মঙ্গলবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

বন্ধু জয় আমারে অপছন্দের খেলায় ডাইক্যা নিয়া বিপদে ফালাইয়া দিলো। আমি সাধারণত এইসব খেলায় খেলার মতো স্কিল রাখি না। কারণ আমি ভুলে যাই। ভুলে যেতে আমি খুব ওস্তাদ। তবে এত্তসব ভুলে যাওয়া মুখ,ঘটনা, ইতিহাস, কবিতা আর সিনেমার মাঝ দিয়েও কিছু সিনেমা আমার অনিচ্ছায়ও মনে থাইক্যা যায়। আজকে তারই কথা বলবো।



০১. পথের পাঁচালি, (১৯৫৫) অপুর সংসার (১৯৬০), পরিচালক- সত্যজিত রায়
বিভুতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর পথের পাঁচালি উপন্যাস থার্ড ইয়ারে পাঠ্য ছিলো। কিন্তু সাহিত্যের ছাত্র হিসেবে আমি বারবার চেষ্টার পরও এই উপন্যাস পড়ে শেষ করতে পারি নি। এইটা আমারই অযোগ্যতা। কিন্তু পথের পাঁচালি ছবি দেখতে গিয়া আমি অন্য কোথাও মনযোগ দিতে পারিনি। এই সফলতা ছবির ও ছবির পরিচালকের। একই রকম কথা আমাকে বলতে হয় অপুর সংসারের ক্ষেত্রেও। আমার বরং পথের পাঁচালির চেয়ে অপুর সংসারকে বেশী আনন্দ ও বেদনাময় মুগ্ধতার আশ্রয় বলে মনে হয়।
০২. দ্যা ব্রিজ অন দ্যা রিভার কাওয়াই (১৯৫৭), পরিচালক- ডেভিড লিন
তসলিমা নাসরিন তার বাবার কাছে এক খোলা চিঠিতে এই ছবির শেষ দৃশ্যে কাওয়াই নদীর ওপর যখন ব্রিজটি ভেঙ্গে পড়ছে আর যাত্রী বোঝাই ট্রেনটি যখন ঐ ভাঙ্গা ব্রিজ দিয়ে নদীতে ভেঙ্গে পড়ছে তখনকার বর্ণনা দিয়েছিলেন। বর্ণনা শুনে গায়ের লোম দাড়িয়ে পরে। আমার মনে আছে, ঐ হোস্টেলে বিটিভিতে দেখা এই ছবি শেষে একা একা কেঁদে কেঁদে টিভিরুম ছেড়েছিলাম।





০৩. দ্যা ওল্ড ম্যান এন্ড দ্যা সি (১৯৫৮) পরিচালক- জন স্টারজিস, হেনরি কিং, ফ্রেড জিন্নেমান
একটা সময় ছিলো বিটিভিতে মুভি অব দ্যা উইক নামে প্রত্যেক শুক্রবার কি শনিবারে দুপুর বেলা বিদেশী ছবি দেখাইতো। আমার শৈশবের স্মৃতির সাথে মিশে থাকা মুভি অব দ্যা উইক। পড়াশোনার জন্য বাড়ি ছাড়ার পর হোস্টেলের টিভি রুমে একা একা বসে থেকে দেখা মুভিগুলোর একটা। কারণ ঐ বয়সে ওল্ড ম্যান এন্ড দ্যা সি’র মতো ছবি দেখার মানুষ সহপাঠিদের ছিলো না বলে একই দেখতে হইতো। মাসকান্দা টিটিসি’র হোস্টেলের টিভি রুমে এমন আরে বেশ কিছু ছবি আমার ঐ হোস্টেলেই দেখা। তাই এইসব ছবির সাথে ঐ হোস্টেলটাও উল্লেখযোগ্য। ;)

০৪. ছুটির ঘন্টা (১৯৮০), পরিচালক- আজিজুর রহমান
সিনেমার প্রসঙ্গ আসলে পৃথিবীর সব সিনেমার কথা আমি ভুলে যাইতে পারি। কিন্তু ছুটির ঘন্টার কথা আমি কখনোই ভুলবো না। হইতে পারে এইটা আমার সিনেমা হলে গিয়া দেখা প্রথম ছবি। তবে এই ছবির জন্যই হয়তো অদ্ভুতভাবে সিনেমার সাথে কিছুটা স্বপ্নের সম্পর্কও স্থাপিত হইছে। তাই এই ছবির কথা আমি কখনোই ভুলবোনা। ভোলার মতো নয়।

০৫. দহন (১৯৮৬), পরিচালক-শেখ নিয়ামত আলী
ব্যক্তিগত প্রেমের চেয়ে সমষ্টিগত প্রেমই গল্পে প্রাধান্য পেয়েছে। গল্পে আরো অনেক গুরুপ্তপূর্ণ বিষয় স্থান পেয়েছে বাজেট, মানুষ, রাজনীতি, প্রেম নিয়ে ছবিতে পৃথব বক্তব্য আছে। এইসব এখন আর আমাদের ছবিতে থাকে না। ছবির সবচে উল্লেখযোগ্য যে বিষয় তা এই সমাজের পুরানো পদ্ধতি ভাঙার সংগ্রামের কথা। খোঁজা হইছে মুক্তির পথ। ফ্যাক্টস, ফিকশন, সিম্বল, হিওমার ব্যবহার করে কাহিনীতে সৃষ্টি করেছে একটি দলিলচিত্র। আর ছবিতে আনোয়ার হোসেনের সিনেমাটোগ্রাফিও ছিলো দুর্দান্ত। মেকিংও ভালো লাগার মতো।


০৬. ড্রিমস (১৯৯০), পরিচালক- আকিরা কুরোশাওয়া ও ইশিরো হোন্ডা
হ্যা, এই ছবি দেখার পর আমি তব্দা খাইয়া গেছিলাম। কুরোশাওয়ার কিছু ছবি দেখে তাকে বড় ডিরেক্টর হিসেবে স্বীকৃতি মানতে আমার দ্বিধা ছিলো না। কিন্তু ড্রিমস দেখার পর মনে হইছিলো কুরোশাওয়া পৃথিবীর সেরা পরিচালকদের একজন। এমনকি সে কেবল ডিরেক্টরই না, সিনেমার কবিও। বিশেষ করে ভ্যান ঘগ নিয়া পার্টটা দেখার পর আমি কোনও ভাষাই পাইতেছিলাম না, কি দেখলাম। অদ্ভুত। এই মুগ্ধতা প্রকাশ করার আমি কোনও যৌক্তিক ভাষা পাই নাই। 


০৭. জুড (১৯৯৬), পরিচালক- মাইকেল উইন্টারবটম
থমাস হার্ডির উপন্যাস জুড দ্যা অবসকিউর অবলম্বনে মাইকেল উইন্টারবটমের সিনেমা জুড। প্রিয় নায়িকা কেট উইনসেøট এর ছবি খুঁজতে গিয়া এই ছবি আমার হাতে পড়ছিলো। ছবির শুরুটা দেখলে যে কোনও সিনেমা প্রিয় ব্যক্তি মুগ্ধ হবে। একদম কবিতার মতো। সিনেমার পর্দাজুড়ে একটা বিষাদ মাখা আহব নিয়ে শুরু হয় যেমন, তেমন শেষও হয় একটা বিষাদ ছুঁয়ে দিয়ে। সর্বোপরি সিনেমার নায়ক জুড আমার প্রিয় চরিত্র হয়ে উঠছিলো ছবি দেখার পর। তার চরিত্রের বেখেয়াল আমার ভালো লাগে। তাই তাকে ভালোবাসি।

