রবিবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০১৩

বাংলাদেশের ভিজ্যুয়াল মিডিয়ায় মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর একটা বেশ ভালো ভূমিকা আছে। এ কথা নিশ্চয়ই কেউ অস্বীকার করবে না। আমিও করি না। আমি বরং এক কাঠি সরেশ হয়ে তাকে একটা ‘বিপ্লবী’র স্থানে দেখতে চাই। আর সেই বিপ্লবটা সেই ক্ষেত্রে, যখন বাংলাদেশের দর্শকরা ইটিভি বাংলা ছাড়া আর হাতে গোনা কয়েকজন টিভি নাট্যনির্দেশকের নাটক ছাড়া আর কিছুই বুঝতো না, তখন তিনি নতুন জানালা খোলে দিয়েছিলেন। তার টিভি নাটক মানুষ এক সময়ের ‘অয়োময়’ ‘সংসপ্তক’ এর মতো নাটক যেভাবে দেখতো ঠিক সেভাবে হয়তো দেখতো না, কিন্তু তার নাটক মানুষ উৎসব সহকারে দেখতো। এখন তিনি আর নাটক বানান না, সিনেমা বানান। একজন নির্মাতার এইটাই চূড়ান্ত পরিচয় ও অবস্থানের স্থান। তার জন্যও তিনি সেলুট পাওয়ার দাবি রাখেন। সেইটুক আমি তাকে দিতে চাই এবং তা আমার মন থেকে তিনি অকুণ্ঠভাবেই পেয়ে থাকেন। তাঁর চতুর্থ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘টেলিভিশন’। এর আগে তিনি তিন তিনটি ছবি নির্মাণ করেছেন। দর্শক সমালোচকদের কাছে প্রশংসা ও সমালোচনা তিনি দুটোই পেয়েছেন। আমার ব্যক্তিগত অবজারভেশন বলে প্রশংসা পেলে তিনি আহ্লাদে গদগদ হয়ে যান না, খুশী হন (প্রশংসা কে না পছন্দ করে?)। আবার সমালোচনা পেলে তিনি সেটাও যে খুব বিরক্ত হন তা না, তার প্রতিবাদের ভাষা অন্য রকম হয়ে গিয়ে একটা সিনেমাও হয়ে যেতে পারে। যার প্রমাণ আমরা ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’ এর প্রকাশিত ডিভিডিতে দেখেছি।
সে যাই হোক, সমালোচনাকে গ্রহণযোগ্যভাবে দেখতে না পারলে তাকে আমি ততটা গুরুত্ব দিতে রাজি না। যে কাজ করতে তার সমালোচনা হবেই। যদি সমালোচনা গ্রহণ করতে পারেন, তবেই উন্নতি হবে। নইলে যা আছে তাই থাকবে, বরং অবনতিও হতে পারে। এই কথাগুলো বলা এ কারণে যে, সরয়ার ফারুকির তৃতীয় ছবি যখন মুক্তি পায়, তখন প্রয়াত নির্মাতা তারেক মাসুদ বলেছিলেন, দান দান তিন দানে যেমন আমরা সেরাটা প্রত্যাশা করি, সরয়ার এর কাছেও তাই প্রত্যাশা করি। তবে সেই ছবি দেখার পর তারেক মাসুদের প্রতিক্রিয়া কি হয়েছিলো তা আমার জানা নাই। তাই আমি ঠিক এটা বলতে পারছিনা তৃতীয় দানটা কি তিনি পুরনো দানগুলোর লাভ-ক্ষতি পুষিয়ে দিয়েছিলেন কিনা। এইখানে আমার সন্দেহ রয়েছে। কারণ সেই তৃতীয় দান অতিক্রম করে এখন চতুর্থ দান-এ গিয়ে পরেছেন তিনি। একজন চলচ্চিত্রকার যদি তার চতুর্থ ছবিতে এসেও আশ্চর্য রকম কিছু করতে না পারেন, তাহলে সাধারণত ধরে নিয়ে থাকি সেই চলচ্চিত্রকার আর আশ্চর্যরকম কিছু করতে পারবে না। এ কথা সব ক্ষেত্রেই কাজে দেয় বলে ধারণা করি। যদিও ব্যতিক্রম সব সময়ই হিসেবের বাইরে।
এবার আসি মূল প্রসঙ্গে। ‘টেলিভিশন’ ছবিটি প্রথম প্রিমিয়ার হয়েছে ‘পুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব-২০১২’ তে। তবুও যেনতেন প্রিমিয়ার নয়, ক্লোজিং ফিল্ম হিসেবে তা প্রিমিয়ার হয়েছে। এই ছবি দেখে আমারও (অন্য অনেকের মতো- সেই দলে এই ছবির নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকিও রয়েছেন) প্রিয় নির্মাতা কিম কি দুক বলেছেন, গুড ফিল্ম। পরবর্তিতে দুবাই আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফ্যাস্টিভ্যালে এ ছবি ‘বিশেষ পুরস্কার’ পেয়েছে। এসব কারণে ‘টেলিভিশন’ ছবি নিয়ে আগ্রহ ছিলো। সেই আগ্রহ মেটাতে শুক্রবার বিকেলেই ছবিটি দেখার মনস্থির করেছিলাম। নানান কারণে তা হলো না। শনিবার সন্ধ্যার টিকিট করে সারারাত সারাদিন এর অপেক্ষায় ছিলাম। সিনেমা শুরুর সময় সিনেমার টাইটেল প্রেজেন্টেশন ভালো লেগেছে। ছবির রিভিউ পড়ার সুবাদে গল্পটি জেনে গিয়েছিলাম আগেই। যা জেনেছি তাতে মনে হৈছে এই ছবির বাংলাদেশী কোনও প্রিমিয়ার হৈলে ছবিটা দর্শকদের কাছ থেকে গ্রহণযোগ্যতা এখন যতটুকু পাচ্ছে তার চেয়ে হয়তো একটু কম পেতো। ছবির গল্প মোটামোটি এই- একজন ধর্মান্ধ চেয়ারম্যান (ধর্মভিরু বলবো না এই কারণে যে, ধর্ম ভিরুরা কখনোই ধর্ম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে না, কেবল নিজে বাঁচার জন্য ধর্মের আশ্রয় নেয়। অপরদিকে ধর্মান্ধরা ধর্মকে ঢাল করে চারপাশে ধর্মের লৌকিক জগত তৈরি করতে চায়। এই ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র আমার ধারণা তাই করেছে। এ কারণেই তিনি ধর্মান্ধ) নিজের গ্রামে টেলিভিশন নিষিদ্ধ করেছে। তার ধারণা টেলিভিশন দেখলেই মানুষ নষ্ট হয়ে যাবে। এই টেলিভিশনের কাছেই তাকে শেষ পর্যন্ত পরাজিত হইতে হয়। মাঝখানে আছে প্রেম, সংগ্রাম, আর কিছুটা ড্রামা। এইসব বিস্তারিত বলার তেমন ইচ্ছাই হইতেছে না। ছবিটা নিয়া যে লিখতে বসছি তার কারণ অন্য। তার কারণ হৈলো এই ছবিটার প্রত্যাশার পারদ এত বেশী উড়ছিলো যে, তেমনি কইরা পারদ গইল্যা কুয়াশা হৈয়া গেছে। ছবির গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ঐ চেয়ারম্যান এতই ধর্মান্ধ যে পাসপোর্ট করতে ছবি তুলতে হবে বলে সে হজ্জ্ব করতে যেতে চায় না। কিন্তু এই ছবির দুই গল্পকার ভুলে যায় চেয়াম্যান নির্বাচন করতে হলে যে মনোনয়ন পত্র জমা দিতে হয় তাতে প্রার্থীর ছবি দিতেই হবে। না দিলে মনোনয়ন বাতিল। যে গ্রামে টেলিভিশন চলে না সেই গ্রামে ইন্টারনেট চলে। টেলিভিশনের চেয়ে যে ইন্টারনেট নষ্ট হয়ে যাওয়ার জন্য আরও ভয়ঙ্কর তা তো বলার অপেক্ষাই রাখে না। এমন কন্ট্রাডিকশন নিয়ে ছবির গল্প। ছবির প্রথমার্ধে প্রচুর হিউমার। আর এই হিউমারের কারণে প্রথমার্ধে গল্পের চেয়ে আনন্দই বেশী দেয়া বলে মনে হলো। মনে হলো এতই যদি হিউমার আনতে হয় তাহলে কেবল সংলাপ দিয়ে কেনো? নোয়াখালির একটা দ্বীপের মতো অঞ্চল বলেই কি ঐ দ্বীপের মানুষদের কথায় হিউমার বেশী থাকবে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজবো না। কারণ খুঁজে লাভ নেই। এই উত্তর ছবিতে নেই। এই প্রথম অর্ধের ভেতর সিনেমা দেখতে বসছি এই কথা একবারও মনে হয় নাই, কেবল মনে হৈতেছিলো যে সিনেমা দেখতে আসছি কিন্তু সিনেমাটা কখন শুরু হবে? সেই সিনেমা আর শুরু হয় নাই। মাঝে মাঝে ট্রেলার দেখাইয়া আবার তার নিজের স্থানে ফেরত গেছে। অভিনেতা অভিনেত্রীদের অধিকাংশেরই মুখে নোয়াখালি অঞ্চলের ভাষাটা কেমন যেনো মানানসই লাগছিলো না। মনে হচ্ছিলো তারা নোয়াখালীর ভাষাই বলতেছে তবে মুখস্থ করে। চেয়ারম্যান চরিত্রে শাহির হুদা রুমিকে নির্বাচন আমার মোটেও মনপুত হয় নি। এই গল্প কেনো নোয়াখালির হবে তাও ঠিক ততটা স্পষ্ট না। একটা কারণ হিসেবে দাঁড় করানো যায়, তা হলো ঐ দ্বীপ সাম্রাজ্যের প্রসঙ্গ। কিন্তু সেই প্রসঙ্গ ধূপে টেকে না কারণ, যে এই ক্ষমতাটা দেখাতে পারে সে সবখানেই পারে। যেই গল্পটি এই ছবিতে বলা হয়েছে, সুদূর গ্রামের গল্প যেখানে টেলিভিশন ও মোবাইল ফোনই রীতিমত আন-এভিইলেবল, সেই গল্প বলার জন্য আধুনিক ব্যান্ড শিল্পীদের মিউজিকে করা একেরপর এক গান অন্যদের কেমন লেগেছে তা আমার জানা নাই। ছবিতে ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর খুঁজেই পাই নাই। ছবির সিনেমাটোগ্রাফি আরামদায়ক ছিলো। লাইট চমৎকার, কম্পোজিশনও বেশ ভালো। কিন্তু বারবার যে জিনিসটি মিস করতেছিলাম তা হৈলো ঐ সিনেমা সিনেমা ভাব। আজকে যখন অফিসে কথা হচ্ছিলো টেলিভিশন নিয়ে, তখন একজন বললো তার মেয়ে ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’ সিনেমা দেখার পর নাকি বলছিলো টেলিফিল্ম দেখতেছে। আমি একটা জায়গা ভেবে প্রতিবাদ করি নি। কারণ, টিভির নির্মাতারা সিনেমা বানাতে গেলে তারা টিভির যে চর্চা, ঐ চর্চার মতো করেই সিনেমা বানাতে চায়। আর এ কারণেই সিনেমা দেখার পরও তা টিভি প্রোডাকশন বলে মনে হয়। এই ছবি দেখার পরও আমার তাই মনে হচ্ছিলো। আমি সেই মোস্তফা সরয়ার ফারুকী কেই দেখছি যিনি ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’ ছবির পরিচালক। কিছুটা মুন্সিয়ানা এখানেও দেখিয়েছেন সেটা ঐ প্রত্যাশার পারদ যে উঁচুতে উঠছিলো তা মেটায় নাই। কিছু কিছু আশ্চর্য রকম চিত্রকল্প কিছু কিছু বিরক্তিকর দৃশ্যায়নের সাথে প্লাসে মাইনাসে ছবিটার অনেক ক্ষেত্রেই যোগফল রাখতে সাহস পায় না। তবে ছবির বেশ কিছু জায়গা চোখে লেগে থাকবে তার একটি হলো কুহিনূরের (তিশা) সাথে সোলাইমানের (চঞ্চল) ফোনে কথা বলার দৃশ্য। ফোনটি কোনও এক জায়গায় রেখে দাও, যেন আমি তোমার হাটা চলার শব্দ শুনতে পাই আর মনের ‘টেলিভিশন’ দিয়ে দেখতে পাই তোমারে। অসাধারণ সরয়ার ভাই। আপনি যে পারেন এই দৃশ্যে আপনি তা দেখিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু আপনি বলুনতো, এই দৃশ্যটা যে সিনেমায় থাকে সেই সিনেমাটার অন্যসবকিছু এর আশ-পাশের মানেরও হয়েছে? আমি জানি না। এছাড়া ছবির শেষে যখন আমিন চেয়ারম্যান প্রতারিত হয়ে হোটেলে মাস কাটিয়ে হজ্জ্বের কথা বলে বাড়ি আসবে বলে চিন্তা করে। বা অপেক্ষা করে হজ্জ্ব করে তবেই বাড়ি যাবে, তার যে পরাজয় এই পরাজয় কি কাম্য? এই পরাজয় কি তাকে মাটিতে মিশিয়ে দেয় না? সেই পরাজয়ের গল্প তো তার গ্রামেই সবচেয়ে বেশী অনুভূতিপ্রবণ হতে পারতো। অন্তত আমার তাই মনে হয়। অথবা আমিন চেয়ারম্যানের যে হজ্জ্বের জন্য হাহাকার, তা যত দীর্ঘ সময় দেখানো হয়েছে, এতে করে কি হাহাকার খুব তীব্র বোঝা যায়? আমি বুঝি নি। ছবির অনেক ক্ষেত্রেই মনে হয়েছে আপনি ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর ইচ্ছা করেই এড়িয়ে গেছেন। এই এড়িয়ে যাওয়াকে কি আপনার অন্য কোনও পরিকল্পনা কাজ করেছে? এই পরিকল্পনার কারণে কিন্তু অনেক ভালো ইমোশন ক্রিয়েট করার সুযোগ তৈরি হয়েও হয় নি। তা কি ভালো হলো? এত এত প্রশ্নের উত্তর আমি পাই নি। মনে হয় পাবোও না।
তারপরও ছবিটা হয়তো দেশের বাইরের আরও কিছু ফ্যাস্টিভ্যালে যাবে, কিছু পুরস্কারও পাবে। তবে এ প্রসঙ্গে কিছু না বললেই নয়। তা হলো আমাদের ছবি নিয়ে বড় বড় ফ্যাস্টিভ্যাল কমিটির যে দৃষ্টিভঙ্গিটা থাকে তা হলো, বাংলাদেশ একটা উন্নয়নশীল দেশ, এই দেশের উন্নয়নশীল ছবির জন্য আমরা না হয় একটু সহযোগীতা করলামই। এই দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি আমাদের গল্প ও নিজেদের বিক্রয় করবার যা থাকে তা হলো তাদের মনোযোগ আকর্ষণের ভাবনাগুলো। এই ছবিতে তা করা হয়েছে বলেই মনে হয়েছে আমার। যেই অভিযোগটা তারেক মাসুদকে নিয়েও কেউ কেউ করেছিলো। তার নামে অভিযোগ ছিলো, তারেক মাসুদ ইউরুপের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ছবি বানায়, এ কারণে সেই ছবি সেইসব ফ্যাস্টিভ্যালে প্রশংসিত হয়। এই অভিযোগ পুরুপুরি সত্য না হলেও কিছুটা তার সাথে যায়। যদিও তিনি তা অতিক্রম করেও দেখিয়েছেন। কিন্তু এই ছবিতেও তো একই ভাবনার প্রমাণ পাই। নয়তো ‘টেলিভিশন’ এর গল্প বলতে গিয়ে ধর্মীয় একটি চরিত্রই কেনো শিকার হবে তার?

