও তা কাজ করে না। এইসব উজিয়ে নাটকটা লাভ আর লস যাই হোক কোনও একটা জায়গায় গিয়ে যখন বিক্রি হয়, তার কিছুদিনের মাঝে তা প্রচারও হয়ে যায়। আর প্রচারের সময় দেখা যায় প্রতি বিরতিতে বিজ্ঞাপনের অভাব নেই। এত এত বিজ্ঞাপন নিয়ে নাটক প্রচার করলেও এই নাটকের মূল্য কিন্তু পরিশোধ কবে করবে তার নিশ্চয়তা নেই। হাতে গোনা দুই একটা টিভি চ্যানেল এই জায়গায় ব্যতিক্রম। তাই নাটকের পেছনে লগ্নিকারী প্রযোজক নাট্য নির্মাতা, অভিনেতা, অভিনেত্রীদের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা আদায়ের চিন্তা প্রায়ই করে থাকে।  তার জন্য এক দিক দিয়ে অবশ্য দায়ি আমাদের টিভি স্ট্যাশনগুলো। টিভি স্ট্যাশনগুলো একটা নাটক প্রচারের পর আর কোনও কিছুর চিন্তা করতে চায় না। দেশের টিভি স্টেশনগুলো যদি ন্যুনতম প্রফেশনাল চরিত্রটা ধরে রাখতো, তাহলে তরুণ নির্মাতাদের স্বপ্ন ও সম্ভাবনাটা এই তুমুল চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না। অথচ দেড়-দুই লাখ টাকা দিয়ে যখন একটা নাটক টিভি চ্যানেল কিনে, তার মাঝে যে পরিমাণ বিজ্ঞাপন তারা চালায় তার শতকরা ১০% ভাগও যদি প্রডাকশন কোম্পানী পায় তাহলে প্রযোজনা ব্যবসাটাই একটা বিশাল শিল্পে রূপান্তরিত হয়ে যেতে পারতো। টিভি স্টেশনগুলো বুঝতেই চায়না একটা তরুণ নির্মাতা কতটা কষ্ট কইরা এই দেড়-দুই লাখ টাকায় একটা নাটক দাঁড় করায়। কারণ সিনিয়ার নির্মাতারা যেখানে প্রতি নাটকে চার থেকে-আট লাখ টাকা পায়, সেখানে তার একটা নাটকের দেড় লাখ টাকা বাজেটে তার নিজের জন্য কিছুই থাকে না। অথচ তরুণদের প্রতিটা প্রডাকশনের প্রতিটা ভাজে লুকানো থাকে তার শ্রম। কারণ সে ভাল লেখকের চিত্রনাট্য কিনতে পারে না টাকার অভাবে। নিজেরই গল্প, চিত্রনাট্য লিখতে হয়। ভালো এসিস্ট্যান্ট নিতে গেলেও যে টাকা দেয়া লাগে তাও দেয়ার ক্ষমতা থাকে না। ভালো সিনেমাটোগ্রাফারের তো আর বড় বাজেট থাকে। আর তরুণদের জন্য ভালো অভিনয়শিল্পীদের কাছ থেকে শিডিউল নিতে নিতে যে ফোন বিল হয় সেইটাই তো বিশাল অংকে রূপ নেয়। আর তাদের আচরণ তো কারো অজানা না। এই হবে না, এই করবো না, এই করি না। কত যে বাহানা! এইসব বাহানার মাঝ দিয়েও তার উপর চাপ থাকে প্রডিউসারের, তিনদিনের শিডিউল দুই দিনে শেষ করেন। নইলে টাকায় কুলাইতে পারবো না। এই ভাবনা নিয়া তারা কাজ করে। আর বিক্রির পর এই টাকা চ্যানেল থেকে তুলতে গেলে স্যান্ডেল ক্ষয় হয় কয়েক জোড়া। এইসব প্রতিবন্ধকতার কারণে টিভি স্টেশন থেকে তরুণরা মুখ ফিরায়ে নিতেছে। ভিড়তেছে এনজিও বা বিজ্ঞাপনের দিকে। কিন্তু এনজিও বা বিজ্ঞাপন তো সবার কাছে ধরা দেয় না। তাই বলে কি সিনেমার স্বপ্ন তারা বাস্তবায়ন করার চেষ্ট করবে না? তারা সেই সংগ্রামটা করতেছে সমাজ ব্যবস্থা আর নিজেদের সাথেই। অথচ টিভি স্টেশনগুলো একটু দায়িত্ব নিলেই আগামী ৫ বছরেই আমুল বদলে যেতে পারতো বাংলাদেশের সিনেমার চেহারা। যেহেতু এত সহজে হচ্ছে না, তারপরও তো হচ্ছে। ধীরে ধীরে, সেই ধীরে ধীরে হওয়ার চিন্তাই করি। কি আর করা!

Read More

এই সাইটের যে কোনও লেখা যে কেউ অনলাইনে ব্যবহার করতে পারবে। তবে লেখকের নাম ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক।

Blogger template Proudly Powered by Blogger. Arranged By: এতক্ষণে অরিন্দম