০৮. চরাচর (১৯৯৩), পরিচালক- বুদ্ধদেব দাসগুপ্ত
মাথার ভেতর পাখিগাছ নিয়ে ঘুমায়েছে নেতাই (নিতাই)- এই এক সংলাপ আমাকে এলোমেলো করে দিছে বুদ্ধদেব এর এই ছবি দেখার পর। বুদ্ধদেব এর ছবি আদতে ভিস্যুয়াল কবিতা। তাই কবিতা নিয়া বেশী কিছু বলা উচিত হবে না। বলতে হয়, বুদ্ধদেব এর ছবি না দেখলে বাংলা সিনেমা দেখাই অসম্পূর্ণ থাকবে আপনার।

০৯. কালার অব প্যারাডাইস (১৯৯৯), পরিচালক- মাজিদ মাজিদী
একটা অন্ধ শিশুর পৃথিবী কতটুকুই বা রঙিন হতে পারে বা তার জগৎ কতটুকু বড় এই প্রশ্ন অবান্তর। কিন্তু আমার কথা সম্পূর্ণই ভুল প্রমাণিত করে দিয়েছে মাজিদ মাজিদী’র এই ছবি। যারা দেখেছে তারা কেউই এই কথা অস্বীকার করতে পারবে না বলেই আমার মনে হয়। এই ছবি ইরানের সিনেমায়ই নয়, বিশ্ব চলচ্চিত্রেরও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাই ছবি প্রসঙ্গে আর কিছু না বললেও চলে।

১০. নো ম্যানস ল্যান্ড (২০০১), পরিচালক- ডেনিস টানোভিচ
সাবেক যোগেস্লাভিয়ার ও বর্তমান বসনিয়ান পরিচালক ডেনিস টানোভিচ যুদ্ধ নিয়ে দুর্ধর্ষ যে ছবিটা বানাইছে তার নাম নো ম্যানস ল্যান্ড। নো ম্যানস ল্যান্ড শব্দটা শুনলেই যুদ্ধের যে প্রসঙ্গটা আসে এইটা এমনই প্রসঙ্গের ছবি। আর দুই দেশের শত্রুপক্ষের দুইজন এই নো ম্যানস ল্যান্ডে এসে নিজেদের প্রয়োজনে বাধ্য হয়ে বন্ধু হয়ে যাওয়ার গল্পই এই ছবিকে উপভোগ্য করেছে। অথচ যুদ্ধই ছবির প্রধান বিষয়। বলতে গেলে আধুনিক সময়ের বিশ্ব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের এক সর্বোচ্চ সিনেমাটিক দলিল নো ম্যানস ল্যান্ড।

১১. মাটির ময়না (২০০২), পরিচালক- তারেক মাসুদ
আমি বাংলা ছবি দেখতে সবচে বেশী ভালোবাসি। আর বাংলা ছবি যদি তুলনামূলক একটু ভালো হয়, এতেই মুগ্ধ হয়ে যাই আমি। এই ছবি একটু ভালো ছবি না, এই কথা আর আমাকে বলার প্রয়োজন নাই। তবে হ্যা, দীর্ঘ সময় (১৯৯৮ থেকে ২০০২) সিনেমা হলে গিয়া এলোমেলো বাংলা সিনেমা দেখতে দেখতে যখন বিরক্তির মাত্রা ছাড়িয়ে যাইতেছিলো তখনই মাটির ময়না দেখার সুযোগ আসে। আর দেখার পর মনে ১৯৯৮ এ দেখা রিভার কাওয়াই ও ওল্ড ম্যান এন্ড সি দেখার পর মনে হইছিলো আবার সিনেমার আশ্চর্য জগতের কাছাকাছি ফিরতে পারছি। এইটা বিরাট পাওয়া ছিলো আমার কাছে।

১২. সিটি অব গড (২০০২), ফার্নান্দো মিরাল্যাস ও কাতিয়া ল্যুনড
বিশ্ব সিনেমায় ব্রাজিলের সিনেমার আলাদা ইতিহাস তৈরি করছে সিটি অব গড। নতুন সিনেমা দেখবো আর সিটি অব গড দেখবো না এমন বোকা হওয়ার যোগ্যতা আমার নাই। ফুটবলের দেশ বলে পরিচিত ব্রাজিলের যে অন্য রূপ তা আমাদের কাছে তো এই সিনেমাই চিনাইয়া দিছে। মজার বিষয় এই সিনেমা কিন্তু সত্য ঘটনা অবলম্বনেই বানানো। তাই শুধুমাত্র একটি সিনেমা না সিটি অব গড। এই ছবির পর থেকে ফার্নান্দো মিরাল্যাস প্রিয় পরিচালকদেরও একজন।

১৩. স্প্রিং সামার ফল উইন্টার এন্ড স্প্রিং (২০০৩), পরিচালক- কিম কি দুক
কোনও কিছুই যে বাস্তবতার ঊর্ধ্বে না, সেটা ধর্মই হোক আর প্রেম অথবা কমিটমেন্টই হোক তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত কিম কি দুক এর এই অসামান্য ছবি। এক ছবি দেখার পর কিমের বাকি সব ছবি দেখার জন্য কেবল অপেক্ষাই করি নাই। পাওয়া মাত্রই হুমড়ি খেয়ে দেখছি। তার জন্য অনন্ত-রে একটা ধন্যবাদ দেয়াই উচিত। সে যদি বাসায় এই ডিভিডিটা না রেখে যেতো তাহলে হয়তো কিম কে আবিষ্কার করতে আরোও সময় লাগতো।

১৪. টার্টলেস ক্যান ফ্লাই (২০০৪), পরিচালক- বাগমান গোবাদি
আবারো যুদ্ধ প্রসঙ্গ। এবারো মানবিক। তবে এবার যুদ্ধে শিশুদের অবস্থান আর তাদের সংগ্রামের গল্প এই গোবাদির এই ছবি। দেখার আগে ভাবিনি এতটা ভালো লাগবে। তবে দেখার পর মুগ্ধ হয়েছিলাম। কালে কালে পৃথিবীর সব যুদ্ধে শিশুরাই যে সবচে ক্ষতিগ্রস্থ হয় তা আর বলতে হয় না। তবে শিশুদেরও জীবনেও যে এঁকে দেয়া হয় আর এই যন্ত্রণা যে তারা বয়ে বেড়ায় বাকি জীবন তা নিঃসন্দেহে বেদনার।

১৫. বর্ন ইন ব্রোথেল : ক্যালকাট্টাস রেড লাইট কিডস (২০০৪), পরিচালক- জানা ব্রিসকি ও রস কৌফমান
বলা হয় ভারত-বাংলাদেশসহ সাউথ এশিয়া ডকুমেন্টারির জন্য সর্বোৎকৃষ্ট স্থান। তাই এখানেই নির্মিত এই সিনেমা। কলকাতার পতিতালয়ে জন্ম ও বেড়ে ওঠা শিশুদের নিয়ে নির্মিত ডকুমেন্টারি। ডকুমেন্টারি শাখায় অস্কার পাইছিলো। আর কোনও কিছু বলার নাই এই ছবি নিয়া।

১৬. ভিভা কুবা (২০০৫), পরিচালক- জোয়ান কার্লোস ক্রিমাতা ও ইরাইদা মেলবার্তি
কিউবার জীবনযাপনের কিছুই বলতে আমাদের জানা নাই। কারণ আমরা ইন্টারনেটের যে জগৎটায় বাস করি তা পশ্চিমা বিশ্বের হাত দিয়া পরিচালিত আর তারা কিউবারে পছন্দ করে না। দেশটাকে যতটা খারাপ ভাবে দেখানো যায় ততটাই তারা দেখায়। তবে কিউবার সিনেমার অসাধারণ একটা ঐতিহ্য আছে। সেই ঐতিহ্যের কথা চিন্তা করেই খুঁজে খুঁজে কিউবার কিছু ছবি দেখতে শুরু করছিলাম। তার মাঝে ভিভা কুবা’ই সেরা। প্রতিবেশী দুই শিশুর গল্প, দুই বন্ধুর গল্পও। না দেখলে মিস।