সিনেমাহলের ‘টেলিভিশন’

at রবিবার, জানুয়ারি ২৭, ২০১৩  |  9 comments

বাংলাদেশের ভিজ্যুয়াল মিডিয়ায় মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর একটা বেশ ভালো ভূমিকা আছে। এ কথা নিশ্চয়ই কেউ অস্বীকার করবে না। আমিও করি না। আমি বরং এক কাঠি সরেশ হয়ে তাকে একটা ‘বিপ্লবী’র স্থানে দেখতে চাই। আর সেই বিপ্লবটা সেই ক্ষেত্রে, যখন বাংলাদেশের দর্শকরা ইটিভি বাংলা ছাড়া আর হাতে গোনা কয়েকজন টিভি নাট্যনির্দেশকের নাটক ছাড়া আর কিছুই বুঝতো না, তখন তিনি নতুন জানালা খোলে দিয়েছিলেন। তার টিভি নাটক মানুষ এক সময়ের ‘অয়োময়’ ‘সংসপ্তক’ এর মতো নাটক যেভাবে দেখতো ঠিক সেভাবে হয়তো দেখতো না, কিন্তু তার নাটক মানুষ উৎসব সহকারে দেখতো। এখন তিনি আর নাটক বানান না, সিনেমা বানান। একজন নির্মাতার এইটাই চূড়ান্ত পরিচয় ও অবস্থানের স্থান। তার জন্যও তিনি সেলুট পাওয়ার দাবি রাখেন। সেইটুক আমি তাকে দিতে চাই এবং তা আমার মন থেকে তিনি অকুণ্ঠভাবেই পেয়ে থাকেন। তাঁর চতুর্থ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘টেলিভিশন’। এর আগে তিনি তিন তিনটি ছবি নির্মাণ করেছেন। দর্শক সমালোচকদের কাছে প্রশংসা ও সমালোচনা তিনি দুটোই পেয়েছেন। আমার ব্যক্তিগত অবজারভেশন বলে প্রশংসা পেলে তিনি আহ্লাদে গদগদ হয়ে যান না, খুশী হন (প্রশংসা কে না পছন্দ করে?)। আবার সমালোচনা পেলে তিনি সেটাও যে খুব বিরক্ত হন তা না, তার প্রতিবাদের ভাষা অন্য রকম হয়ে গিয়ে একটা সিনেমাও হয়ে যেতে পারে। যার প্রমাণ আমরা ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’ এর প্রকাশিত ডিভিডিতে দেখেছি।
সে যাই হোক, সমালোচনাকে গ্রহণযোগ্যভাবে দেখতে না পারলে তাকে আমি ততটা গুরুত্ব দিতে রাজি না। যে কাজ করতে তার সমালোচনা হবেই। যদি সমালোচনা গ্রহণ করতে পারেন, তবেই উন্নতি হবে। নইলে যা আছে তাই থাকবে, বরং অবনতিও হতে পারে। এই কথাগুলো বলা এ কারণে যে, সরয়ার ফারুকির তৃতীয় ছবি যখন মুক্তি পায়, তখন প্রয়াত নির্মাতা তারেক মাসুদ বলেছিলেন, দান দান তিন দানে যেমন আমরা সেরাটা প্রত্যাশা করি, সরয়ার এর কাছেও তাই প্রত্যাশা করি। তবে সেই ছবি দেখার পর তারেক মাসুদের প্রতিক্রিয়া কি হয়েছিলো তা আমার জানা নাই। তাই আমি ঠিক এটা বলতে পারছিনা তৃতীয় দানটা কি তিনি পুরনো দানগুলোর লাভ-ক্ষতি পুষিয়ে দিয়েছিলেন কিনা। এইখানে আমার সন্দেহ রয়েছে। কারণ সেই তৃতীয় দান অতিক্রম করে এখন চতুর্থ দান-এ গিয়ে পরেছেন তিনি। একজন চলচ্চিত্রকার যদি তার চতুর্থ ছবিতে এসেও আশ্চর্য রকম কিছু করতে না পারেন, তাহলে সাধারণত ধরে নিয়ে থাকি সেই চলচ্চিত্রকার আর আশ্চর্যরকম কিছু করতে পারবে না। এ কথা সব ক্ষেত্রেই কাজে দেয় বলে ধারণা করি। যদিও ব্যতিক্রম সব সময়ই হিসেবের বাইরে।
এবার আসি মূল প্রসঙ্গে। ‘টেলিভিশন’ ছবিটি প্রথম প্রিমিয়ার হয়েছে ‘পুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব-২০১২’ তে। তবুও যেনতেন প্রিমিয়ার নয়, ক্লোজিং ফিল্ম হিসেবে তা প্রিমিয়ার হয়েছে। এই ছবি দেখে আমারও (অন্য অনেকের মতো- সেই দলে এই ছবির নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকিও রয়েছেন) প্রিয় নির্মাতা কিম কি দুক বলেছেন, গুড ফিল্ম। পরবর্তিতে দুবাই আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফ্যাস্টিভ্যালে এ ছবি ‘বিশেষ পুরস্কার’ পেয়েছে। এসব কারণে ‘টেলিভিশন’ ছবি নিয়ে আগ্রহ ছিলো। সেই আগ্রহ মেটাতে শুক্রবার বিকেলেই ছবিটি দেখার মনস্থির করেছিলাম। নানান কারণে তা হলো না। শনিবার সন্ধ্যার টিকিট করে সারারাত সারাদিন এর অপেক্ষায় ছিলাম। সিনেমা শুরুর সময় সিনেমার টাইটেল প্রেজেন্টেশন ভালো লেগেছে। ছবির রিভিউ পড়ার সুবাদে গল্পটি জেনে গিয়েছিলাম আগেই। যা জেনেছি তাতে মনে হৈছে এই ছবির বাংলাদেশী কোনও প্রিমিয়ার হৈলে ছবিটা দর্শকদের কাছ থেকে গ্রহণযোগ্যতা এখন যতটুকু পাচ্ছে তার চেয়ে হয়তো একটু কম পেতো। ছবির গল্প মোটামোটি এই- একজন ধর্মান্ধ চেয়ারম্যান (ধর্মভিরু বলবো না এই কারণে যে, ধর্ম ভিরুরা কখনোই ধর্ম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে না, কেবল নিজে বাঁচার জন্য ধর্মের আশ্রয় নেয়। অপরদিকে ধর্মান্ধরা ধর্মকে ঢাল করে চারপাশে ধর্মের লৌকিক জগত তৈরি করতে চায়। এই ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র আমার ধারণা তাই করেছে। এ কারণেই তিনি ধর্মান্ধ) নিজের গ্রামে টেলিভিশন নিষিদ্ধ করেছে। তার ধারণা টেলিভিশন দেখলেই মানুষ নষ্ট হয়ে যাবে। এই টেলিভিশনের কাছেই তাকে শেষ পর্যন্ত পরাজিত হইতে হয়। মাঝখানে আছে প্রেম, সংগ্রাম, আর কিছুটা ড্রামা। এইসব বিস্তারিত বলার তেমন ইচ্ছাই হইতেছে না। ছবিটা নিয়া যে লিখতে বসছি তার কারণ অন্য। তার কারণ হৈলো এই ছবিটার প্রত্যাশার পারদ এত বেশী উড়ছিলো যে, তেমনি কইরা পারদ গইল্যা কুয়াশা হৈয়া গেছে। ছবির গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ঐ চেয়ারম্যান এতই ধর্মান্ধ যে পাসপোর্ট করতে ছবি তুলতে হবে বলে সে হজ্জ্ব করতে যেতে চায় না। কিন্তু এই ছবির দুই গল্পকার ভুলে যায় চেয়াম্যান নির্বাচন করতে হলে যে মনোনয়ন পত্র জমা দিতে হয় তাতে প্রার্থীর ছবি দিতেই হবে। না দিলে মনোনয়ন বাতিল। যে গ্রামে টেলিভিশন চলে না সেই গ্রামে ইন্টারনেট চলে। টেলিভিশনের চেয়ে যে ইন্টারনেট নষ্ট হয়ে যাওয়ার জন্য আরও ভয়ঙ্কর তা তো বলার অপেক্ষাই রাখে না। এমন কন্ট্রাডিকশন নিয়ে ছবির গল্প। ছবির প্রথমার্ধে প্রচুর হিউমার। আর এই হিউমারের কারণে প্রথমার্ধে গল্পের চেয়ে আনন্দই বেশী দেয়া বলে মনে হলো। মনে হলো এতই যদি হিউমার আনতে হয় তাহলে কেবল সংলাপ দিয়ে কেনো? নোয়াখালির একটা দ্বীপের মতো অঞ্চল বলেই কি ঐ দ্বীপের মানুষদের কথায় হিউমার বেশী থাকবে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজবো না। কারণ খুঁজে লাভ নেই। এই উত্তর ছবিতে নেই। এই প্রথম অর্ধের ভেতর সিনেমা দেখতে বসছি এই কথা একবারও মনে হয় নাই, কেবল মনে হৈতেছিলো যে সিনেমা দেখতে আসছি কিন্তু সিনেমাটা কখন শুরু হবে? সেই সিনেমা আর শুরু হয় নাই। মাঝে মাঝে ট্রেলার দেখাইয়া আবার তার নিজের স্থানে ফেরত গেছে। অভিনেতা অভিনেত্রীদের অধিকাংশেরই মুখে নোয়াখালি অঞ্চলের ভাষাটা কেমন যেনো মানানসই লাগছিলো না। মনে হচ্ছিলো তারা নোয়াখালীর ভাষাই বলতেছে তবে মুখস্থ করে। চেয়ারম্যান চরিত্রে শাহির হুদা রুমিকে নির্বাচন আমার মোটেও মনপুত হয় নি। এই গল্প কেনো নোয়াখালির হবে তাও ঠিক ততটা স্পষ্ট না। একটা কারণ হিসেবে দাঁড় করানো যায়, তা হলো ঐ দ্বীপ সাম্রাজ্যের প্রসঙ্গ। কিন্তু সেই প্রসঙ্গ ধূপে টেকে না কারণ, যে এই ক্ষমতাটা দেখাতে পারে সে সবখানেই পারে। যেই গল্পটি এই ছবিতে বলা হয়েছে, সুদূর গ্রামের গল্প যেখানে টেলিভিশন ও মোবাইল ফোনই রীতিমত আন-এভিইলেবল, সেই গল্প বলার জন্য আধুনিক ব্যান্ড শিল্পীদের মিউজিকে করা একেরপর এক গান অন্যদের কেমন লেগেছে তা আমার জানা নাই। ছবিতে ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর খুঁজেই পাই নাই। ছবির সিনেমাটোগ্রাফি আরামদায়ক ছিলো। লাইট চমৎকার, কম্পোজিশনও বেশ ভালো। কিন্তু বারবার যে জিনিসটি মিস করতেছিলাম তা হৈলো ঐ সিনেমা সিনেমা ভাব। আজকে যখন অফিসে কথা হচ্ছিলো টেলিভিশন নিয়ে, তখন একজন বললো তার মেয়ে ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’ সিনেমা দেখার পর নাকি বলছিলো টেলিফিল্ম দেখতেছে। আমি একটা জায়গা ভেবে প্রতিবাদ করি নি। কারণ, টিভির নির্মাতারা সিনেমা বানাতে গেলে তারা টিভির যে চর্চা, ঐ চর্চার মতো করেই সিনেমা বানাতে চায়। আর এ কারণেই সিনেমা দেখার পরও তা টিভি প্রোডাকশন বলে মনে হয়। এই ছবি দেখার পরও আমার তাই মনে হচ্ছিলো। আমি সেই মোস্তফা সরয়ার ফারুকী কেই দেখছি যিনি ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’ ছবির পরিচালক। কিছুটা মুন্সিয়ানা এখানেও দেখিয়েছেন সেটা ঐ প্রত্যাশার পারদ যে উঁচুতে উঠছিলো তা মেটায় নাই। কিছু কিছু আশ্চর্য রকম চিত্রকল্প কিছু কিছু বিরক্তিকর দৃশ্যায়নের সাথে প্লাসে মাইনাসে ছবিটার অনেক ক্ষেত্রেই যোগফল রাখতে সাহস পায় না। তবে ছবির বেশ কিছু জায়গা চোখে লেগে থাকবে তার একটি হলো কুহিনূরের (তিশা) সাথে সোলাইমানের (চঞ্চল) ফোনে কথা বলার দৃশ্য। ফোনটি কোনও এক জায়গায় রেখে দাও, যেন আমি তোমার হাটা চলার শব্দ শুনতে পাই আর মনের ‘টেলিভিশন’ দিয়ে দেখতে পাই তোমারে। অসাধারণ সরয়ার ভাই। আপনি যে পারেন এই দৃশ্যে আপনি তা দেখিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু আপনি বলুনতো, এই দৃশ্যটা যে সিনেমায় থাকে সেই সিনেমাটার অন্যসবকিছু এর আশ-পাশের মানেরও হয়েছে? আমি জানি না। এছাড়া ছবির শেষে যখন আমিন চেয়ারম্যান প্রতারিত হয়ে হোটেলে মাস কাটিয়ে হজ্জ্বের কথা বলে বাড়ি আসবে বলে চিন্তা করে। বা অপেক্ষা করে হজ্জ্ব করে তবেই বাড়ি যাবে, তার যে পরাজয় এই পরাজয় কি কাম্য? এই পরাজয় কি তাকে মাটিতে মিশিয়ে দেয় না? সেই পরাজয়ের গল্প তো তার গ্রামেই সবচেয়ে বেশী অনুভূতিপ্রবণ হতে পারতো। অন্তত আমার তাই মনে হয়। অথবা আমিন চেয়ারম্যানের যে হজ্জ্বের জন্য হাহাকার, তা যত দীর্ঘ সময় দেখানো হয়েছে, এতে করে কি হাহাকার খুব তীব্র বোঝা যায়? আমি বুঝি নি। ছবির অনেক ক্ষেত্রেই মনে হয়েছে আপনি ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর ইচ্ছা করেই এড়িয়ে গেছেন। এই এড়িয়ে যাওয়াকে কি আপনার অন্য কোনও পরিকল্পনা কাজ করেছে? এই পরিকল্পনার কারণে কিন্তু অনেক ভালো ইমোশন ক্রিয়েট করার সুযোগ তৈরি হয়েও হয় নি। তা কি ভালো হলো? এত এত প্রশ্নের উত্তর আমি পাই নি। মনে হয় পাবোও না।
তারপরও ছবিটা হয়তো দেশের বাইরের আরও কিছু ফ্যাস্টিভ্যালে যাবে, কিছু পুরস্কারও পাবে। তবে এ প্রসঙ্গে কিছু না বললেই নয়। তা হলো আমাদের ছবি নিয়ে বড় বড় ফ্যাস্টিভ্যাল কমিটির যে দৃষ্টিভঙ্গিটা থাকে তা হলো, বাংলাদেশ একটা উন্নয়নশীল দেশ, এই দেশের উন্নয়নশীল ছবির জন্য আমরা না হয় একটু সহযোগীতা করলামই। এই দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি আমাদের গল্প ও নিজেদের বিক্রয় করবার যা থাকে তা হলো তাদের মনোযোগ আকর্ষণের ভাবনাগুলো। এই ছবিতে তা করা হয়েছে বলেই মনে হয়েছে আমার। যেই অভিযোগটা তারেক মাসুদকে নিয়েও কেউ কেউ করেছিলো। তার নামে অভিযোগ ছিলো, তারেক মাসুদ ইউরুপের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ছবি বানায়, এ কারণে সেই ছবি সেইসব ফ্যাস্টিভ্যালে প্রশংসিত হয়। এই অভিযোগ পুরুপুরি সত্য না হলেও কিছুটা তার সাথে যায়। যদিও তিনি তা অতিক্রম করেও দেখিয়েছেন। কিন্তু এই ছবিতেও তো একই ভাবনার প্রমাণ পাই। নয়তো ‘টেলিভিশন’ এর গল্প বলতে গিয়ে ধর্মীয় একটি চরিত্রই কেনো শিকার হবে তার?