১৭. ওয়াটার  (২০০৫), পরিচালক- দীপা মেহতা
সতিদাহ প্রথা উচ্ছেদ হওয়ার পরও সনাতন ধর্মাবলম্বী বিধবা নারীদের সমাজে যে কোনও গুরুত্বই ছিলো না, তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দীপা মেহতার ছবি ওয়াটার। ছবি দেখে ঐ সময়কার হিন্দু বিধবাদের জন্য মায়া হয় নি, ঐ সময়কার সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে চরম ঘৃণা তৈরি হইছিলো। ছবিতে শ্রীলংকান শিশু অভিনয় শিল্পী সরলার অভিনয় মুগ্ধ করছিলো আমারে।

১৮. বাবেল (২০০৬), পরিচালক- আলেজান্দ্রো গঞ্জালেস ইনারিতু
ইনারিতু যখন বিজ্ঞাপন বানানো বাদ দিয়া সিনেমা বানাইতে আসে, শুরুতেই সে বিশ্ববাসীকে চমক দেখায় তার এ্যামোরেস পেরোস দিয়া। কিন্তু আমি এ্যামোরেস পেরোসের চেয়ে বাবেল কে এগিয়ে রাখবো। কারণ, বাবল কেবল একটা সিনেমা না আমার কাছে। আমার কাছে এইটা একটা বিশ্ব রাজনীতি অর্থনীতির অবস্থার বিপক্ষে তীব্র আন্দোলনেরও নাম। এই ছবি ভালো না লেগে উপায় আছে!

১৯. দ্যা ফল (২০০৬), পরিচালক- টারসেম সিং
ইনারিতুর মতো টারসেমও বিজ্ঞাপন নির্মাতা। ফলে তার সিনেমায় বিজ্ঞাপনী একটা ভাষা থাকে। কিন্তু কল্পনার যে রংধনু সাত রঙের না, সেটা শত কোটি রঙেরও হতে পারে তা অসাধারণ ভাবে দেখাইছে টারসেম সিং। ইন্ডিয়ান বংশদ্ভুত কোনও পরিচালক হলিউড বা বলিউড কোথাও এত দুর্দান্ত কাজ করতে পারে নি বলে মনে হয়।

২০. ইনটু দ্যা ওয়াইল্ড (২০০৭), পরিচালক- শন পেন
ক্রিস্টোফার ম্যাকেন্ডলস এর বায়োগ্রাফি অবলম্বন করে জন ক্রাকোয়ের বই ইনটু দ্যা ওয়াইল্ড থেকে ছবি বানাইছে ইনটু দ্যা ওয়াইল্ড। বিভুতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর বাংলা উপন্যাস চাঁদের পাহাড়ের কথা যদি আমাদের মনে থাকে তবে তার শঙ্কর চরিত্রটার ইউরোপিয়ান ভার্সন এই ছবির চরিত্র ক্রিস্টোফার। উপন্যাস বলেই শঙ্কর আফ্রিকা থেকে বেঁচে ফিরতে পেরেছিলো, কিন্তু ক্রিস্টোফার নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ দিয়েছে মনের স্বাধীনতাই আসল। আর সেই স্বাধীনতাটাই আমাদের নেই। বলতে গেলে আমরা পরাধিন। তাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে ক্রিস্টোফার আর শন পেন।

২১. লেমন ট্রি (২০০৮), পরিচালক- ইরান রিকিলিস
ইসরাইলি পরিচালকরা ভালো সিনেমা বানায়। এবং নিঃসন্দেহে তাদের সিনেমার সিংহভাগই যায় প্যালেস্টাইনিদের পক্ষে। প্যালেস্টাইনিদের জীবন সংগ্রাম ইসরাইলিদের ছবির বিষয় হয়ে বারবার রূপালী পর্দায়। এই রকম জীবনচিত্রের মাঝে লেমন ট্রি যুদ্ধের বাইরে আর এক যুদ্ধের গল্প। এই গল্প বারবার আমাদের মতো ছেলেদের যারা মাকে ছেড়ে নিজের মতো থাকে তাদের ব্যার্থতার কথাও খুবই দৃঢ়ভাবে বলছে ইরান রিকিলিস।

২২. মিডনাইট ইন প্যারিস (২০১১), পরিচালক- উডি অ্যালেন
পৃথিবীর সমস্ত শিল্পীদের নাকি দুইটা মাতৃভূমি একটা তার জন্ম দেশ আর একটা প্যারিস। শিল্পের শহর প্যারিসে ব্রিটিশ এক গল্পকারের ভ্রমণটা তাই অনেকটা ইতিহাস আর কল্পনায় মাখামাখি। বাস্তব আর কল্পনার মাঝে বিস্তর ফারাক থাকলেও এই ছবিতে কিন্তু ইতিহাসকে বাস্তবে টেনে আনতে মোটেও কষ্ট পায় নি অ্যালেন। এই কারণেই সে বিশ্বসেরা পরিচালকদের একজন।


কয়েকটা প্রিয় সিনেমার উঠানে

at মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ০২, ২০১৪  |  No comments

বন্ধু জয় আমারে অপছন্দের খেলায় ডাইক্যা নিয়া বিপদে ফালাইয়া দিলো। আমি সাধারণত এইসব খেলায় খেলার মতো স্কিল রাখি না। কারণ আমি ভুলে যাই। ভুলে যেতে আমি খুব ওস্তাদ। তবে এত্তসব ভুলে যাওয়া মুখ,ঘটনা, ইতিহাস, কবিতা আর সিনেমার মাঝ দিয়েও কিছু সিনেমা আমার অনিচ্ছায়ও মনে থাইক্যা যায়। আজকে তারই কথা বলবো।



০১. পথের পাঁচালি, (১৯৫৫) অপুর সংসার (১৯৬০), পরিচালক- সত্যজিত রায়
বিভুতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর পথের পাঁচালি উপন্যাস থার্ড ইয়ারে পাঠ্য ছিলো। কিন্তু সাহিত্যের ছাত্র হিসেবে আমি বারবার চেষ্টার পরও এই উপন্যাস পড়ে শেষ করতে পারি নি। এইটা আমারই অযোগ্যতা। কিন্তু পথের পাঁচালি ছবি দেখতে গিয়া আমি অন্য কোথাও মনযোগ দিতে পারিনি। এই সফলতা ছবির ও ছবির পরিচালকের। একই রকম কথা আমাকে বলতে হয় অপুর সংসারের ক্ষেত্রেও। আমার বরং পথের পাঁচালির চেয়ে অপুর সংসারকে বেশী আনন্দ ও বেদনাময় মুগ্ধতার আশ্রয় বলে মনে হয়।
০২. দ্যা ব্রিজ অন দ্যা রিভার কাওয়াই (১৯৫৭), পরিচালক- ডেভিড লিন
তসলিমা নাসরিন তার বাবার কাছে এক খোলা চিঠিতে এই ছবির শেষ দৃশ্যে কাওয়াই নদীর ওপর যখন ব্রিজটি ভেঙ্গে পড়ছে আর যাত্রী বোঝাই ট্রেনটি যখন ঐ ভাঙ্গা ব্রিজ দিয়ে নদীতে ভেঙ্গে পড়ছে তখনকার বর্ণনা দিয়েছিলেন। বর্ণনা শুনে গায়ের লোম দাড়িয়ে পরে। আমার মনে আছে, ঐ হোস্টেলে বিটিভিতে দেখা এই ছবি শেষে একা একা কেঁদে কেঁদে টিভিরুম ছেড়েছিলাম।





০৩. দ্যা ওল্ড ম্যান এন্ড দ্যা সি (১৯৫৮) পরিচালক- জন স্টারজিস, হেনরি কিং, ফ্রেড জিন্নেমান
একটা সময় ছিলো বিটিভিতে মুভি অব দ্যা উইক নামে প্রত্যেক শুক্রবার কি শনিবারে দুপুর বেলা বিদেশী ছবি দেখাইতো। আমার শৈশবের স্মৃতির সাথে মিশে থাকা মুভি অব দ্যা উইক। পড়াশোনার জন্য বাড়ি ছাড়ার পর হোস্টেলের টিভি রুমে একা একা বসে থেকে দেখা মুভিগুলোর একটা। কারণ ঐ বয়সে ওল্ড ম্যান এন্ড দ্যা সি’র মতো ছবি দেখার মানুষ সহপাঠিদের ছিলো না বলে একই দেখতে হইতো। মাসকান্দা টিটিসি’র হোস্টেলের টিভি রুমে এমন আরে বেশ কিছু ছবি আমার ঐ হোস্টেলেই দেখা। তাই এইসব ছবির সাথে ঐ হোস্টেলটাও উল্লেখযোগ্য। ;)

০৪. ছুটির ঘন্টা (১৯৮০), পরিচালক- আজিজুর রহমান
সিনেমার প্রসঙ্গ আসলে পৃথিবীর সব সিনেমার কথা আমি ভুলে যাইতে পারি। কিন্তু ছুটির ঘন্টার কথা আমি কখনোই ভুলবো না। হইতে পারে এইটা আমার সিনেমা হলে গিয়া দেখা প্রথম ছবি। তবে এই ছবির জন্যই হয়তো অদ্ভুতভাবে সিনেমার সাথে কিছুটা স্বপ্নের সম্পর্কও স্থাপিত হইছে। তাই এই ছবির কথা আমি কখনোই ভুলবোনা। ভোলার মতো নয়।

০৫. দহন (১৯৮৬), পরিচালক-শেখ নিয়ামত আলী
ব্যক্তিগত প্রেমের চেয়ে সমষ্টিগত প্রেমই গল্পে প্রাধান্য পেয়েছে। গল্পে আরো অনেক গুরুপ্তপূর্ণ বিষয় স্থান পেয়েছে বাজেট, মানুষ, রাজনীতি, প্রেম নিয়ে ছবিতে পৃথব বক্তব্য আছে। এইসব এখন আর আমাদের ছবিতে থাকে না। ছবির সবচে উল্লেখযোগ্য যে বিষয় তা এই সমাজের পুরানো পদ্ধতি ভাঙার সংগ্রামের কথা। খোঁজা হইছে মুক্তির পথ। ফ্যাক্টস, ফিকশন, সিম্বল, হিওমার ব্যবহার করে কাহিনীতে সৃষ্টি করেছে একটি দলিলচিত্র। আর ছবিতে আনোয়ার হোসেনের সিনেমাটোগ্রাফিও ছিলো দুর্দান্ত। মেকিংও ভালো লাগার মতো।


০৬. ড্রিমস (১৯৯০), পরিচালক- আকিরা কুরোশাওয়া ও ইশিরো হোন্ডা
হ্যা, এই ছবি দেখার পর আমি তব্দা খাইয়া গেছিলাম। কুরোশাওয়ার কিছু ছবি দেখে তাকে বড় ডিরেক্টর হিসেবে স্বীকৃতি মানতে আমার দ্বিধা ছিলো না। কিন্তু ড্রিমস দেখার পর মনে হইছিলো কুরোশাওয়া পৃথিবীর সেরা পরিচালকদের একজন। এমনকি সে কেবল ডিরেক্টরই না, সিনেমার কবিও। বিশেষ করে ভ্যান ঘগ নিয়া পার্টটা দেখার পর আমি কোনও ভাষাই পাইতেছিলাম না, কি দেখলাম। অদ্ভুত। এই মুগ্ধতা প্রকাশ করার আমি কোনও যৌক্তিক ভাষা পাই নাই। 


০৭. জুড (১৯৯৬), পরিচালক- মাইকেল উইন্টারবটম
থমাস হার্ডির উপন্যাস জুড দ্যা অবসকিউর অবলম্বনে মাইকেল উইন্টারবটমের সিনেমা জুড। প্রিয় নায়িকা কেট উইনসেøট এর ছবি খুঁজতে গিয়া এই ছবি আমার হাতে পড়ছিলো। ছবির শুরুটা দেখলে যে কোনও সিনেমা প্রিয় ব্যক্তি মুগ্ধ হবে। একদম কবিতার মতো। সিনেমার পর্দাজুড়ে একটা বিষাদ মাখা আহব নিয়ে শুরু হয় যেমন, তেমন শেষও হয় একটা বিষাদ ছুঁয়ে দিয়ে। সর্বোপরি সিনেমার নায়ক জুড আমার প্রিয় চরিত্র হয়ে উঠছিলো ছবি দেখার পর। তার চরিত্রের বেখেয়াল আমার ভালো লাগে। তাই তাকে ভালোবাসি।

০৮. চরাচর (১৯৯৩), পরিচালক- বুদ্ধদেব দাসগুপ্ত
মাথার ভেতর পাখিগাছ নিয়ে ঘুমায়েছে নেতাই (নিতাই)- এই এক সংলাপ আমাকে এলোমেলো করে দিছে বুদ্ধদেব এর এই ছবি দেখার পর। বুদ্ধদেব এর ছবি আদতে ভিস্যুয়াল কবিতা। তাই কবিতা নিয়া বেশী কিছু বলা উচিত হবে না। বলতে হয়, বুদ্ধদেব এর ছবি না দেখলে বাংলা সিনেমা দেখাই অসম্পূর্ণ থাকবে আপনার।

০৯. কালার অব প্যারাডাইস (১৯৯৯), পরিচালক- মাজিদ মাজিদী
একটা অন্ধ শিশুর পৃথিবী কতটুকুই বা রঙিন হতে পারে বা তার জগৎ কতটুকু বড় এই প্রশ্ন অবান্তর। কিন্তু আমার কথা সম্পূর্ণই ভুল প্রমাণিত করে দিয়েছে মাজিদ মাজিদী’র এই ছবি। যারা দেখেছে তারা কেউই এই কথা অস্বীকার করতে পারবে না বলেই আমার মনে হয়। এই ছবি ইরানের সিনেমায়ই নয়, বিশ্ব চলচ্চিত্রেরও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাই ছবি প্রসঙ্গে আর কিছু না বললেও চলে।

১০. নো ম্যানস ল্যান্ড (২০০১), পরিচালক- ডেনিস টানোভিচ
সাবেক যোগেস্লাভিয়ার ও বর্তমান বসনিয়ান পরিচালক ডেনিস টানোভিচ যুদ্ধ নিয়ে দুর্ধর্ষ যে ছবিটা বানাইছে তার নাম নো ম্যানস ল্যান্ড। নো ম্যানস ল্যান্ড শব্দটা শুনলেই যুদ্ধের যে প্রসঙ্গটা আসে এইটা এমনই প্রসঙ্গের ছবি। আর দুই দেশের শত্রুপক্ষের দুইজন এই নো ম্যানস ল্যান্ডে এসে নিজেদের প্রয়োজনে বাধ্য হয়ে বন্ধু হয়ে যাওয়ার গল্পই এই ছবিকে উপভোগ্য করেছে। অথচ যুদ্ধই ছবির প্রধান বিষয়। বলতে গেলে আধুনিক সময়ের বিশ্ব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের এক সর্বোচ্চ সিনেমাটিক দলিল নো ম্যানস ল্যান্ড।