Read More

বুধবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০১৩

তাইওয়ানের ডিরেক্টর অং-কার ওয়াই এর একটা ছবি দেখতে বসেছিলাম। ছবিটার নাম হ্যাপি টুগেদার। ১৯৯৭ সালে মুক্তি পাওয়া এ ছবি বিশ্বের বেশ কয়েকটি বড় বড় চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার পেয়েছে। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সমালোচকদের কাছ থেকে পেয়ে অনেক প্রশংসাসূচক বাক্য। ছবিটার গল্পের মুল বিষয় হলও প্রেম। কিন্তু এই প্রেম রোমিও-জুলিয়েট, শিরি-ফরহাদ বা রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের মতো তো নয়ই বরং বলা যায়, স্বাভাবিক জীবনের একটি ছেলের সাথে একটি মেয়ের প্রেমের গল্প নয়। গল্পটি একটি ছেলের সাথে একটি ছেলের প্রেমের। আর এই প্রেমের পাশাপাশি এখানে যৌন জীবনও এসে হাজির। একটি ছেলের সাথে একটি ছেলের যখন যৌন জীবনের সম্পর্ক তৈরি হয়, তখন সেটাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বা সমাজ জীবনের চোখে স্বাভাবিক যৌন জীবন হিসেবে উল্লেখ করা হয় না। তখন এই অবস্থাটাকে চিহ্নায়ন করার জন্য পৃথক শব্দ ব্যবহার করা হয়, আর তা হলও ‘সমকাম’। এই সমকাম শুধু ছেলেদের মাঝেই নয়, মেয়েদের মাঝেও রয়েছে। আর এই বিষয়ক একটি জীবনের গল্প নিয়ে আমি প্রথম যে ছবিটি দেখি তা দীপা মেহতার ‘ফায়ার’। এ ছবিতে দুই জন বিবাহিত নারী এই রকম একটি যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। আর সেই চরিত্র দুটো রূপায়ন করেছিলো শাবানা আজমি ও নন্দিতা দাশ। পর্দায় সম-লিঙ্গের যৌন সম্পর্কের ছবি দেখার সেই আমার প্রথম অভিজ্ঞতা। পরবর্তীতে আমি অনেক ছবি দেখেছি যার মাঝে সম-লিঙ্গের সম্পর্কের গল্প রয়েছে। সেইসব ছবির মাঝে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো হলও ‘ব্রোকব্যাক মাউন্টেন’, ‘রোম ইন দ্যা রুম’, ‘দ্যা বোং কানেকশনসহ অনেক। এইসব ছবির পাশে একটা ছেলের সাথে আর একটা ছেলের যৌন সম্পর্কের গল্প আমি দেখেছি ভারতীয় ছবি ‘আই এম’ এ। তবে সেখানকার প্রেক্ষাপটটা আরও ভিন্ন। সেখানে একজন পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ তার স্ত্রীর প্রথম পক্ষের ছেলে শিশুটিকে যৌন নির্যাতন করতো। এই নির্যাতনটা মূলত ঐ শিশুটির জীবনের ভবিষ্যৎ ভাবনায় এক বড় প্রভাব ফেলে পরবর্তীতে। সে মেয়েদেরও এড়িয়ে চলতে চায়। চায় কুৎসিত যৌন জীবনকে অতিক্রম করে একটা নিজের মতো জীবন গড়তে। যদিও সেটা স্বাভাবিক জীবন নয়, কিন্তু সেও এক সময় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। ফিরে আসলেও তার শৈশবের সেইসব নির্যাতনের স্মৃতি তাকে সব সময়ই তাড়িয়ে বেড়ায়। এই সেক্স এবিউজের যে অভিজ্ঞতা এই বিষয়টি নিয়ে আমার দেখা ছবির ভেতর ছবির ভাগ নেই বললেই চলে। স-বেধন নীলমণি ঐ ‘আই এম’। কিন্তু এই বিষয়টি নিয়ে আমার ভাবনা রয়েছে। আমি মনে করি আমাদের সমাজে শিশু ও শৈশবের এমন যৌন নির্যাতনের ফলে নির্যাতিতার মস্তিষ্কে এক ধরণের চাপ তৈরি হয়। আর এই চাপের ফলে সেই শিশুটি যখন প্রাপ্ত বয়স্ক হয় তখনো তার ভেতর এই স্বাভাবিক জীবনের অংশ হিসেবে যৌন জীবন নিয়ে এক ধরণের কমপ্লেক্স কাজ করে। যার ফলে সে মানসিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীনও হতে পারে। আবার উল্টো ফলও দেখা দিতে পারে ঐ প্রাপ্ত বয়স্ক যুবকটির মনে। সে হয়ে উঠতে পারে বিকৃত যৌন মানসিকতার ধারক। আর এর প্রভাব পড়বে সমাজে। সাম্প্রতিক কালে একের পর এক বিশ্রী যৌন অত্যাচারের খবরগুলোও এমনই কোনও বিকৃত যৌন চেতনার ধারকের ফলে হয়ে থাকতে পারে। এর পেছনের কারণ হিসেবে আমি ধারণা করতে পারি শৈশবের যৌন নির্যাতনের শিকারকে। আর এই একটা ছেলের (পূর্ণ বয়স্ক যুবকের) কাছে একটা শিশুর যৌন নির্যাতনের ঘটনা যে আমাদের সমাজেও ঘটছে বা ঘটে আসছে এই বিষয়ে এখন পর্যন্ত সমাজকর্মী বা শিল্পের কোনও শাখাতেই তার প্রকাশ দেখি নি। আমাদের চলচ্চিত্রে তো নয়ই। অথচ তা আসাটাও কিন্তু জরুরী। একটা উদাহরণ দিলেই বিষয়টি সম্পর্কে ধারণা করা যেতে পারে এই নির্যাতনটি কি পরিমাণ ভয়ঙ্কর ও জঘন্য।
বছর দেড়েক আগে আমি তখন দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকায় কাজ করি। মরে যাওয়া পত্রিকাটি তখন নতুন যৌবনের উদ্যম নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছিলো। তখন একদিন হঠাৎ নিউজ ডেস্কে আমার হাতে একটি খবর সম্পাদনের জন্য আসে। খবরটি পরে আমি অনেকটা অবাক হই। খবরটি একটি খুনের ঘটনার। উত্তরায় এক কিশোর কর্তৃক এক মোবাইল ফোন রি-চার্জ ব্যবসায়ী খুন হন। পুলিশ ঐ কিশোর ছেলেটিকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে ছেলেটি তার দোষ স্বীকার করে। খুন হওয়া ব্যক্তিটি একজন মোল্লা টাইপের মানুষ ছিলও। নামাজ পড়তো। মুখ ভর্তি দাড়ি ছিলও। এই লোকটিকে একটা কিশোর ছেলে কেনও খুন করতে পারে বলে মনে হয়? ছেলেটি তার দোকানে কর্মচারীর কাজ করতো। তবে কি ছেলেটিকে লোকটি নির্যাতন করতো? পরিশ্রম বেশী করাতো আর পারিশ্রমিক কম দিতো? এইসব ক্ষেত্রে আমাদের দেশে মানুষ এখনো ততটা হিংস্র হয়ে প্রতিবাদ করে থাকে না। এই খুনের ঘটনার পেছনে যেই নির্যাতনের ঘটনাটি পাওয়া যায় তখন তা হলও ঐ মোল্লা টাইপের লোকটি ঐ ছেলেটিকে যৌন নির্যাতন করতো। এবং ঘটনা এক সময় যখন তার সহ্যের সীমা অতিক্রম করে, তখন ছেলেটি তাকে রাগ বা ঝোঁকের মাথায় খুন করে ফেলে। আমি যখন খবরটি সম্পাদনা করে বার্তা প্রধানের ডেস্কে দিয়ে দেই তিনি তখন এই সংবাদটিকে এক কলামের একটি স্থান বরাদ্দ করতে বলে। আমি তখন প্রতিবাদ করে বলি, এই ধরনের যৌন নির্যাতন দেশে হর হামেশাই হচ্ছে কিন্তু নানান কারণে খবরে আসছে না। কি পরিমাণ জঘন্য অত্যাচারের মুখোমুখি হলে একটা ছেলে একটা মানুষকে খুন করতে পারে এই ঘটনা তার প্রমাণ দেয়। তাই এটা বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। আমার কথায় সেদিন ঐ খবরটি শেষের পাতায় বক্স আইটেম করে প্রকাশিত হয়েছিলো। এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি আমিও হয়েছি। তখন আমি দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ি, আমাদের পাড়ায় আমার সম বয়সী এক বন্ধু তার প্রতিবেশী এক সাহেব কাছে ডাকলে না যাওয়ায় আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। কেন তার কাছে সে যেতে চায় না। সে বলতে চাইতো না। আমি জোর করায় সে হাতের আঙুল দিয়ে এমন কিছু বিশ্রী ইঙ্গিত করেছিলো যে, তাতে আমার বুঝতে বাকি ছিলও না ঐ লোকটির কোনও এক সময়কার লালসার শিকার হয়েছিলো আমার বন্ধুটি। সাম্প্রতিক সময়েও আমি আমার চারপাশের বেশ কিছু বন্ধুদের সাথে কথা বলে জেনেছি, তাদের মাঝেও কেউ কেউ শৈশবে এমন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায় এই নির্যাতনের পদ্ধতিটি একটি ধারাবাহিক ব্যাধির মতো আমরা আমাদের সমাজে বহন করে চলেছি। কিন্তু রোগটি যে আছে সে বিষয়েই সচেতন নই। ডাক্তার দেখাবো কি করে? আমি আমার সেই বন্ধুর অভিজ্ঞতাটার কথা স্মরণ করেছিলাম সম্প্রতি। হিসেব করে দেখলাম, প্রায় কুড়ি বছর আগের ঘটনা। এখনো গা ঘিন ঘিন করে, আমাদের সমাজ এতই কুণ্ঠিত এক বসতি যে আমরা আমাদের গ্লানিকর ঘটনাগুলো পর্যন্ত বলতে সাহস পাই না। কিন্তু এ খাঁচা যে ভাঙতেই হবে। না ভাঙলে এ থেকে যে মুক্তি নেই তা আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। তাই যে ছবিটা আমি প্রথমেই বানাতে চাই, সেই ছবিটা আমি শুধু সেইসব শিশু-তরুণ-যুবকদের গল্প নিয়েই বানাতে চাই। যাতে আমাদের চারপাশের জীবনটাই তার মুখ দেখাবে।