১১. মাটির ময়না (২০০২), পরিচালক- তারেক মাসুদ
আমি বাংলা ছবি দেখতে সবচে বেশী ভালোবাসি। আর বাংলা ছবি যদি তুলনামূলক একটু ভালো হয়, এতেই মুগ্ধ হয়ে যাই আমি। এই ছবি একটু ভালো ছবি না, এই কথা আর আমাকে বলার প্রয়োজন নাই। তবে হ্যা, দীর্ঘ সময় (১৯৯৮ থেকে ২০০২) সিনেমা হলে গিয়া এলোমেলো বাংলা সিনেমা দেখতে দেখতে যখন বিরক্তির মাত্রা ছাড়িয়ে যাইতেছিলো তখনই মাটির ময়না দেখার সুযোগ আসে। আর দেখার পর মনে ১৯৯৮ এ দেখা রিভার কাওয়াই ও ওল্ড ম্যান এন্ড সি দেখার পর মনে হইছিলো আবার সিনেমার আশ্চর্য জগতের কাছাকাছি ফিরতে পারছি। এইটা বিরাট পাওয়া ছিলো আমার কাছে।

১২. সিটি অব গড (২০০২), ফার্নান্দো মিরাল্যাস ও কাতিয়া ল্যুনড
বিশ্ব সিনেমায় ব্রাজিলের সিনেমার আলাদা ইতিহাস তৈরি করছে সিটি অব গড। নতুন সিনেমা দেখবো আর সিটি অব গড দেখবো না এমন বোকা হওয়ার যোগ্যতা আমার নাই। ফুটবলের দেশ বলে পরিচিত ব্রাজিলের যে অন্য রূপ তা আমাদের কাছে তো এই সিনেমাই চিনাইয়া দিছে। মজার বিষয় এই সিনেমা কিন্তু সত্য ঘটনা অবলম্বনেই বানানো। তাই শুধুমাত্র একটি সিনেমা না সিটি অব গড। এই ছবির পর থেকে ফার্নান্দো মিরাল্যাস প্রিয় পরিচালকদেরও একজন।

১৩. স্প্রিং সামার ফল উইন্টার এন্ড স্প্রিং (২০০৩), পরিচালক- কিম কি দুক
কোনও কিছুই যে বাস্তবতার ঊর্ধ্বে না, সেটা ধর্মই হোক আর প্রেম অথবা কমিটমেন্টই হোক তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত কিম কি দুক এর এই অসামান্য ছবি। এক ছবি দেখার পর কিমের বাকি সব ছবি দেখার জন্য কেবল অপেক্ষাই করি নাই। পাওয়া মাত্রই হুমড়ি খেয়ে দেখছি। তার জন্য অনন্ত-রে একটা ধন্যবাদ দেয়াই উচিত। সে যদি বাসায় এই ডিভিডিটা না রেখে যেতো তাহলে হয়তো কিম কে আবিষ্কার করতে আরোও সময় লাগতো।

১৪. টার্টলেস ক্যান ফ্লাই (২০০৪), পরিচালক- বাগমান গোবাদি
আবারো যুদ্ধ প্রসঙ্গ। এবারো মানবিক। তবে এবার যুদ্ধে শিশুদের অবস্থান আর তাদের সংগ্রামের গল্প এই গোবাদির এই ছবি। দেখার আগে ভাবিনি এতটা ভালো লাগবে। তবে দেখার পর মুগ্ধ হয়েছিলাম। কালে কালে পৃথিবীর সব যুদ্ধে শিশুরাই যে সবচে ক্ষতিগ্রস্থ হয় তা আর বলতে হয় না। তবে শিশুদেরও জীবনেও যে এঁকে দেয়া হয় আর এই যন্ত্রণা যে তারা বয়ে বেড়ায় বাকি জীবন তা নিঃসন্দেহে বেদনার।

১৫. বর্ন ইন ব্রোথেল : ক্যালকাট্টাস রেড লাইট কিডস (২০০৪), পরিচালক- জানা ব্রিসকি ও রস কৌফমান
বলা হয় ভারত-বাংলাদেশসহ সাউথ এশিয়া ডকুমেন্টারির জন্য সর্বোৎকৃষ্ট স্থান। তাই এখানেই নির্মিত এই সিনেমা। কলকাতার পতিতালয়ে জন্ম ও বেড়ে ওঠা শিশুদের নিয়ে নির্মিত ডকুমেন্টারি। ডকুমেন্টারি শাখায় অস্কার পাইছিলো। আর কোনও কিছু বলার নাই এই ছবি নিয়া।

১৬. ভিভা কুবা (২০০৫), পরিচালক- জোয়ান কার্লোস ক্রিমাতা ও ইরাইদা মেলবার্তি
কিউবার জীবনযাপনের কিছুই বলতে আমাদের জানা নাই। কারণ আমরা ইন্টারনেটের যে জগৎটায় বাস করি তা পশ্চিমা বিশ্বের হাত দিয়া পরিচালিত আর তারা কিউবারে পছন্দ করে না। দেশটাকে যতটা খারাপ ভাবে দেখানো যায় ততটাই তারা দেখায়। তবে কিউবার সিনেমার অসাধারণ একটা ঐতিহ্য আছে। সেই ঐতিহ্যের কথা চিন্তা করেই খুঁজে খুঁজে কিউবার কিছু ছবি দেখতে শুরু করছিলাম। তার মাঝে ভিভা কুবা’ই সেরা। প্রতিবেশী দুই শিশুর গল্প, দুই বন্ধুর গল্পও। না দেখলে মিস।

১৭. ওয়াটার  (২০০৫), পরিচালক- দীপা মেহতা
সতিদাহ প্রথা উচ্ছেদ হওয়ার পরও সনাতন ধর্মাবলম্বী বিধবা নারীদের সমাজে যে কোনও গুরুত্বই ছিলো না, তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দীপা মেহতার ছবি ওয়াটার। ছবি দেখে ঐ সময়কার হিন্দু বিধবাদের জন্য মায়া হয় নি, ঐ সময়কার সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে চরম ঘৃণা তৈরি হইছিলো। ছবিতে শ্রীলংকান শিশু অভিনয় শিল্পী সরলার অভিনয় মুগ্ধ করছিলো আমারে।

১৮. বাবেল (২০০৬), পরিচালক- আলেজান্দ্রো গঞ্জালেস ইনারিতু
ইনারিতু যখন বিজ্ঞাপন বানানো বাদ দিয়া সিনেমা বানাইতে আসে, শুরুতেই সে বিশ্ববাসীকে চমক দেখায় তার এ্যামোরেস পেরোস দিয়া। কিন্তু আমি এ্যামোরেস পেরোসের চেয়ে বাবেল কে এগিয়ে রাখবো। কারণ, বাবল কেবল একটা সিনেমা না আমার কাছে। আমার কাছে এইটা একটা বিশ্ব রাজনীতি অর্থনীতির অবস্থার বিপক্ষে তীব্র আন্দোলনেরও নাম। এই ছবি ভালো না লেগে উপায় আছে!

১৯. দ্যা ফল (২০০৬), পরিচালক- টারসেম সিং
ইনারিতুর মতো টারসেমও বিজ্ঞাপন নির্মাতা। ফলে তার সিনেমায় বিজ্ঞাপনী একটা ভাষা থাকে। কিন্তু কল্পনার যে রংধনু সাত রঙের না, সেটা শত কোটি রঙেরও হতে পারে তা অসাধারণ ভাবে দেখাইছে টারসেম সিং। ইন্ডিয়ান বংশদ্ভুত কোনও পরিচালক হলিউড বা বলিউড কোথাও এত দুর্দান্ত কাজ করতে পারে নি বলে মনে হয়।

২০. ইনটু দ্যা ওয়াইল্ড (২০০৭), পরিচালক- শন পেন
ক্রিস্টোফার ম্যাকেন্ডলস এর বায়োগ্রাফি অবলম্বন করে জন ক্রাকোয়ের বই ইনটু দ্যা ওয়াইল্ড থেকে ছবি বানাইছে ইনটু দ্যা ওয়াইল্ড। বিভুতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর বাংলা উপন্যাস চাঁদের পাহাড়ের কথা যদি আমাদের মনে থাকে তবে তার শঙ্কর চরিত্রটার ইউরোপিয়ান ভার্সন এই ছবির চরিত্র ক্রিস্টোফার। উপন্যাস বলেই শঙ্কর আফ্রিকা থেকে বেঁচে ফিরতে পেরেছিলো, কিন্তু ক্রিস্টোফার নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ দিয়েছে মনের স্বাধীনতাই আসল। আর সেই স্বাধীনতাটাই আমাদের নেই। বলতে গেলে আমরা পরাধিন। তাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে ক্রিস্টোফার আর শন পেন।

২১. লেমন ট্রি (২০০৮), পরিচালক- ইরান রিকিলিস
ইসরাইলি পরিচালকরা ভালো সিনেমা বানায়। এবং নিঃসন্দেহে তাদের সিনেমার সিংহভাগই যায় প্যালেস্টাইনিদের পক্ষে। প্যালেস্টাইনিদের জীবন সংগ্রাম ইসরাইলিদের ছবির বিষয় হয়ে বারবার রূপালী পর্দায়। এই রকম জীবনচিত্রের মাঝে লেমন ট্রি যুদ্ধের বাইরে আর এক যুদ্ধের গল্প। এই গল্প বারবার আমাদের মতো ছেলেদের যারা মাকে ছেড়ে নিজের মতো থাকে তাদের ব্যার্থতার কথাও খুবই দৃঢ়ভাবে বলছে ইরান রিকিলিস।

২২. মিডনাইট ইন প্যারিস (২০১১), পরিচালক- উডি অ্যালেন
পৃথিবীর সমস্ত শিল্পীদের নাকি দুইটা মাতৃভূমি একটা তার জন্ম দেশ আর একটা প্যারিস। শিল্পের শহর প্যারিসে ব্রিটিশ এক গল্পকারের ভ্রমণটা তাই অনেকটা ইতিহাস আর কল্পনায় মাখামাখি। বাস্তব আর কল্পনার মাঝে বিস্তর ফারাক থাকলেও এই ছবিতে কিন্তু ইতিহাসকে বাস্তবে টেনে আনতে মোটেও কষ্ট পায় নি অ্যালেন। এই কারণেই সে বিশ্বসেরা পরিচালকদের একজন।


Read More

বুধবার, ১৮ জুন, ২০১৪

আপনাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, শাহরুখ খানের বয়স কত? আপনি হয়তো অনুমানে একটা তথ্য দিবেন। হয়তো তা সত্যও হয়ে যেতে পারে। কিন্তু আপনাকেই যদি আবার জিজ্ঞেস করা শাহরুখ কি তার স্বপ্নের বাইরের কোনও জীবনকে আজো পর্দায় রাঙিয়েছেন কি না তাহলে আপনি উত্তর দিতে গিয়ে বিব্রত হতে পারেন। আপনার বিব্রত হওয়াটা স্বাভাবিক। কারণ, বলিউডের এই বাদশাহ তার স্বপ্নের বাইরের কোনও জীবনকে সম্ভবত এখনো পর্দায় সাজাতে পারেন নি। আর এই মনে হওয়ার পেছনে একটি বড় কারণ হিসেবে দাঁড়ায় সেলিম আহমেদ পরিচালিত ছবি ‌‘আদম সন্তান আবু’ দেখার পর। ইংরেজিতে ছবিটির নাম ‘Abu, Son of Adam’ । এই ছবি দেখার সাথে শাহরুখের কি সম্পর্ক তা আপনার মনে প্রশ্ন আসতে পারে। আপনার কৌতুহল মিটিয়ে তারপর ছবির প্রসঙ্গে যাওয়া যাক। এই ছবিটি ভারতের অঙ্গ রাজ্য মালয়ালাম অঞ্চলের একটি ছবি। ভাষাও ঐ অঞ্চলের। তবে ছবির ভাষাটা আর ঐ অঞ্চলের নেই। ছবিটি হয়ে উঠেছে বিশ্বের মানবিক মানুষের এক চমৎকার অনুভূতির গল্প। আর এই কারণেই ভারতের সিনেমা মাফিয়া করণ জোহর চেয়েছিলেন ছবিটি হিন্দীতে পুনঃনির্মাণ করতে। কিন্তু হয়ে উঠেনি। তার প্রধান কারণ ঐ শাহরুখ খান। করণ চেয়েছিলেন এই ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র আবু’র চরিত্রে অভিনয় করুক শাহরুখ খান। এ কারণেই বোধ হয় ক্ষেপে গিয়ে কখনো হিন্দী ছবি বানাবেন না বলে রীতিমত ঘোষণা দিয়েছেন এই ছবির নির্মাতা সেলিম।