আমি যে ছবিটি বানাতে চাই

at বুধবার, জানুয়ারি ২৩, ২০১৩  |  No comments

তাইওয়ানের ডিরেক্টর অং-কার ওয়াই এর একটা ছবি দেখতে বসেছিলাম। ছবিটার নাম হ্যাপি টুগেদার। ১৯৯৭ সালে মুক্তি পাওয়া এ ছবি বিশ্বের বেশ কয়েকটি বড় বড় চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার পেয়েছে। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সমালোচকদের কাছ থেকে পেয়ে অনেক প্রশংসাসূচক বাক্য। ছবিটার গল্পের মুল বিষয় হলও প্রেম। কিন্তু এই প্রেম রোমিও-জুলিয়েট, শিরি-ফরহাদ বা রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের মতো তো নয়ই বরং বলা যায়, স্বাভাবিক জীবনের একটি ছেলের সাথে একটি মেয়ের প্রেমের গল্প নয়। গল্পটি একটি ছেলের সাথে একটি ছেলের প্রেমের। আর এই প্রেমের পাশাপাশি এখানে যৌন জীবনও এসে হাজির। একটি ছেলের সাথে একটি ছেলের যখন যৌন জীবনের সম্পর্ক তৈরি হয়, তখন সেটাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বা সমাজ জীবনের চোখে স্বাভাবিক যৌন জীবন হিসেবে উল্লেখ করা হয় না। তখন এই অবস্থাটাকে চিহ্নায়ন করার জন্য পৃথক শব্দ ব্যবহার করা হয়, আর তা হলও ‘সমকাম’। এই সমকাম শুধু ছেলেদের মাঝেই নয়, মেয়েদের মাঝেও রয়েছে। আর এই বিষয়ক একটি জীবনের গল্প নিয়ে আমি প্রথম যে ছবিটি দেখি তা দীপা মেহতার ‘ফায়ার’। এ ছবিতে দুই জন বিবাহিত নারী এই রকম একটি যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। আর সেই চরিত্র দুটো রূপায়ন করেছিলো শাবানা আজমি ও নন্দিতা দাশ। পর্দায় সম-লিঙ্গের যৌন সম্পর্কের ছবি দেখার সেই আমার প্রথম অভিজ্ঞতা। পরবর্তীতে আমি অনেক ছবি দেখেছি যার মাঝে সম-লিঙ্গের সম্পর্কের গল্প রয়েছে। সেইসব ছবির মাঝে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো হলও ‘ব্রোকব্যাক মাউন্টেন’, ‘রোম ইন দ্যা রুম’, ‘দ্যা বোং কানেকশনসহ অনেক। এইসব ছবির পাশে একটা ছেলের সাথে আর একটা ছেলের যৌন সম্পর্কের গল্প আমি দেখেছি ভারতীয় ছবি ‘আই এম’ এ। তবে সেখানকার প্রেক্ষাপটটা আরও ভিন্ন। সেখানে একজন পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ তার স্ত্রীর প্রথম পক্ষের ছেলে শিশুটিকে যৌন নির্যাতন করতো। এই নির্যাতনটা মূলত ঐ শিশুটির জীবনের ভবিষ্যৎ ভাবনায় এক বড় প্রভাব ফেলে পরবর্তীতে। সে মেয়েদেরও এড়িয়ে চলতে চায়। চায় কুৎসিত যৌন জীবনকে অতিক্রম করে একটা নিজের মতো জীবন গড়তে। যদিও সেটা স্বাভাবিক জীবন নয়, কিন্তু সেও এক সময় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। ফিরে আসলেও তার শৈশবের সেইসব নির্যাতনের স্মৃতি তাকে সব সময়ই তাড়িয়ে বেড়ায়। এই সেক্স এবিউজের যে অভিজ্ঞতা এই বিষয়টি নিয়ে আমার দেখা ছবির ভেতর ছবির ভাগ নেই বললেই চলে। স-বেধন নীলমণি ঐ ‘আই এম’। কিন্তু এই বিষয়টি নিয়ে আমার ভাবনা রয়েছে। আমি মনে করি আমাদের সমাজে শিশু ও শৈশবের এমন যৌন নির্যাতনের ফলে নির্যাতিতার মস্তিষ্কে এক ধরণের চাপ তৈরি হয়। আর এই চাপের ফলে সেই শিশুটি যখন প্রাপ্ত বয়স্ক হয় তখনো তার ভেতর এই স্বাভাবিক জীবনের অংশ হিসেবে যৌন জীবন নিয়ে এক ধরণের কমপ্লেক্স কাজ করে। যার ফলে সে মানসিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীনও হতে পারে। আবার উল্টো ফলও দেখা দিতে পারে ঐ প্রাপ্ত বয়স্ক যুবকটির মনে। সে হয়ে উঠতে পারে বিকৃত যৌন মানসিকতার ধারক। আর এর প্রভাব পড়বে সমাজে। সাম্প্রতিক কালে একের পর এক বিশ্রী যৌন অত্যাচারের খবরগুলোও এমনই কোনও বিকৃত যৌন চেতনার ধারকের ফলে হয়ে থাকতে পারে। এর পেছনের কারণ হিসেবে আমি ধারণা করতে পারি শৈশবের যৌন নির্যাতনের শিকারকে। আর এই একটা ছেলের (পূর্ণ বয়স্ক যুবকের) কাছে একটা শিশুর যৌন নির্যাতনের ঘটনা যে আমাদের সমাজেও ঘটছে বা ঘটে আসছে এই বিষয়ে এখন পর্যন্ত সমাজকর্মী বা শিল্পের কোনও শাখাতেই তার প্রকাশ দেখি নি। আমাদের চলচ্চিত্রে তো নয়ই। অথচ তা আসাটাও কিন্তু জরুরী। একটা উদাহরণ দিলেই বিষয়টি সম্পর্কে ধারণা করা যেতে পারে এই নির্যাতনটি কি পরিমাণ ভয়ঙ্কর ও জঘন্য।
বছর দেড়েক আগে আমি তখন দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকায় কাজ করি। মরে যাওয়া পত্রিকাটি তখন নতুন যৌবনের উদ্যম নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছিলো। তখন একদিন হঠাৎ নিউজ ডেস্কে আমার হাতে একটি খবর সম্পাদনের জন্য আসে। খবরটি পরে আমি অনেকটা অবাক হই। খবরটি একটি খুনের ঘটনার। উত্তরায় এক কিশোর কর্তৃক এক মোবাইল ফোন রি-চার্জ ব্যবসায়ী খুন হন। পুলিশ ঐ কিশোর ছেলেটিকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে ছেলেটি তার দোষ স্বীকার করে। খুন হওয়া ব্যক্তিটি একজন মোল্লা টাইপের মানুষ ছিলও। নামাজ পড়তো। মুখ ভর্তি দাড়ি ছিলও। এই লোকটিকে একটা কিশোর ছেলে কেনও খুন করতে পারে বলে মনে হয়? ছেলেটি তার দোকানে কর্মচারীর কাজ করতো। তবে কি ছেলেটিকে লোকটি নির্যাতন করতো? পরিশ্রম বেশী করাতো আর পারিশ্রমিক কম দিতো? এইসব ক্ষেত্রে আমাদের দেশে মানুষ এখনো ততটা হিংস্র হয়ে প্রতিবাদ করে থাকে না। এই খুনের ঘটনার পেছনে যেই নির্যাতনের ঘটনাটি পাওয়া যায় তখন তা হলও ঐ মোল্লা টাইপের লোকটি ঐ ছেলেটিকে যৌন নির্যাতন করতো। এবং ঘটনা এক সময় যখন তার সহ্যের সীমা অতিক্রম করে, তখন ছেলেটি তাকে রাগ বা ঝোঁকের মাথায় খুন করে ফেলে। আমি যখন খবরটি সম্পাদনা করে বার্তা প্রধানের ডেস্কে দিয়ে দেই তিনি তখন এই সংবাদটিকে এক কলামের একটি স্থান বরাদ্দ করতে বলে। আমি তখন প্রতিবাদ করে বলি, এই ধরনের যৌন নির্যাতন দেশে হর হামেশাই হচ্ছে কিন্তু নানান কারণে খবরে আসছে না। কি পরিমাণ জঘন্য অত্যাচারের মুখোমুখি হলে একটা ছেলে একটা মানুষকে খুন করতে পারে এই ঘটনা তার প্রমাণ দেয়। তাই এটা বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। আমার কথায় সেদিন ঐ খবরটি শেষের পাতায় বক্স আইটেম করে প্রকাশিত হয়েছিলো। এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি আমিও হয়েছি। তখন আমি দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ি, আমাদের পাড়ায় আমার সম বয়সী এক বন্ধু তার প্রতিবেশী এক সাহেব কাছে ডাকলে না যাওয়ায় আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। কেন তার কাছে সে যেতে চায় না। সে বলতে চাইতো না। আমি জোর করায় সে হাতের আঙুল দিয়ে এমন কিছু বিশ্রী ইঙ্গিত করেছিলো যে, তাতে আমার বুঝতে বাকি ছিলও না ঐ লোকটির কোনও এক সময়কার লালসার শিকার হয়েছিলো আমার বন্ধুটি। সাম্প্রতিক সময়েও আমি আমার চারপাশের বেশ কিছু বন্ধুদের সাথে কথা বলে জেনেছি, তাদের মাঝেও কেউ কেউ শৈশবে এমন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায় এই নির্যাতনের পদ্ধতিটি একটি ধারাবাহিক ব্যাধির মতো আমরা আমাদের সমাজে বহন করে চলেছি। কিন্তু রোগটি যে আছে সে বিষয়েই সচেতন নই। ডাক্তার দেখাবো কি করে? আমি আমার সেই বন্ধুর অভিজ্ঞতাটার কথা স্মরণ করেছিলাম সম্প্রতি। হিসেব করে দেখলাম, প্রায় কুড়ি বছর আগের ঘটনা। এখনো গা ঘিন ঘিন করে, আমাদের সমাজ এতই কুণ্ঠিত এক বসতি যে আমরা আমাদের গ্লানিকর ঘটনাগুলো পর্যন্ত বলতে সাহস পাই না। কিন্তু এ খাঁচা যে ভাঙতেই হবে। না ভাঙলে এ থেকে যে মুক্তি নেই তা আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। তাই যে ছবিটা আমি প্রথমেই বানাতে চাই, সেই ছবিটা আমি শুধু সেইসব শিশু-তরুণ-যুবকদের গল্প নিয়েই বানাতে চাই। যাতে আমাদের চারপাশের জীবনটাই তার মুখ দেখাবে।

Read More

রবিবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০১৩

পাখি আমার বরাবরই ভালো লাগে। ছেলেবেলায় বাড়িতে পাখি পোষা হতো। পাখি আমার কাছে আত্মিয়-বন্ধুর মতো। যখন খুব ছোট ছিলাম বাসায় বসেই পড়াশোনা করতে হতো, স্কুলে যাওয়ার বয়স হয় নি তখন আমার বন্ধু ছিলো একটি টিয়া পাখি ও একটি ময়না পাখি। তবে তারা পৃথক সময়ে আমার বন্ধু হয়েছিলো। বনের পাখি পোষ মানে, মানুষের মন মানে না। এই বাক্য শিখেছিলাম তখনই, যখন আমাদের পোষ মানা পাখিগুলো মানুষ ধরে নিয়ে যেতো। সেই থেকে আমি একার বন্ধুকে হারিয়ে পাখি বন্ধুর নাম ভুলে যেতে চেয়ে ছিলাম। এইভাবেই দিন কাটে, বয়স বাড়ে, স্কুলে পড়ি। স্কুলের/ পাড়ার বন্ধুদের সময় ও সঙ্গ অতিক্রম করে চেষ্টা করি নিজেকে অতিক্রম করতে। কিন্তু পারি না। কোথায় যেনো একটা শূন্যতা। সেই শূন্যতার বাস এখনো রয়ে গেছে। কিন্তু আমার পাখি প্রেম কমে নি। বলতে পারি, ইনাম আল হকের মতো পাখি প্রেমিক আমি নই। আমার প্রেমটা গোপনে আরও গোপনে। আমি ভালোবাসি একজোড়া পাখি। একটা নই। আর এজন্য ভালোবাসি মানুষ। সেই পাখির মতো, পাখির গল্পের মতো। কিন্তু সেই জোড়া পাখির দেখা তো নেই চারপাশে।
হ্যা, সেই একজোড়া পাখির স্বপ্ন আমি দেখি। স্বপ্ন দেখি একজোড়া মুনিয়ার জনক আমি। যে মুনিয়াগুলো খাঁচায় নয় খোলা বাতাসেই বসবাস করে। উড়ে বেড়ায়। একদিন একজনকে বলেছিলাম, আমার একজোড়া মুনিয়ার জননী হবি? সে পাখিগুলোর জননী হতে রাজি ছিলো, কিন্তু পাখিগুলো তখন তার হয়ে যাবে, আমার কিছুই থাকবে না বলে শর্ত দিয়েছিলো। আমি সেই শর্তে তাঁকে পাখিগুলোর জননীর অধিকার দিতে পারি নি। তাই এখনো পাখিগুলো আমার হতে পারলো না, আমাদের হতে পারলো না। এই আক্ষেপ প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যা আমার বারান্দাজুড়ে এসে হানা দেয়। বারান্দার যন্ত্রণায় আমি কাতর হই।
সেই পাখি... হ্যা, পাখিদের নিয়ে এবার খেলা। নাম এ্যাংরি বার্ডস। খেলাটির পেছনে পাখিগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পেছনের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানলাম, অস্তিত্বের সংকটটা সেখানে বড় তীব্র। নিজেদের বাঁচিয়ে শত্রুদের ধ্বংস করার লক্ষ্যে তারা প্রতিবার ঝাপিয়ে পড়ে। ভাবে, আমি ধ্বংস হয়ে যাই তাতে আপত্তি নেই। আমার মাধ্যমে যদি শত্রুও ধ্বংস হয় তবে হয়তো আমার ভাই-বন্ধুরা বেঁচে যাবে। এই নিজেকে বিসর্জনের সাহস আর মানসিকতার কারণে তোমার নাম “এ্যাংরি বার্ডস”।

‘এ্যাংরি বার্ডস’ কেমন আছো?
আজ তোমাকে যে কবিতাটা পাঠিয়েছি, এই কবিতাটা তোমাকে নিয়ে ভাবতে বসে লিখা। সত্যি বলছি, তোমাকে যখন মাঝে মাঝে টেক্সট পাঠাই। উত্তর পেলে মনে হয় এ আমার বহু পরিচিত এক বন্ধু। মনে হয় তার হাত ধরে বহুদিন আমি অচেনা রাস্তায় হেঁটে গেছি গন্তব্য না জেনেই। আর তাই মাঝে মাঝে তোমাকে বলতে ইচ্ছে করে গোপন সব পাপ ও ব্যার্থতার হিসেব। অথচ তোমার ব্যস্ততার পরিসীমা নেই। এ নিয়ে অভিযোগ নেই। যতটুকু অনুভূতি প্রকাশে তুমি প্রশ্রয় দিয়েছো এতটুকুও যে এখন বন্ধুরা দেয় না। তারা তো ‘দূরের মানুষ’ হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন। নাকি আমিই সেই পাখি প্রেমিকটি আর নেই? ঠিক বলতে পারবো না। তবে একটি কথা আমি ঠিকই বলতে পারবো, তোমার প্রশ্রয় দক্ষিণের বারান্দা আর জোড়া মুনিয়ার জন্য হাকার করবে না।

‘এ্যাংরি বার্ড'কে চিঠি

at রবিবার, জানুয়ারি ১৩, ২০১৩  |  No comments

পাখি আমার বরাবরই ভালো লাগে। ছেলেবেলায় বাড়িতে পাখি পোষা হতো। পাখি আমার কাছে আত্মিয়-বন্ধুর মতো। যখন খুব ছোট ছিলাম বাসায় বসেই পড়াশোনা করতে হতো, স্কুলে যাওয়ার বয়স হয় নি তখন আমার বন্ধু ছিলো একটি টিয়া পাখি ও একটি ময়না পাখি। তবে তারা পৃথক সময়ে আমার বন্ধু হয়েছিলো। বনের পাখি পোষ মানে, মানুষের মন মানে না। এই বাক্য শিখেছিলাম তখনই, যখন আমাদের পোষ মানা পাখিগুলো মানুষ ধরে নিয়ে যেতো। সেই থেকে আমি একার বন্ধুকে হারিয়ে পাখি বন্ধুর নাম ভুলে যেতে চেয়ে ছিলাম। এইভাবেই দিন কাটে, বয়স বাড়ে, স্কুলে পড়ি। স্কুলের/ পাড়ার বন্ধুদের সময় ও সঙ্গ অতিক্রম করে চেষ্টা করি নিজেকে অতিক্রম করতে। কিন্তু পারি না। কোথায় যেনো একটা শূন্যতা। সেই শূন্যতার বাস এখনো রয়ে গেছে। কিন্তু আমার পাখি প্রেম কমে নি। বলতে পারি, ইনাম আল হকের মতো পাখি প্রেমিক আমি নই। আমার প্রেমটা গোপনে আরও গোপনে। আমি ভালোবাসি একজোড়া পাখি। একটা নই। আর এজন্য ভালোবাসি মানুষ। সেই পাখির মতো, পাখির গল্পের মতো। কিন্তু সেই জোড়া পাখির দেখা তো নেই চারপাশে।
হ্যা, সেই একজোড়া পাখির স্বপ্ন আমি দেখি। স্বপ্ন দেখি একজোড়া মুনিয়ার জনক আমি। যে মুনিয়াগুলো খাঁচায় নয় খোলা বাতাসেই বসবাস করে। উড়ে বেড়ায়। একদিন একজনকে বলেছিলাম, আমার একজোড়া মুনিয়ার জননী হবি? সে পাখিগুলোর জননী হতে রাজি ছিলো, কিন্তু পাখিগুলো তখন তার হয়ে যাবে, আমার কিছুই থাকবে না বলে শর্ত দিয়েছিলো। আমি সেই শর্তে তাঁকে পাখিগুলোর জননীর অধিকার দিতে পারি নি। তাই এখনো পাখিগুলো আমার হতে পারলো না, আমাদের হতে পারলো না। এই আক্ষেপ প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যা আমার বারান্দাজুড়ে এসে হানা দেয়। বারান্দার যন্ত্রণায় আমি কাতর হই।
সেই পাখি... হ্যা, পাখিদের নিয়ে এবার খেলা। নাম এ্যাংরি বার্ডস। খেলাটির পেছনে পাখিগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পেছনের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানলাম, অস্তিত্বের সংকটটা সেখানে বড় তীব্র। নিজেদের বাঁচিয়ে শত্রুদের ধ্বংস করার লক্ষ্যে তারা প্রতিবার ঝাপিয়ে পড়ে। ভাবে, আমি ধ্বংস হয়ে যাই তাতে আপত্তি নেই। আমার মাধ্যমে যদি শত্রুও ধ্বংস হয় তবে হয়তো আমার ভাই-বন্ধুরা বেঁচে যাবে। এই নিজেকে বিসর্জনের সাহস আর মানসিকতার কারণে তোমার নাম “এ্যাংরি বার্ডস”।

‘এ্যাংরি বার্ডস’ কেমন আছো?
আজ তোমাকে যে কবিতাটা পাঠিয়েছি, এই কবিতাটা তোমাকে নিয়ে ভাবতে বসে লিখা। সত্যি বলছি, তোমাকে যখন মাঝে মাঝে টেক্সট পাঠাই। উত্তর পেলে মনে হয় এ আমার বহু পরিচিত এক বন্ধু। মনে হয় তার হাত ধরে বহুদিন আমি অচেনা রাস্তায় হেঁটে গেছি গন্তব্য না জেনেই। আর তাই মাঝে মাঝে তোমাকে বলতে ইচ্ছে করে গোপন সব পাপ ও ব্যার্থতার হিসেব। অথচ তোমার ব্যস্ততার পরিসীমা নেই। এ নিয়ে অভিযোগ নেই। যতটুকু অনুভূতি প্রকাশে তুমি প্রশ্রয় দিয়েছো এতটুকুও যে এখন বন্ধুরা দেয় না। তারা তো ‘দূরের মানুষ’ হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন। নাকি আমিই সেই পাখি প্রেমিকটি আর নেই? ঠিক বলতে পারবো না। তবে একটি কথা আমি ঠিকই বলতে পারবো, তোমার প্রশ্রয় দক্ষিণের বারান্দা আর জোড়া মুনিয়ার জন্য হাকার করবে না।

Read More

শনিবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০১২

নাট্য পরিচালক হিসেবে পরিচালিত রেদওয়ান রনির প্রথম চলচ্চিত্র ‘চোরাবালি’। এই নির্মাতার নাটকগুলো যেমন বিনোদনের খোরাক জুগিয়েছে, তেমন নাটকের ট্রাডিশনাল গল্পের বাইরে কিছু ব্যতিক্রম গল্পও উপহার দিয়েছে। নাট্যনির্মাতা হিসেবে রনির পথচলাটা বেশ কয়েকবছরের। বলতে গেলে তা প্রায় ছয় সাত বছরেরও বেশী। এই দীর্ঘ সময়ের মাঝে এই নির্মাতা সিনেমা বানানোর স্বপ্নই লালন করেছেন কেবল। তার প্রথম ছবির সংলাপ ‘চোরাবালিতে পড়লে কেউ উঠতে পারে না’র মতোই এই সে ছবি বানানোর স্বপ্নে ছিলেন। সেই ছবি ‘চোরাবালি’। ভিডিও পাইরেসি বা টেলিভিশন প্রিমিয়ারের ধার না ধরে সিনেমাহলেই তিনি মুক্তি দিলেন। আমিও প্রিমিয়ারে যাওয়ার সুযোগ মিস করের গাটের টাকা খরচ করেই সেই ছবি দেখে এসেছি। ছবি দেখার পর এক কথায় যদি আমাকে কেউ প্রশ্ন করেন কেমন ছবি? আমি বলবো আপনার ছবিটা সিনেমা হলে দেখা উচিত। ভালো মন্দের প্রশ্ন পরে। সে আলোচনার প্রসঙ্গ আরও পরে। তার কারণ বাংলাদেশের সিনেমা শিল্পের মুমূর্ষু পরিস্থিতিতে বেঁচে উঠার সম্ভাবনা নিয়ে এই ছবি একটা মাইলফলক না হলেও বেশ বড় অবদান নিয়ে দাঁড়াবে বলেই ছবিটা আপনার দেখা উচিত। ছবিটা কেন দেখবেন? এই প্রশ্নের উত্তরগুলো আমি আগে দেই। প্রথমত ছবিটা সবার জন্য নির্মিত। দ্বিতীয়ত ছবিটা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের নবতর সূচনার সম্ভাবনাময় একটি ছবি। ছবিটিতে মিউজিক করেছেন আইয়ুব বাচ্চু ও অনপমের মতো শিল্পী। তাদের গান শোনার জন্য ছবি। কলকাতার অভিনেতা ইন্দ্রনীল অভিনয় করেছেন তার জন্য। সবার আগে যে কারণে এই ছবিটা দেখবেন, তা হলো যেই দেশে কলকাতার জঘন্য ছবিগুলো এসে বাজার দখল করতে চেষ্টা করছে, বলিউডের নজরকাড়া নায়ক-নায়িকার ছবি এসে সিনেমাহল দখল করতে চাইছে, সেই সময় বাংলাদেশের তরুণ পরিচালকের একটি ছবি। এসব কারণেই তো ছবিটা দেখাই উচিত আপনার। তাই ছবিটা দেখতেই বলবো আপনাকে। আপনি যদি এই ছবি দেখেন আগামী পাঁচ বছরে এর চেয়ে ভালো ছবি আপনি আপনার সিনেমাহলেই দেখতে পাবেন। আর তার জন্যও এই ছবি আপনাকে সিনেমাহলে গিয়েই দেখতে হবে।
এবার আসি ছবির ভেতরে। ছবির জার্নিটা ছিলো তিন বছরের। মানে ২০১০ এর শেষ দিকে রেদওয়ান রনির ঘোষণা আসে সে ছবি বানাবে। ২০১১ অতিক্রম করে ২০১২’র শেষ মাসের তৃতীয় সপ্তাহে এসে এই ছবি মুক্তি পেয়েছে। এই দীর্ঘ যাত্রায় রনি নিজে যে ছবির গল্প দাঁড় করিয়েছে তার বেশ কিছু জায়গায় আমার ঘোর আপত্তি আছে। প্রথমত এমন আন্ডারগ্রাউন্ড স্টোরি নিয়ে বাংলাদেশের নিয়মিত নির্মাতারা একাধিক ছবি বানিয়েছে। কিন্তু সেসব সিনেমা সিনেমার ধারে কাছেও না যাওয়ায়, রেদওয়ান রনির কাছে এই জায়গায় প্রত্যাশা আরও বেশী ছিলো। সে প্রত্যাশা পুরোপুরি পুরণ করতে পারেন নি তিনি। তবে তিনি যে পদ্ধতিতে শুরু করেছেন, তার জন্য তাঁকে সাধুবাদ। ছবির গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র সুমন (ইন্দ্রনীল) একজন প্রফেশনাল খুনি। যে কিনা তার গডফাদার (শহীদুজ্জামান সেলিম) এর পোশা মানুষ। খুন করা তার কাছে ডালভাত। কারণ, বারো/তেরো বছরেই সে একাধিক খুন করেছে। প্রথম খুনটা সে করে তার মা’র ধর্ষণকারী স্থানীয় চেয়ারম্যানকে। দ্বিতীয় খুন করে বস্তির এক ড্রাগ ব্যবসায়ী তাঁর মাকে বেশ্যা বলায়। দ্বিতীয় খুনের পরই সে চলে আসে তাঁর গডফাদারের হাওলায়। তার ছত্রছায়ায় তার আর খুনের কোনও হিসাব থাকেনা তখন। এমন একজন খুনী কিনা পেছন থেকে একজন প্রেগনেন্ট মহিলাকে খুন করেই তার ১৩/১৪ বছরের খুনী জীবন থেকে বেড়িয়ে আসতে পারবে? অবিশ্বাস্য হলেও এমন ঘটনাই ঘটেছে এই ছবিতে। এই ইন্দ্রনীল এই খুনের পর থেকে ছবির গল্পে পরিবর্তন আসতে থাকে। গল্পে সে ভিলেন থেকে নায়ক হতে থাকে। যদিও ছবিতে কেন্দ্রীয় নায়ক চরিত্র বলে আসলে তেমন কাউকে পাওয়া যায় না। ইন্দ্রনীলের করা সুমন চরিত্র সিনেমার প্রথমভাগেও কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে দাঁড়াতে পারে না। যতটা দাঁড়ায় সেলিমের করা চরিত্র। ছবির অধিকাংশ সময়ই মনে হয় সুমন চরিত্রটি কেবল একটি ক্রীড়নক মাত্র। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে এসে সুমনের নায়ক হওয়ার প্রচেষ্টা দেখা যায়। দেখা যায় সে আর খুনী থাকতে চায় না। ভালো মানুষ হতে চায়। ছবির নায়িকা নাবিলার (জয়া) চরত্রিটিও তেমন চ্যালেঞ্জিং হওয়ার কথা ছিলো, ততটা চ্যালেঞ্জিং হয় নি। টেলিভিশনের নিয়মিত নিয়ম ভাঙা জয়া এখানে অনুপস্থিত। কিন্তু ছোট চরিত্র হলেও এই ছবিতে নিজের মতো শক্তি আর চমৎকারিত্ব নিয়ে হাজির হয়েছেন এটিএম সামসুজ্জামান। তাঁর ক্ষমতা তিনি পরিমিতই দেখিয়েছেন। পরিমিত অভিনয় ক্ষমতা দেখিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন সব কিছু পরিমিত হওয়াই বাঞ্ছনিয়, অতিরঞ্জিত নয়। ঠিক এই কাজটিই করেছেন অভিনেতা শহীদুজ্জামান সেলিম। শক্তিমান অভিনেতা হিসেবে তার প্রতিষ্ঠা পরিচিতি থাকলেও সিনেমায় অভিনয়ের যে ভিন্ন একটা আবেদন আছে, তা তার অভিনয়ে পাওয়া যায় নি। বরং তার অভিনয়ে যা পাওয়া গেছে তা হলো তার অতিঅভিনয়ের বাড়াবাড়ি। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রই বলতে গেলে তা। আর তা এই অভিনেতার বাড়াবাড়ির কারণে এক প্রকার নষ্টই হয়েছে। খুব সীমিত পরিসরে চমৎকার অভিনয় করেছে হুমায়ূন সাধু। তাঁকে সাধুবাদ। ছবির প্রথম অর্ধ যখন শেষই হচ্ছে না তখন আমার মনে হচ্ছিলো ছবির গল্প অনেক বড়। আর এই গল্প দ্বিতীয়ার্ধে এসে কিনা কেমন জানি খাপছাড়া খাপছাড়া মনে হচ্ছিলো। ইন্দ্রনিলের করা চরিত্রটির ট্রান্সপোর্টেশন খুব দুর্বল। প্রকৃত অর্থে কেবল ইন্দ্রনিলকে নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যেই এই ট্রান্সপোর্টেশন। কিন্তু এই ট্রান্সপোর্টেশনটা আরও মজবুত হলে ছবি দেখে আরও উপভোগ করা যেতো। দুইঘন্টার ছবি দেখে ছবিতে সবচেয়ে বেশী যে জিনিসগুলো আমার কাছে আকর্ষনীয় মনে হয়েছে তার মাঝে হলো ইন্দ্রনীলের ফ্লাশব্যাক। এই সময়টার কালারটোন ছিলো ভিন্ন। অতীতের গল্প বলার জন্য সেপিয়া টোন ব্যবহার করেছে পরিচালক। তারচেয়ে বড় কথা এই সময়টার নির্মাণ কৌশলেই পাওয়া গেছে চলচ্চিত্রকার রেদওয়ান রনিকে। বাকি সময়টায় রনি ছিলো ট্রাডিশনাল টিভি নাট্য পরিচালকের মতোই।
এছাড়া এই ছবির সবচে বড় দুর্বলতা ছিলো সংলাপে। সংলাপ আরও কি চমৎকারই না হতে পারতো। এই আক্ষেপের সাথে আরও একটা আক্ষেপ বড় ভুগিয়েছে তা হলো ছবির কন্টিনিটি। ইন্দ্রনীলকে যে পিস্তলটা শহীদুজ্জামান সেলিম সেই কবে উপহার দিয়েছিলো এই পিস্তলটাই তার সাথে থাকার কথা। কিন্তু এই পিস্তলটার স্থলে ভিন্ন সময় ভিন্ন পিস্তল কি চোখে পড়েছে? আমি আমার পাশের দর্শককে জিজ্ঞেস করায় সেও সায় দিলো এই স্থানে। এমন ছোটখাটো বেশকিছু ভুল আছে সেগুলোকে অতিক্রম করার জন্য ছিলো চমৎকার ব্যকগ্রাউন্ড মিউজিক স্কোর। অরিজিনাল স্কোরের চেয়ে গল্পের সাথে ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর মানিয়েছে চমৎকার। আর একটা আইটেম গান? প্রাণহীন একটা মেয়ে আর একদল ছেলের শরীর দেখালেই কি আইটেম গান হয়? তাও আর গল্পের সাথে কোনও সামঞ্জস্য না রেখে হুট করে দিলেই হলো? তাহলে এই আইটেম গানটা ছবিতে ব্যবহার না করে কেবল মার্কেটিং এ ব্যবহার করলেও ছবির দর্শক আগ্রহী হতো বলে আমার মনে হয়।
ছবির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবচে বিরক্তিকর বিষয় হৈলো ইন্দ্রনীলের লিপে শতাব্দী ওয়াদুদের কন্ঠ আর মডেল কন্যার কণ্ঠে দীপা খন্দকারের কণ্ঠ। একদমই মানায়নাই বলে মনে হৈছে আমার।
এতকিছুর পরও আমি এই পরিচালককে নিয়ে আসাবাদী। আমি চাইবো রেদওয়ান রনি নিয়মিত ছবিই বানাক। আর নাটক না বানিয়ে এর চেয়ে ভালো ছবিই বানাক। তখন একই ছবি বারবার দেখার জন্য আমিই সিনেমাহলে যাবো। আমার মনে হয় এর চেয়ে আর একটু ভালো হলে আমার মতো দর্শক আরও তৈরি হবে। একই ছবি বারবার দেখার জন্য সিনেমাহলে যাবে। আর তা না হলে চলচ্চিত্র শিল্প যে অপারেশন টেবিলে এখন আছে, সেখান থেকে সে আর সুস্থ্য হয়ে ফিরে আসতে পারবে না। আর ভালো ছবি হলে চলচ্চিত্র উঠে দাঁড়াবে, হাসবে খেলবে। যা খুব প্রয়োজন আমাদের জন্য।