ছবির গল্প পুরোপুরি বলে দেয়া ছবির আলোচনা বা রিভিউ এর শর্ত না। তাই আমিও এই ছবির গল্প পুরোপুরি বলবো না। যেটুকু আমার বলা প্রয়োজন সেটুকুই বলবো। আমি যা বলতে চাই আমাদের ছবির যে কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘আবু’, সে ঐ অঞ্চলের বলতে গেলে মেগাস্টারের মতো। উইকিপিডিয়ার মতো মুক্ত কোষে গেলেও তার সম্পর্কে যে তথ্য আপনি পাবেন তা রীতিমত আশ্চর্যজনক। কারণ, তিনি তার চুয়াল্লিশ বছর জীবনে প্রায় ২শ ৪১টির মতো ছবিতে অভিনয় করেছেন। তার ছবির সবই কিন্তু একই ধাচের নায়োকোচিত নয়। কিছুটা এক্সট্রা লুক নিয়ে একদমই খাঁটি অভিনেতার মেজাজে তিনি অভিনয় করেন। আর এ কারণেই সেলিম আহমেদ তাকে তার দ্বিগুণ বয়সেরও বেশী চরিত্রে কাস্ট করেছেন। ছবিতে তার অভিনয় এতই চমৎকার ছিলো যে, সে ঐ বছর ভারতের জাতীয় পুরস্কারও জিতে নেয়। তার অভিনয়ের মাঝ দিয়ে তিনি কি করতে চেয়েছেন? এই প্রশ্নের চেয়ে বেটার হয় ছবিতে তিনি কি করেছেন? আবু ও তার স্ত্রী একটা স্বপ্নের পেছনে ছুটেছেন। আর এই স্বপ্ন ধরার জন্য তিনি তার সাধ্যের মধ্যে সবটুকুই করেছেন। কিন্তু স্বপ্নটা তার বাস্তবে রূপ নেয় নি। কি সেই স্বপ্ন? তা জানতে হলে আপনাকে ছবিটা দেখতে হবে। ছবিতে আসলে আপনারই একটা স্বপ্নে সেও ধরতে চেয়েছেন। ধরতে গিয়ে তিনি মোটেও ক্লান্ত হন নি। তার কাছে ধরা পড়তে না পেরে ক্লান্ত হয়েছে স্বপ্নটিই। আসলে আমাদের তো স্বপ্নই থাকে। স্বপ্নগুলোই তো বাঁচিয়ে রাখে, তাকেও বাঁচিয়ে রেখেছে তার স্বপ্ন, আমাদের স্বপ্ন। কারণ আমরা জানি ছবি ফুরিয়ে যাবে কিন্তু স্বপ্নটা ফুরাবে না।
ছবিটার সবচেয়ে বড় আবেদন এর মানবিক আকাঙ্খা। এই আকাঙ্খার জের ধরেই ছবির গল্পটা এগোয়। আসতে থাকে স্বপ্ন পূরণের সংগ্রাম। পৃথিবীর প্রায় তাবৎ ক্লাসিক গল্পের সাথে এক ধরনের সংগ্রামের যে সম্পর্কটা আছে, এই ছবিতেও তার একটা বড় প্রভাব আছে। ভারতের ছবি বললেই আপনার চোখে যে চোখ ধাধানো ছবি, মারমার কাটকাট অ্যাকশন, নায়িকার আকর্ষণীয় শরীর প্রদর্শণ, একটু পর পর যে গানের বাহারি ছবির চেহারা ভেসে আসে এখানে তার অনেক কিছুই নেই বলে আপনি হয়তো হতাশ হবেন। আদতে আপনাকে হতাশ হবার জন্যে নয়, এই ছবির মূল সুর সম্ভবত আশাতেই। একটু আগেও তাই বলতে চেয়েছি আমি।
ছবির কথা বলতে গিয়ে আশার কথাটা আমি বারবার বলছি এর পেছনে আরো একটা কারণ আছে। আর তা হলো ছবির পেছনের গল্পটাও অনেকটা আশাব্যাঞ্জক। ছবির যে পরিচালক সেলিম আহমেদ, তিনি প্রথমে টেলিভিশনের নির্মাতা ছিলেন। টিভিতে কাজ করে করে টাকা সঞ্চয় করে নিজের ছবির প্রযোজনা নিজেই করেছেন। কারণ তিনি জানতেন ভারতে তার মতো মানবিক গল্পের ছবির জন্য ব্যবসায়ী প্রযোজকেরা টাকা ঢালবে না। আর কেন ঢালবে না এ গল্পতো শুরুতেই বলেই দিয়েছি। নির্মাতা যখন ছবির বাজেট যখন করতে যান তখন দেখেন যে ৩৫ এম.এম এ তার ছবি বানানো কঠিন। তো তিনি ঐ সময় খরচ কমানোর কথা চিন্তা করে ১৬ এম.এম এ ছবি স্যুট করতে চেয়েছিলেন। পরবর্তীতে ছবির চিত্রগ্রাহকের সাথে কথা বলে শেষ পর্যন্ত তিনি ছবিটি স্যুট করেছিলেন ডিজিটালে। যদিও ডিজিটালে সর্বোচ্চ প্রযুক্তিই তিনি ব্যবহার করেছেন, তার ফলও আমরা পর্দায় দেখি। কি অনুভূতিপ্রবণ ছবি উঠে আসে পর্দায়। যেনবা বাস্তব মানুষগুলোই চোখের সামনে ভেসে বেড়াচ্ছে। আরও মজার তথ্য হলো এই ছবি যেমন নির্মাতার প্রথম সিনেমা, তেমনি পর্দার পেছনে কাজ করা অধিকাংশেরই এই ছবি দিয়ে ডেব্যু। আর এর মাঝেও আর্ট ডিরেকশনে সেরা আঞ্চলিক পুরস্কারটাও ছবির শিল্প নির্দেশকের কাছেই গেছে। এইসব তথ্য আপনি ছবির উইকি থেকেই পাবেন। এর জন্য আমার কোনও কৃতিত্ব নেই। আমি শুধু বলতে চাই ছবিটি আপনি দেখুন।