‘চোরাবালি’ দর্শনের ভুল-ভাল

at শনিবার, ডিসেম্বর ২২, ২০১২  |  1 comment

নাট্য পরিচালক হিসেবে পরিচালিত রেদওয়ান রনির প্রথম চলচ্চিত্র ‘চোরাবালি’। এই নির্মাতার নাটকগুলো যেমন বিনোদনের খোরাক জুগিয়েছে, তেমন নাটকের ট্রাডিশনাল গল্পের বাইরে কিছু ব্যতিক্রম গল্পও উপহার দিয়েছে। নাট্যনির্মাতা হিসেবে রনির পথচলাটা বেশ কয়েকবছরের। বলতে গেলে তা প্রায় ছয় সাত বছরেরও বেশী। এই দীর্ঘ সময়ের মাঝে এই নির্মাতা সিনেমা বানানোর স্বপ্নই লালন করেছেন কেবল। তার প্রথম ছবির সংলাপ ‘চোরাবালিতে পড়লে কেউ উঠতে পারে না’র মতোই এই সে ছবি বানানোর স্বপ্নে ছিলেন। সেই ছবি ‘চোরাবালি’। ভিডিও পাইরেসি বা টেলিভিশন প্রিমিয়ারের ধার না ধরে সিনেমাহলেই তিনি মুক্তি দিলেন। আমিও প্রিমিয়ারে যাওয়ার সুযোগ মিস করের গাটের টাকা খরচ করেই সেই ছবি দেখে এসেছি। ছবি দেখার পর এক কথায় যদি আমাকে কেউ প্রশ্ন করেন কেমন ছবি? আমি বলবো আপনার ছবিটা সিনেমা হলে দেখা উচিত। ভালো মন্দের প্রশ্ন পরে। সে আলোচনার প্রসঙ্গ আরও পরে। তার কারণ বাংলাদেশের সিনেমা শিল্পের মুমূর্ষু পরিস্থিতিতে বেঁচে উঠার সম্ভাবনা নিয়ে এই ছবি একটা মাইলফলক না হলেও বেশ বড় অবদান নিয়ে দাঁড়াবে বলেই ছবিটা আপনার দেখা উচিত। ছবিটা কেন দেখবেন? এই প্রশ্নের উত্তরগুলো আমি আগে দেই। প্রথমত ছবিটা সবার জন্য নির্মিত। দ্বিতীয়ত ছবিটা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের নবতর সূচনার সম্ভাবনাময় একটি ছবি। ছবিটিতে মিউজিক করেছেন আইয়ুব বাচ্চু ও অনপমের মতো শিল্পী। তাদের গান শোনার জন্য ছবি। কলকাতার অভিনেতা ইন্দ্রনীল অভিনয় করেছেন তার জন্য। সবার আগে যে কারণে এই ছবিটা দেখবেন, তা হলো যেই দেশে কলকাতার জঘন্য ছবিগুলো এসে বাজার দখল করতে চেষ্টা করছে, বলিউডের নজরকাড়া নায়ক-নায়িকার ছবি এসে সিনেমাহল দখল করতে চাইছে, সেই সময় বাংলাদেশের তরুণ পরিচালকের একটি ছবি। এসব কারণেই তো ছবিটা দেখাই উচিত আপনার। তাই ছবিটা দেখতেই বলবো আপনাকে। আপনি যদি এই ছবি দেখেন আগামী পাঁচ বছরে এর চেয়ে ভালো ছবি আপনি আপনার সিনেমাহলেই দেখতে পাবেন। আর তার জন্যও এই ছবি আপনাকে সিনেমাহলে গিয়েই দেখতে হবে।
এবার আসি ছবির ভেতরে। ছবির জার্নিটা ছিলো তিন বছরের। মানে ২০১০ এর শেষ দিকে রেদওয়ান রনির ঘোষণা আসে সে ছবি বানাবে। ২০১১ অতিক্রম করে ২০১২’র শেষ মাসের তৃতীয় সপ্তাহে এসে এই ছবি মুক্তি পেয়েছে। এই দীর্ঘ যাত্রায় রনি নিজে যে ছবির গল্প দাঁড় করিয়েছে তার বেশ কিছু জায়গায় আমার ঘোর আপত্তি আছে। প্রথমত এমন আন্ডারগ্রাউন্ড স্টোরি নিয়ে বাংলাদেশের নিয়মিত নির্মাতারা একাধিক ছবি বানিয়েছে। কিন্তু সেসব সিনেমা সিনেমার ধারে কাছেও না যাওয়ায়, রেদওয়ান রনির কাছে এই জায়গায় প্রত্যাশা আরও বেশী ছিলো। সে প্রত্যাশা পুরোপুরি পুরণ করতে পারেন নি তিনি। তবে তিনি যে পদ্ধতিতে শুরু করেছেন, তার জন্য তাঁকে সাধুবাদ। ছবির গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র সুমন (ইন্দ্রনীল) একজন প্রফেশনাল খুনি। যে কিনা তার গডফাদার (শহীদুজ্জামান সেলিম) এর পোশা মানুষ। খুন করা তার কাছে ডালভাত। কারণ, বারো/তেরো বছরেই সে একাধিক খুন করেছে। প্রথম খুনটা সে করে তার মা’র ধর্ষণকারী স্থানীয় চেয়ারম্যানকে। দ্বিতীয় খুন করে বস্তির এক ড্রাগ ব্যবসায়ী তাঁর মাকে বেশ্যা বলায়। দ্বিতীয় খুনের পরই সে চলে আসে তাঁর গডফাদারের হাওলায়। তার ছত্রছায়ায় তার আর খুনের কোনও হিসাব থাকেনা তখন। এমন একজন খুনী কিনা পেছন থেকে একজন প্রেগনেন্ট মহিলাকে খুন করেই তার ১৩/১৪ বছরের খুনী জীবন থেকে বেড়িয়ে আসতে পারবে? অবিশ্বাস্য হলেও এমন ঘটনাই ঘটেছে এই ছবিতে। এই ইন্দ্রনীল এই খুনের পর থেকে ছবির গল্পে পরিবর্তন আসতে থাকে। গল্পে সে ভিলেন থেকে নায়ক হতে থাকে। যদিও ছবিতে কেন্দ্রীয় নায়ক চরিত্র বলে আসলে তেমন কাউকে পাওয়া যায় না। ইন্দ্রনীলের করা সুমন চরিত্র সিনেমার প্রথমভাগেও কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে দাঁড়াতে পারে না। যতটা দাঁড়ায় সেলিমের করা চরিত্র। ছবির অধিকাংশ সময়ই মনে হয় সুমন চরিত্রটি কেবল একটি ক্রীড়নক মাত্র। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে এসে সুমনের নায়ক হওয়ার প্রচেষ্টা দেখা যায়। দেখা যায় সে আর খুনী থাকতে চায় না। ভালো মানুষ হতে চায়। ছবির নায়িকা নাবিলার (জয়া) চরত্রিটিও তেমন চ্যালেঞ্জিং হওয়ার কথা ছিলো, ততটা চ্যালেঞ্জিং হয় নি। টেলিভিশনের নিয়মিত নিয়ম ভাঙা জয়া এখানে অনুপস্থিত। কিন্তু ছোট চরিত্র হলেও এই ছবিতে নিজের মতো শক্তি আর চমৎকারিত্ব নিয়ে হাজির হয়েছেন এটিএম সামসুজ্জামান। তাঁর ক্ষমতা তিনি পরিমিতই দেখিয়েছেন। পরিমিত অভিনয় ক্ষমতা দেখিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন সব কিছু পরিমিত হওয়াই বাঞ্ছনিয়, অতিরঞ্জিত নয়। ঠিক এই কাজটিই করেছেন অভিনেতা শহীদুজ্জামান সেলিম। শক্তিমান অভিনেতা হিসেবে তার প্রতিষ্ঠা পরিচিতি থাকলেও সিনেমায় অভিনয়ের যে ভিন্ন একটা আবেদন আছে, তা তার অভিনয়ে পাওয়া যায় নি। বরং তার অভিনয়ে যা পাওয়া গেছে তা হলো তার অতিঅভিনয়ের বাড়াবাড়ি। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রই বলতে গেলে তা। আর তা এই অভিনেতার বাড়াবাড়ির কারণে এক প্রকার নষ্টই হয়েছে। খুব সীমিত পরিসরে চমৎকার অভিনয় করেছে হুমায়ূন সাধু। তাঁকে সাধুবাদ। ছবির প্রথম অর্ধ যখন শেষই হচ্ছে না তখন আমার মনে হচ্ছিলো ছবির গল্প অনেক বড়। আর এই গল্প দ্বিতীয়ার্ধে এসে কিনা কেমন জানি খাপছাড়া খাপছাড়া মনে হচ্ছিলো। ইন্দ্রনিলের করা চরিত্রটির ট্রান্সপোর্টেশন খুব দুর্বল। প্রকৃত অর্থে কেবল ইন্দ্রনিলকে নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যেই এই ট্রান্সপোর্টেশন। কিন্তু এই ট্রান্সপোর্টেশনটা আরও মজবুত হলে ছবি দেখে আরও উপভোগ করা যেতো। দুইঘন্টার ছবি দেখে ছবিতে সবচেয়ে বেশী যে জিনিসগুলো আমার কাছে আকর্ষনীয় মনে হয়েছে তার মাঝে হলো ইন্দ্রনীলের ফ্লাশব্যাক। এই সময়টার কালারটোন ছিলো ভিন্ন। অতীতের গল্প বলার জন্য সেপিয়া টোন ব্যবহার করেছে পরিচালক। তারচেয়ে বড় কথা এই সময়টার নির্মাণ কৌশলেই পাওয়া গেছে চলচ্চিত্রকার রেদওয়ান রনিকে। বাকি সময়টায় রনি ছিলো ট্রাডিশনাল টিভি নাট্য পরিচালকের মতোই।
এছাড়া এই ছবির সবচে বড় দুর্বলতা ছিলো সংলাপে। সংলাপ আরও কি চমৎকারই না হতে পারতো। এই আক্ষেপের সাথে আরও একটা আক্ষেপ বড় ভুগিয়েছে তা হলো ছবির কন্টিনিটি। ইন্দ্রনীলকে যে পিস্তলটা শহীদুজ্জামান সেলিম সেই কবে উপহার দিয়েছিলো এই পিস্তলটাই তার সাথে থাকার কথা। কিন্তু এই পিস্তলটার স্থলে ভিন্ন সময় ভিন্ন পিস্তল কি চোখে পড়েছে? আমি আমার পাশের দর্শককে জিজ্ঞেস করায় সেও সায় দিলো এই স্থানে। এমন ছোটখাটো বেশকিছু ভুল আছে সেগুলোকে অতিক্রম করার জন্য ছিলো চমৎকার ব্যকগ্রাউন্ড মিউজিক স্কোর। অরিজিনাল স্কোরের চেয়ে গল্পের সাথে ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর মানিয়েছে চমৎকার। আর একটা আইটেম গান? প্রাণহীন একটা মেয়ে আর একদল ছেলের শরীর দেখালেই কি আইটেম গান হয়? তাও আর গল্পের সাথে কোনও সামঞ্জস্য না রেখে হুট করে দিলেই হলো? তাহলে এই আইটেম গানটা ছবিতে ব্যবহার না করে কেবল মার্কেটিং এ ব্যবহার করলেও ছবির দর্শক আগ্রহী হতো বলে আমার মনে হয়।
ছবির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবচে বিরক্তিকর বিষয় হৈলো ইন্দ্রনীলের লিপে শতাব্দী ওয়াদুদের কন্ঠ আর মডেল কন্যার কণ্ঠে দীপা খন্দকারের কণ্ঠ। একদমই মানায়নাই বলে মনে হৈছে আমার।
এতকিছুর পরও আমি এই পরিচালককে নিয়ে আসাবাদী। আমি চাইবো রেদওয়ান রনি নিয়মিত ছবিই বানাক। আর নাটক না বানিয়ে এর চেয়ে ভালো ছবিই বানাক। তখন একই ছবি বারবার দেখার জন্য আমিই সিনেমাহলে যাবো। আমার মনে হয় এর চেয়ে আর একটু ভালো হলে আমার মতো দর্শক আরও তৈরি হবে। একই ছবি বারবার দেখার জন্য সিনেমাহলে যাবে। আর তা না হলে চলচ্চিত্র শিল্প যে অপারেশন টেবিলে এখন আছে, সেখান থেকে সে আর সুস্থ্য হয়ে ফিরে আসতে পারবে না। আর ভালো ছবি হলে চলচ্চিত্র উঠে দাঁড়াবে, হাসবে খেলবে। যা খুব প্রয়োজন আমাদের জন্য।

Read More

বুধবার, ২৮ নভেম্বর, ২০১২

একটা সন্ধ্যার কথা আমরা ভুলে যেতে পারি, কিংবা ভুলে যেতে পারি একটা মৃত্যু সম্ভাবনার কথাও- কিন্তু একটি শাদা অর্ন্তবাস অথবা তার স্বত্তাধিকারীর কথা ভুলে যেতে গিয়ে দ্বিতীয়বার ভাবতে পারি; কিন্তু ভাবিনা, কারণ আমরা ভেবে দেখেছি উন্মোক্ত গ্যালারীতে রাখা চিত্রকর্মের সহজলভ্যতা একটি স্বতঃস্ফুর্ত শিল্প আকাঙ্খা জন্মদিলেও ধরা দেয়না স্বতন্ত্র একটি ভাবন- তারপরও আমরা খুঁজি চারপাশে সেই অর্ন্তবাসের স্বত্তাধিকারীকে অথবা তার মতো আরো আরো কিংবদন্তীকে, যারা প্রতিদিন স্বেচ্ছামৃত্যুর ইচ্ছা পোষন করতে গিয়ে রাত জাগে আর আলোকিত করে ছা-পোশা শয্যা- যা আমাদের হতে পারতো আরো দীর্ঘ মৃত্যু আকাঙ্খার জাগ্রত সময়ে; কিন্তু আমরা ভুলে যাই না, এই মৃত্যু একটি সময়ের ছোটগল্প মাত্র- যা কিনা প্রতিদিন সকাল হলেই পাঠক তার ওয়েস্টপ্যাপারের বাক্সে ছুরে দিতে পারে

প্রতিদিন সকালের ঝালমুরি ওয়ালা এক বস্তা ঝালমুড়ি দিয়ে গেলে আমরা লেবুপাতার বাগানে তা শোকাতে দিই জেনেও সেখানে কোনও ঝালমুড়ির দোকান হয় না, এ খবর শুনে আপনি আনন্দিত হতে পারেন জানি; কিন্তু আপনার স্ত্রীর কি শরীর ভালো?

ওয়েস্টপ্যাপার বক্স

at বুধবার, নভেম্বর ২৮, ২০১২  |  No comments

একটা সন্ধ্যার কথা আমরা ভুলে যেতে পারি, কিংবা ভুলে যেতে পারি একটা মৃত্যু সম্ভাবনার কথাও- কিন্তু একটি শাদা অর্ন্তবাস অথবা তার স্বত্তাধিকারীর কথা ভুলে যেতে গিয়ে দ্বিতীয়বার ভাবতে পারি; কিন্তু ভাবিনা, কারণ আমরা ভেবে দেখেছি উন্মোক্ত গ্যালারীতে রাখা চিত্রকর্মের সহজলভ্যতা একটি স্বতঃস্ফুর্ত শিল্প আকাঙ্খা জন্মদিলেও ধরা দেয়না স্বতন্ত্র একটি ভাবন- তারপরও আমরা খুঁজি চারপাশে সেই অর্ন্তবাসের স্বত্তাধিকারীকে অথবা তার মতো আরো আরো কিংবদন্তীকে, যারা প্রতিদিন স্বেচ্ছামৃত্যুর ইচ্ছা পোষন করতে গিয়ে রাত জাগে আর আলোকিত করে ছা-পোশা শয্যা- যা আমাদের হতে পারতো আরো দীর্ঘ মৃত্যু আকাঙ্খার জাগ্রত সময়ে; কিন্তু আমরা ভুলে যাই না, এই মৃত্যু একটি সময়ের ছোটগল্প মাত্র- যা কিনা প্রতিদিন সকাল হলেই পাঠক তার ওয়েস্টপ্যাপারের বাক্সে ছুরে দিতে পারে

প্রতিদিন সকালের ঝালমুরি ওয়ালা এক বস্তা ঝালমুড়ি দিয়ে গেলে আমরা লেবুপাতার বাগানে তা শোকাতে দিই জেনেও সেখানে কোনও ঝালমুড়ির দোকান হয় না, এ খবর শুনে আপনি আনন্দিত হতে পারেন জানি; কিন্তু আপনার স্ত্রীর কি শরীর ভালো?

Read More
যতটা পথ হেটেছে সে কিশোর বেলায়
তারচেয়ে আপন হয়েছে আজ
মরিচ বাগানের ঘ্রাণ,

বন্ধুর নামের আগে কেনো লিখে রাখে কৃষ্ণচূড়া ফুলের নাম
কেনো তার ভাত ঘুমে স্বপ্নেরা হানা দেয়
তাই বুছি জোছনার গান গাওয়া রাজহাঁস-
শুষুকের ভাগ্য ফেরায়

হাতে রেখে সু-সময়ের দিন, তোমাকে তাই বন্ধু হতে ডাকি-
      কেমন আছো জলের ঈশ্বর?
তাদের মুখরে কি সুখনিদ্রা আসে?
মাঝে মাঝে তাই ঋতুর বন্ধু হয়ে যাই
রোদ বৃষ্টি ফেরি করে বেরাই নগরের জানালায়
মানুষের ভাগ্য কি সেই রোদের বন্ধু হয়-
কি থাকে তাই অস্তিত্বের বিবর্ণ ইতিহাসে,
তার কথা লিখে রাখবে রোদের ডায়রী

খুব বেশী রোদ নেই বৃক্ষের

at বুধবার, নভেম্বর ২৮, ২০১২  |  No comments

যতটা পথ হেটেছে সে কিশোর বেলায়
তারচেয়ে আপন হয়েছে আজ
মরিচ বাগানের ঘ্রাণ,

বন্ধুর নামের আগে কেনো লিখে রাখে কৃষ্ণচূড়া ফুলের নাম
কেনো তার ভাত ঘুমে স্বপ্নেরা হানা দেয়
তাই বুছি জোছনার গান গাওয়া রাজহাঁস-
শুষুকের ভাগ্য ফেরায়

হাতে রেখে সু-সময়ের দিন, তোমাকে তাই বন্ধু হতে ডাকি-
      কেমন আছো জলের ঈশ্বর?
তাদের মুখরে কি সুখনিদ্রা আসে?
মাঝে মাঝে তাই ঋতুর বন্ধু হয়ে যাই
রোদ বৃষ্টি ফেরি করে বেরাই নগরের জানালায়
মানুষের ভাগ্য কি সেই রোদের বন্ধু হয়-
কি থাকে তাই অস্তিত্বের বিবর্ণ ইতিহাসে,
তার কথা লিখে রাখবে রোদের ডায়রী

Read More

মঙ্গলবার, ২৭ নভেম্বর, ২০১২

২৭ নভেম্বর আমার আব্বার মৃত্যুদিন। ২০০২ সালের এই দিনে আমি আমার আব্বাকে হারিয়েছিলাম। সেই সময়কার আমি আর এই সময়কার আমি’র মাঝে আমি নিজেই অনেক পার্থক্য দেখতে পাই। দেখতে পাই, আব্বার সাথে আমার অনেক মিল, অমিল। অমিলগুলোর জন্য নিজেকে এর মালিক মনে করি। মিলগুলোর জন্য মনে করি আমার জিন কে। যা আমার আব্বা-আম্মারকাছ থেকে আমি পেয়েছে। আর এই দিকটায় পরিবারের আমার অন্য সব ভাইদের চেয়ে মনে হয় আমার বাবার সাথে আমার মিল একটু বেশী। এটা হয়তো আমি নির্মোহভাবে দেখতে পারি না। নিজেকে যতটুকু জানি বলে মনে করি, ততটুকু দিয়েই। আর তাই ভুল হবার সম্ভাবনাও থাকে।
আমার বাবাকে আমি বা আমরা কখনোই একজন স্নেহাশিষ পিতা হিসেবে পাই নি। যা আমি আমার চারপাশে দেখে এসেছি। আর তাই সেই ছোটবেলা থেকেই আব্বার প্রতি একটা বিতৃষ্ণা আমার ছিলো। আমি তাকে একটা এলোমেলো বদমেজাজি মানুষ হিসেবেই চিনে এসেছি। তবে হ্যা, এই লোকটির সংগ্রামের কথা শুনতে শুনতে বড় হয়েছি। তিনি কখনোই স্বচ্ছল থাকতে পারেন নি। সারা জীবন কাটিয়েছেন টানাপোড়েনের মধ্যে। দেখে এসেছি তার অসম্ভব পরিশ্রম করার জীবনকে। তবে আমি যা দেখেছি, তা নাকি খুবই সামান্য। তবুও তিনি আমার দেখা জীবনের মাঝে কিছুটা রয়েছেন। এই ভেবে আনন্দিতও হই।
আমার আব্বা আমাদের পূর্বজ পরিবারের প্রথম পড়ালেখা জানা (মেট্রিক পাশ) মানুষ ছিলেন। তার বাবা, মানে আমার দাদা ছিলেন আমাদের কাছে বিপ্লবী। তবে সেই বিপ্লবী মানষিকতা আমার কাছে কাপুরুষোচিত বলে মনে হয় এখন। আব্বার মুখেই তার কথা শুনেছি বেশী। কিছু শুনেছি আম্মার কাছে, কিছু নানী আর ফুপুর কাছে। আমার আব্বাকে আমি কাউকে ভয় পেতে দেখি নাই। কেবল তার বড় বোন, আমাদের একমাত্র ফুপুকে ছাড়া। ফুপুর চেয়ে দশ বছর কম ছিলো আমার আব্বার। কিন্তু আব্বাই আগে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ফুপু অনেক বয়সে দীর্ঘ রোগে ভোগে তারপর পৃথিবী ছেরেছিলেন। কোনও এক আশ্চর্য কারণে আমার ফুপু আমাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তিনি আমাদের সব ভাই বোনদের কে বা’জি আর মায়া’জি বলে ডাকতেন। কিন্তু আমাকে ডাকতেন বাজান বলে। আমাকে কাছে পেলে তার ভালোবাসা প্রকাশের মাত্রাও বেড়ে যেতো। আমি তার সেই ভালোবাসা এখন বুঝি, তখন বুঝতাম না। পরবর্তিতে মায়ের কাছে শুনেছি, আমার বাবাও ছিলেন তার অন্য ভাইদের চেয়ে বেশী আপন। আমি সেই সূত্রে হিসাব মেলাই, আমার মাঝে কি তিনি তার ছোটভাইটাকে দেখেছিলেন? হয়তো, হয়তো না। তার মুখ আমার কাছে অস্পষ্ট হতে শুরু করেছে। তিনি মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত এখনকার মত ছবি তোলা এত হাতের নাগালে ছিলো না, তবে সুযোগ যে ছিলো না তা কিন্তু নয়। আমি তবুও ছবির চেয়ে আমার স্মৃতির ফুপুকেই মনে করতে পছন্দ করি। তিনি থাকুক আমার হৃদয়ের এ্যালবামে।
২০০২ সালে আমি ইন্টারমিডিয়েটে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। আব্বা চাকরি থেকে রিটায়ার্ড করেছেন ততদিনে অনেক দিন। অনেক দিন বলতে ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি অবসর নেন। তার পর থেকে অফিস পাগল একটা তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারির দিন কাটতো না। নানা ধরনের কাজে তিনি ব্যস্ত থাকতে চেষ্টা করতেন। এই অবসর আমাদের জন্য যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। কারণ, আমরা তার প্রচণ্ড বদমেজাজী মানুষটাকে সব সময় সামনে প্রত্যাশা করতাম না। কিন্তু এই মানুষটা বদ মেজাজী হলেও ভেতরটা ছিলো একদম স্বচ্ছ। কোনও রাখঢাক তিনি মনের ভেতর পুষে রাখতেন না। এই সভ্য সমাজে মানুষ যেভাবে ক্ষোভ বিতৃষ্ণা পুষে রেখে প্রতিষোধ পরায়ন হয়ে ওঠে, তিনি তেমন কখনই ছিলেন না। তার সরলতার জন্য তাকে আমাদের সব প্রতিবেশীই একটা ভালো মানুষ বলে জানতেন।
এই ভালো মানুষটা স্থুল অর্থে জীবনে কিছু করতে পারেন নি। করতে পারেন নি এ কথাও বলা যায় না। কারণ, আমি যখন জানতে পারি, তখন তার সমগ্র বেতন মাত্র ১০ হাজার টাকা মাত্র। এটাও বেশদিন আগের ঘটনা নয়, ১৯৯৬/৯৭ সালের ঘটনা। এ সময় আমরা ৬ ভাইয়ের মাত্র একজন রোজগার করতে পারে। একজন পৃথক থাকায় তার রোজগার আমাদের পরিবারের সাথে যোগ হয় না, বাকী চারজনই পড়াশোনা করি। এই সংসারটাকে তিনি টেনে ধরে রাখতে পেরেছিলেন। তা কি কম কিছু? এখন টের পাই, এও অনেক কিছু। যা একটা উল্লেখযোগ্য দিক বলে ভাবতে পারি আমি।
আব্বা বরাবরই আদর্শবাদী মানুষ ছিলেন। তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারি হলেও তার কর্মদক্ষতার কারণে তিনি তার ডিপার্টম্যান্টের সব শ্রেণীর মানুষের কাছে সমীহ জাগানো ব্যক্তি ছিলেন। তার সম পর্যায়ের অবস্থান থেকে আমাদের চোখের সামনেই আমরা দেখেছি বাড়ি গাড়ি করে ফেলতে। আর আমার বাবাকে দেখেছি বাজারে ২ টাকা বাঁচানোর জন্য পুরো বাজার ঘুরে, দামাদামি করে তারপর কিনতে।
এই লোকটার অতীতের কথা ভাবলে আমি আরও আশ্চর্য হই। এই লোকটাই আদমজি জুট মিলের ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট ছিলো এক সময়। পুরো জুট মিল তার ভয়ে কাঁপতো। সেখানেও তার সম সাময়িকদের দুর্নীতি থেকে প্রতিষ্ঠান ও নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে যে সংগ্রাম করেছিলেন তিনি, তার কথা বলার সময় তার গলা ভারি হয়ে আসতো। আর তার চোখ ভিজে আসতো। আশ্চর্যের বিষয়, এসব আমরা টেরই পাইনি তখন। এখন টের পাই।
আব্বার স্মৃতিগুলো, চারিত্রিক ধর্মগুলো বর্ণনা করি। আর ভাবি, আমার এই অবস্থায় থাকলে তিনি কি করতেন? তিনি কি ভাবতেন? পারিনা। তার মতো করে ভাবতে পারি না। আমি আমার মতোই ভাবি। কারণ, আমি যে দলছুট হয়ে গেছি আরও অনেক আগেই। আমি যে বুঝতে শিখেছি আমার মতো করে চলে না আমার ছেলেবেলার বন্ধুরাই। তবে নিজেকে কখনোই দশজনের বাইরের ভাবিনি, ভেবেছি দশজনের সবার শেষের জন।
তাঁর মৃত্যুর একদিন আগে সন্ধ্যায় ইফতার করতে বসে হঠাৎ ইফতার করতে করতে উঠে গেলেন। বমি হলো তার। মাথায় প্রচুর পানি ঢালা হলো, কিন্তু প্রেসার বেরে যাওয়ায় কিছুতেই কিছু হচ্ছিলো না। ডাক্তার ডাকা হলো, ডাক্তার ওষুধ দিলো, সেলাইন দিলো, শরীরের অবস্থা খারাপও না ভালোও না বুঝতেই পারছিলাম না। একদিন বাড়িতেই চিকিৎসা চললো, পরদিন সন্ধ্যার আগে অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গেলে দেখাগেলো শরীরের একটা দিক তার অবশ হয়ে গেছে। মেজর স্ট্রোক। বাবার গোড়ামি আর আমাদের অজ্ঞতা ও ডাক্তারের ভুল সিদ্ধান্ত। সব মিলে আমরা একটা প্যারালাইজড বাবাকে ঘরে পরে থাকতে দেখবো এমন মানষিক প্রস্তুতি তখন আমার। এই অবস্থায় জরুরী ময়মনসিংহ মেডিকেলে নেওয়া হলো তাকে। আমার তখন সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা চলে। সকালে সেহরি খেয়ে আমার বোনের বাড়ি গিয়ে খবর দিয়ে এলাম। বোন ও দুলাভাইকে বললাম- আব্বা খুব অসুস্থ্য, ময়মনসিংহ মেডিকেলে কলেজ হাসপাতালে ভর্তি। পারলে একবার গিয়ে দেখে আসবেন। তাদের জানিয়ে আমি পরীক্ষায় বসে যাই। আমার এই বোনটি আমার একমাত্র বোন। আমার জন্মের পর থেকে আমার মা আমার জন্য যা করেছে, সে করেছে তার চেয়েও বেশী। এতে অবশ্য আমি মাকে দোষ দেই না। কারণ, এমন কিছুত হয়ই। সেই বোনটা বাবার খুব আদরের। আমাদের ছয় ভাই ও আম্মার কথা না শুনলেও বাবা আমার বোনটির কথা শুনতেন। হয়তো একমাত্র বলেই। পরীক্ষা শেষে বাসায় ফিরে দেখি বোন বাসায় বসে আছে। আর দেরি করা হলো না। তাকে নিয়ে হাসপাতালে রওনা দেয়া হলো। বাসে উঠেই মনে হচ্ছিলো গতকাল সন্ধ্যায় যে বাবাকে আমি প্রাণসহ দেখেছি, ঐ জ্যান্ত বাবাকে হয়তো আমি আর পাবো না। হাসপাতালের গেট দিয়ে ঢুকতেই পেলাম সেজো ভাইকে তার এক বন্ধুর সাথে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখমুখ লাল। মনে হচ্ছে রক্ত জমে আছে। আর একটু ভেতরে ঢুকতেই হাসপাতালে ফোন ফ্যাক্সের একটা দোকানে দেখলাম মেজোভাই কে। আমি আরও সুদৃঢ় হয়ে গেলাম, আমি যা ভাবছি তাই হতে যাচ্ছে। হাসাপাতালের ছয় তলার সিড়িগুলোকে আমার বড় দীর্ঘপথ বলে মনে হচ্ছিলো। বলতে গেলে এক দৌড়েই চললাম পেয়িং ওয়ার্ডটায়। ওয়ার্ডে ঢুকতেই আর আমার ইমিডিয়েট বড় ভাইটা আপাকে দেখে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলো। আমরা ওয়ার্ডের শেষ মাথায় এসে দেখলাম, সবার বড় ভাই বাবার মাথাটা কোলে নিয়ে বসে আছে। ডাক্তার বাবার মুখটাও ঢেকে দিয়েছেন একটা চাঁদর দিয়ে। তার পর থেকে আমার বাবাকে ঘিরে জমেথাকা বাস্তবগুলো অতীত হওয়া শুরু করলো। আজ তাঁর মৃত্যুর এক দশক পর এসে মনে হচ্ছে, নানা দিক থেকে সফল হওয়ার চেষ্টা করা একটা ব্যার্থ মানুষ আমার বাবা। আর আমি কি আপনার সেই সন্তান? যে কিনা এখনো সফল হওয়ার স্বপ্নই দেখে যাচ্ছি কেবল?

আমিই আমার বাবার আয়না

at মঙ্গলবার, নভেম্বর ২৭, ২০১২  |  2 comments

২৭ নভেম্বর আমার আব্বার মৃত্যুদিন। ২০০২ সালের এই দিনে আমি আমার আব্বাকে হারিয়েছিলাম। সেই সময়কার আমি আর এই সময়কার আমি’র মাঝে আমি নিজেই অনেক পার্থক্য দেখতে পাই। দেখতে পাই, আব্বার সাথে আমার অনেক মিল, অমিল। অমিলগুলোর জন্য নিজেকে এর মালিক মনে করি। মিলগুলোর জন্য মনে করি আমার জিন কে। যা আমার আব্বা-আম্মারকাছ থেকে আমি পেয়েছে। আর এই দিকটায় পরিবারের আমার অন্য সব ভাইদের চেয়ে মনে হয় আমার বাবার সাথে আমার মিল একটু বেশী। এটা হয়তো আমি নির্মোহভাবে দেখতে পারি না। নিজেকে যতটুকু জানি বলে মনে করি, ততটুকু দিয়েই। আর তাই ভুল হবার সম্ভাবনাও থাকে।
আমার বাবাকে আমি বা আমরা কখনোই একজন স্নেহাশিষ পিতা হিসেবে পাই নি। যা আমি আমার চারপাশে দেখে এসেছি। আর তাই সেই ছোটবেলা থেকেই আব্বার প্রতি একটা বিতৃষ্ণা আমার ছিলো। আমি তাকে একটা এলোমেলো বদমেজাজি মানুষ হিসেবেই চিনে এসেছি। তবে হ্যা, এই লোকটির সংগ্রামের কথা শুনতে শুনতে বড় হয়েছি। তিনি কখনোই স্বচ্ছল থাকতে পারেন নি। সারা জীবন কাটিয়েছেন টানাপোড়েনের মধ্যে। দেখে এসেছি তার অসম্ভব পরিশ্রম করার জীবনকে। তবে আমি যা দেখেছি, তা নাকি খুবই সামান্য। তবুও তিনি আমার দেখা জীবনের মাঝে কিছুটা রয়েছেন। এই ভেবে আনন্দিতও হই।
আমার আব্বা আমাদের পূর্বজ পরিবারের প্রথম পড়ালেখা জানা (মেট্রিক পাশ) মানুষ ছিলেন। তার বাবা, মানে আমার দাদা ছিলেন আমাদের কাছে বিপ্লবী। তবে সেই বিপ্লবী মানষিকতা আমার কাছে কাপুরুষোচিত বলে মনে হয় এখন। আব্বার মুখেই তার কথা শুনেছি বেশী। কিছু শুনেছি আম্মার কাছে, কিছু নানী আর ফুপুর কাছে। আমার আব্বাকে আমি কাউকে ভয় পেতে দেখি নাই। কেবল তার বড় বোন, আমাদের একমাত্র ফুপুকে ছাড়া। ফুপুর চেয়ে দশ বছর কম ছিলো আমার আব্বার। কিন্তু আব্বাই আগে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ফুপু অনেক বয়সে দীর্ঘ রোগে ভোগে তারপর পৃথিবী ছেরেছিলেন। কোনও এক আশ্চর্য কারণে আমার ফুপু আমাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তিনি আমাদের সব ভাই বোনদের কে বা’জি আর মায়া’জি বলে ডাকতেন। কিন্তু আমাকে ডাকতেন বাজান বলে। আমাকে কাছে পেলে তার ভালোবাসা প্রকাশের মাত্রাও বেড়ে যেতো। আমি তার সেই ভালোবাসা এখন বুঝি, তখন বুঝতাম না। পরবর্তিতে মায়ের কাছে শুনেছি, আমার বাবাও ছিলেন তার অন্য ভাইদের চেয়ে বেশী আপন। আমি সেই সূত্রে হিসাব মেলাই, আমার মাঝে কি তিনি তার ছোটভাইটাকে দেখেছিলেন? হয়তো, হয়তো না। তার মুখ আমার কাছে অস্পষ্ট হতে শুরু করেছে। তিনি মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত এখনকার মত ছবি তোলা এত হাতের নাগালে ছিলো না, তবে সুযোগ যে ছিলো না তা কিন্তু নয়। আমি তবুও ছবির চেয়ে আমার স্মৃতির ফুপুকেই মনে করতে পছন্দ করি। তিনি থাকুক আমার হৃদয়ের এ্যালবামে।
২০০২ সালে আমি ইন্টারমিডিয়েটে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। আব্বা চাকরি থেকে রিটায়ার্ড করেছেন ততদিনে অনেক দিন। অনেক দিন বলতে ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি অবসর নেন। তার পর থেকে অফিস পাগল একটা তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারির দিন কাটতো না। নানা ধরনের কাজে তিনি ব্যস্ত থাকতে চেষ্টা করতেন। এই অবসর আমাদের জন্য যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। কারণ, আমরা তার প্রচণ্ড বদমেজাজী মানুষটাকে সব সময় সামনে প্রত্যাশা করতাম না। কিন্তু এই মানুষটা বদ মেজাজী হলেও ভেতরটা ছিলো একদম স্বচ্ছ। কোনও রাখঢাক তিনি মনের ভেতর পুষে রাখতেন না। এই সভ্য সমাজে মানুষ যেভাবে ক্ষোভ বিতৃষ্ণা পুষে রেখে প্রতিষোধ পরায়ন হয়ে ওঠে, তিনি তেমন কখনই ছিলেন না। তার সরলতার জন্য তাকে আমাদের সব প্রতিবেশীই একটা ভালো মানুষ বলে জানতেন।
এই ভালো মানুষটা স্থুল অর্থে জীবনে কিছু করতে পারেন নি। করতে পারেন নি এ কথাও বলা যায় না। কারণ, আমি যখন জানতে পারি, তখন তার সমগ্র বেতন মাত্র ১০ হাজার টাকা মাত্র। এটাও বেশদিন আগের ঘটনা নয়, ১৯৯৬/৯৭ সালের ঘটনা। এ সময় আমরা ৬ ভাইয়ের মাত্র একজন রোজগার করতে পারে। একজন পৃথক থাকায় তার রোজগার আমাদের পরিবারের সাথে যোগ হয় না, বাকী চারজনই পড়াশোনা করি। এই সংসারটাকে তিনি টেনে ধরে রাখতে পেরেছিলেন। তা কি কম কিছু? এখন টের পাই, এও অনেক কিছু। যা একটা উল্লেখযোগ্য দিক বলে ভাবতে পারি আমি।
আব্বা বরাবরই আদর্শবাদী মানুষ ছিলেন। তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারি হলেও তার কর্মদক্ষতার কারণে তিনি তার ডিপার্টম্যান্টের সব শ্রেণীর মানুষের কাছে সমীহ জাগানো ব্যক্তি ছিলেন। তার সম পর্যায়ের অবস্থান থেকে আমাদের চোখের সামনেই আমরা দেখেছি বাড়ি গাড়ি করে ফেলতে। আর আমার বাবাকে দেখেছি বাজারে ২ টাকা বাঁচানোর জন্য পুরো বাজার ঘুরে, দামাদামি করে তারপর কিনতে।
এই লোকটার অতীতের কথা ভাবলে আমি আরও আশ্চর্য হই। এই লোকটাই আদমজি জুট মিলের ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট ছিলো এক সময়। পুরো জুট মিল তার ভয়ে কাঁপতো। সেখানেও তার সম সাময়িকদের দুর্নীতি থেকে প্রতিষ্ঠান ও নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে যে সংগ্রাম করেছিলেন তিনি, তার কথা বলার সময় তার গলা ভারি হয়ে আসতো। আর তার চোখ ভিজে আসতো। আশ্চর্যের বিষয়, এসব আমরা টেরই পাইনি তখন। এখন টের পাই।
আব্বার স্মৃতিগুলো, চারিত্রিক ধর্মগুলো বর্ণনা করি। আর ভাবি, আমার এই অবস্থায় থাকলে তিনি কি করতেন? তিনি কি ভাবতেন? পারিনা। তার মতো করে ভাবতে পারি না। আমি আমার মতোই ভাবি। কারণ, আমি যে দলছুট হয়ে গেছি আরও অনেক আগেই। আমি যে বুঝতে শিখেছি আমার মতো করে চলে না আমার ছেলেবেলার বন্ধুরাই। তবে নিজেকে কখনোই দশজনের বাইরের ভাবিনি, ভেবেছি দশজনের সবার শেষের জন।
তাঁর মৃত্যুর একদিন আগে সন্ধ্যায় ইফতার করতে বসে হঠাৎ ইফতার করতে করতে উঠে গেলেন। বমি হলো তার। মাথায় প্রচুর পানি ঢালা হলো, কিন্তু প্রেসার বেরে যাওয়ায় কিছুতেই কিছু হচ্ছিলো না। ডাক্তার ডাকা হলো, ডাক্তার ওষুধ দিলো, সেলাইন দিলো, শরীরের অবস্থা খারাপও না ভালোও না বুঝতেই পারছিলাম না। একদিন বাড়িতেই চিকিৎসা চললো, পরদিন সন্ধ্যার আগে অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গেলে দেখাগেলো শরীরের একটা দিক তার অবশ হয়ে গেছে। মেজর স্ট্রোক। বাবার গোড়ামি আর আমাদের অজ্ঞতা ও ডাক্তারের ভুল সিদ্ধান্ত। সব মিলে আমরা একটা প্যারালাইজড বাবাকে ঘরে পরে থাকতে দেখবো এমন মানষিক প্রস্তুতি তখন আমার। এই অবস্থায় জরুরী ময়মনসিংহ মেডিকেলে নেওয়া হলো তাকে। আমার তখন সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা চলে। সকালে সেহরি খেয়ে আমার বোনের বাড়ি গিয়ে খবর দিয়ে এলাম। বোন ও দুলাভাইকে বললাম- আব্বা খুব অসুস্থ্য, ময়মনসিংহ মেডিকেলে কলেজ হাসপাতালে ভর্তি। পারলে একবার গিয়ে দেখে আসবেন। তাদের জানিয়ে আমি পরীক্ষায় বসে যাই। আমার এই বোনটি আমার একমাত্র বোন। আমার জন্মের পর থেকে আমার মা আমার জন্য যা করেছে, সে করেছে তার চেয়েও বেশী। এতে অবশ্য আমি মাকে দোষ দেই না। কারণ, এমন কিছুত হয়ই। সেই বোনটা বাবার খুব আদরের। আমাদের ছয় ভাই ও আম্মার কথা না শুনলেও বাবা আমার বোনটির কথা শুনতেন। হয়তো একমাত্র বলেই। পরীক্ষা শেষে বাসায় ফিরে দেখি বোন বাসায় বসে আছে। আর দেরি করা হলো না। তাকে নিয়ে হাসপাতালে রওনা দেয়া হলো। বাসে উঠেই মনে হচ্ছিলো গতকাল সন্ধ্যায় যে বাবাকে আমি প্রাণসহ দেখেছি, ঐ জ্যান্ত বাবাকে হয়তো আমি আর পাবো না। হাসপাতালের গেট দিয়ে ঢুকতেই পেলাম সেজো ভাইকে তার এক বন্ধুর সাথে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখমুখ লাল। মনে হচ্ছে রক্ত জমে আছে। আর একটু ভেতরে ঢুকতেই হাসপাতালে ফোন ফ্যাক্সের একটা দোকানে দেখলাম মেজোভাই কে। আমি আরও সুদৃঢ় হয়ে গেলাম, আমি যা ভাবছি তাই হতে যাচ্ছে। হাসাপাতালের ছয় তলার সিড়িগুলোকে আমার বড় দীর্ঘপথ বলে মনে হচ্ছিলো। বলতে গেলে এক দৌড়েই চললাম পেয়িং ওয়ার্ডটায়। ওয়ার্ডে ঢুকতেই আর আমার ইমিডিয়েট বড় ভাইটা আপাকে দেখে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলো। আমরা ওয়ার্ডের শেষ মাথায় এসে দেখলাম, সবার বড় ভাই বাবার মাথাটা কোলে নিয়ে বসে আছে। ডাক্তার বাবার মুখটাও ঢেকে দিয়েছেন একটা চাঁদর দিয়ে। তার পর থেকে আমার বাবাকে ঘিরে জমেথাকা বাস্তবগুলো অতীত হওয়া শুরু করলো। আজ তাঁর মৃত্যুর এক দশক পর এসে মনে হচ্ছে, নানা দিক থেকে সফল হওয়ার চেষ্টা করা একটা ব্যার্থ মানুষ আমার বাবা। আর আমি কি আপনার সেই সন্তান? যে কিনা এখনো সফল হওয়ার স্বপ্নই দেখে যাচ্ছি কেবল?

Read More

এই সাইটের যে কোনও লেখা যে কেউ অনলাইনে ব্যবহার করতে পারবে। তবে লেখকের নাম ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক।

Blogger template Proudly Powered by Blogger. Arranged By: এতক্ষণে অরিন্দম