সর্বোপরি আপনি যদি নাচ গানের জগতের বাইরের একটি ছবি দেখতে চান, আর মনে করছেন যে সিনেমার নামে দেয়া সময়টা আমি আমার অনুভূতির সাথে কাটাবো। কাটাবো মানবিক বোধ ও পরিপার্শ্বিকতার সাথে তবে ‘আদামিন্তে মাকান আবু’ ‘Abu, Son of Adam’ একটি উত্তম ছবি। সিনেমা বিষয়ক বিনোদনের জগতে আপনাকে পূর্ণ বিনোদনই দিবে এই ১শ মিনিটের পূর্ণ দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। জয় হোক সিনেমার।  

আবু, সন অব আদম : সিনেমাটিক বিনোদন ও অনুভূতির গল্প

at বুধবার, জুন ১৮, ২০১৪  |  No comments

আপনাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, শাহরুখ খানের বয়স কত? আপনি হয়তো অনুমানে একটা তথ্য দিবেন। হয়তো তা সত্যও হয়ে যেতে পারে। কিন্তু আপনাকেই যদি আবার জিজ্ঞেস করা শাহরুখ কি তার স্বপ্নের বাইরের কোনও জীবনকে আজো পর্দায় রাঙিয়েছেন কি না তাহলে আপনি উত্তর দিতে গিয়ে বিব্রত হতে পারেন। আপনার বিব্রত হওয়াটা স্বাভাবিক। কারণ, বলিউডের এই বাদশাহ তার স্বপ্নের বাইরের কোনও জীবনকে সম্ভবত এখনো পর্দায় সাজাতে পারেন নি। আর এই মনে হওয়ার পেছনে একটি বড় কারণ হিসেবে দাঁড়ায় সেলিম আহমেদ পরিচালিত ছবি ‌‘আদম সন্তান আবু’ দেখার পর। ইংরেজিতে ছবিটির নাম ‘Abu, Son of Adam’ । এই ছবি দেখার সাথে শাহরুখের কি সম্পর্ক তা আপনার মনে প্রশ্ন আসতে পারে। আপনার কৌতুহল মিটিয়ে তারপর ছবির প্রসঙ্গে যাওয়া যাক। এই ছবিটি ভারতের অঙ্গ রাজ্য মালয়ালাম অঞ্চলের একটি ছবি। ভাষাও ঐ অঞ্চলের। তবে ছবির ভাষাটা আর ঐ অঞ্চলের নেই। ছবিটি হয়ে উঠেছে বিশ্বের মানবিক মানুষের এক চমৎকার অনুভূতির গল্প। আর এই কারণেই ভারতের সিনেমা মাফিয়া করণ জোহর চেয়েছিলেন ছবিটি হিন্দীতে পুনঃনির্মাণ করতে। কিন্তু হয়ে উঠেনি। তার প্রধান কারণ ঐ শাহরুখ খান। করণ চেয়েছিলেন এই ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র আবু’র চরিত্রে অভিনয় করুক শাহরুখ খান। এ কারণেই বোধ হয় ক্ষেপে গিয়ে কখনো হিন্দী ছবি বানাবেন না বলে রীতিমত ঘোষণা দিয়েছেন এই ছবির নির্মাতা সেলিম।
ছবির গল্প পুরোপুরি বলে দেয়া ছবির আলোচনা বা রিভিউ এর শর্ত না। তাই আমিও এই ছবির গল্প পুরোপুরি বলবো না। যেটুকু আমার বলা প্রয়োজন সেটুকুই বলবো। আমি যা বলতে চাই আমাদের ছবির যে কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘আবু’, সে ঐ অঞ্চলের বলতে গেলে মেগাস্টারের মতো। উইকিপিডিয়ার মতো মুক্ত কোষে গেলেও তার সম্পর্কে যে তথ্য আপনি পাবেন তা রীতিমত আশ্চর্যজনক। কারণ, তিনি তার চুয়াল্লিশ বছর জীবনে প্রায় ২শ ৪১টির মতো ছবিতে অভিনয় করেছেন। তার ছবির সবই কিন্তু একই ধাচের নায়োকোচিত নয়। কিছুটা এক্সট্রা লুক নিয়ে একদমই খাঁটি অভিনেতার মেজাজে তিনি অভিনয় করেন। আর এ কারণেই সেলিম আহমেদ তাকে তার দ্বিগুণ বয়সেরও বেশী চরিত্রে কাস্ট করেছেন। ছবিতে তার অভিনয় এতই চমৎকার ছিলো যে, সে ঐ বছর ভারতের জাতীয় পুরস্কারও জিতে নেয়। তার অভিনয়ের মাঝ দিয়ে তিনি কি করতে চেয়েছেন? এই প্রশ্নের চেয়ে বেটার হয় ছবিতে তিনি কি করেছেন? আবু ও তার স্ত্রী একটা স্বপ্নের পেছনে ছুটেছেন। আর এই স্বপ্ন ধরার জন্য তিনি তার সাধ্যের মধ্যে সবটুকুই করেছেন। কিন্তু স্বপ্নটা তার বাস্তবে রূপ নেয় নি। কি সেই স্বপ্ন? তা জানতে হলে আপনাকে ছবিটা দেখতে হবে। ছবিতে আসলে আপনারই একটা স্বপ্নে সেও ধরতে চেয়েছেন। ধরতে গিয়ে তিনি মোটেও ক্লান্ত হন নি। তার কাছে ধরা পড়তে না পেরে ক্লান্ত হয়েছে স্বপ্নটিই। আসলে আমাদের তো স্বপ্নই থাকে। স্বপ্নগুলোই তো বাঁচিয়ে রাখে, তাকেও বাঁচিয়ে রেখেছে তার স্বপ্ন, আমাদের স্বপ্ন। কারণ আমরা জানি ছবি ফুরিয়ে যাবে কিন্তু স্বপ্নটা ফুরাবে না।
ছবিটার সবচেয়ে বড় আবেদন এর মানবিক আকাঙ্খা। এই আকাঙ্খার জের ধরেই ছবির গল্পটা এগোয়। আসতে থাকে স্বপ্ন পূরণের সংগ্রাম। পৃথিবীর প্রায় তাবৎ ক্লাসিক গল্পের সাথে এক ধরনের সংগ্রামের যে সম্পর্কটা আছে, এই ছবিতেও তার একটা বড় প্রভাব আছে। ভারতের ছবি বললেই আপনার চোখে যে চোখ ধাধানো ছবি, মারমার কাটকাট অ্যাকশন, নায়িকার আকর্ষণীয় শরীর প্রদর্শণ, একটু পর পর যে গানের বাহারি ছবির চেহারা ভেসে আসে এখানে তার অনেক কিছুই নেই বলে আপনি হয়তো হতাশ হবেন। আদতে আপনাকে হতাশ হবার জন্যে নয়, এই ছবির মূল সুর সম্ভবত আশাতেই। একটু আগেও তাই বলতে চেয়েছি আমি।
ছবির কথা বলতে গিয়ে আশার কথাটা আমি বারবার বলছি এর পেছনে আরো একটা কারণ আছে। আর তা হলো ছবির পেছনের গল্পটাও অনেকটা আশাব্যাঞ্জক। ছবির যে পরিচালক সেলিম আহমেদ, তিনি প্রথমে টেলিভিশনের নির্মাতা ছিলেন। টিভিতে কাজ করে করে টাকা সঞ্চয় করে নিজের ছবির প্রযোজনা নিজেই করেছেন। কারণ তিনি জানতেন ভারতে তার মতো মানবিক গল্পের ছবির জন্য ব্যবসায়ী প্রযোজকেরা টাকা ঢালবে না। আর কেন ঢালবে না এ গল্পতো শুরুতেই বলেই দিয়েছি। নির্মাতা যখন ছবির বাজেট যখন করতে যান তখন দেখেন যে ৩৫ এম.এম এ তার ছবি বানানো কঠিন। তো তিনি ঐ সময় খরচ কমানোর কথা চিন্তা করে ১৬ এম.এম এ ছবি স্যুট করতে চেয়েছিলেন। পরবর্তীতে ছবির চিত্রগ্রাহকের সাথে কথা বলে শেষ পর্যন্ত তিনি ছবিটি স্যুট করেছিলেন ডিজিটালে। যদিও ডিজিটালে সর্বোচ্চ প্রযুক্তিই তিনি ব্যবহার করেছেন, তার ফলও আমরা পর্দায় দেখি। কি অনুভূতিপ্রবণ ছবি উঠে আসে পর্দায়। যেনবা বাস্তব মানুষগুলোই চোখের সামনে ভেসে বেড়াচ্ছে। আরও মজার তথ্য হলো এই ছবি যেমন নির্মাতার প্রথম সিনেমা, তেমনি পর্দার পেছনে কাজ করা অধিকাংশেরই এই ছবি দিয়ে ডেব্যু। আর এর মাঝেও আর্ট ডিরেকশনে সেরা আঞ্চলিক পুরস্কারটাও ছবির শিল্প নির্দেশকের কাছেই গেছে। এইসব তথ্য আপনি ছবির উইকি থেকেই পাবেন। এর জন্য আমার কোনও কৃতিত্ব নেই। আমি শুধু বলতে চাই ছবিটি আপনি দেখুন।

সর্বোপরি আপনি যদি নাচ গানের জগতের বাইরের একটি ছবি দেখতে চান, আর মনে করছেন যে সিনেমার নামে দেয়া সময়টা আমি আমার অনুভূতির সাথে কাটাবো। কাটাবো মানবিক বোধ ও পরিপার্শ্বিকতার সাথে তবে ‘আদামিন্তে মাকান আবু’ ‘Abu, Son of Adam’ একটি উত্তম ছবি। সিনেমা বিষয়ক বিনোদনের জগতে আপনাকে পূর্ণ বিনোদনই দিবে এই ১শ মিনিটের পূর্ণ দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। জয় হোক সিনেমার।  

Read More

সোমবার, ৬ জানুয়ারি, ২০১৪

মানুষের জীবনে যদি কখনো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে তবে আমরা তার মূল্যায়ন করি ‘সিনেমার মতো’ বলে। কারণ, সিনেমার গল্পটা স্বাভাবিক জীবনের গল্প হবেই না অধিকাংশ সময়ই আমাদের মাথায় তা ডিফল্ট হিসেবে সেট করা থাকে। সেই ডিফল্ট ভাবনার বাইরে গিয়ে আমরা তাই ভাবতেও চাই না। কারণ, আমরা চাই একটা নির্ঝঞ্ঝাট ও সমান্তরাল জীবন। যেখানে সিনেমার মতো কোনও ভিলেন থাকবে না, কাউকে নায়কোচিত হয়ে সেই ভিলেনের কাছ থেকে বড় কিছু ছিনিয়ে আনতে হবে না, সর্বোপরি একটা ছকে বাঁধা জীবনই প্রত্যাশা করি। যদিও এর বাইরেও মানুষ ভাবে, প্রত্যাশা করে, জীবন কাটাতে চায়। তবে তা শতকরা হিসেবে খুবই কম। সেইসব কম মানুষেরা পৃথিবীতে একটু ভিন্ন ভাবেই বাঁচে, জীবন যাপন করে। আর তাই তাদের জীবন সম্পর্কেও চারপাশের মানুষের থাকে প্রচণ্ড কৌতুহল। বাংলা চলচ্চিত্রের পথে তেমন একজন ভিন্ন জগতের মানুষ ছিলেন চিত্র পরিচালক মৃণাল সেন। যে সকল চলচ্চিত্রকারদের হাত ধরে বাংলা চলচ্চিত্র বিশ্ব দরবারে পরিচিত হয়েছে, মৃণাল তাদের একজন। কেবল একজন বললে ভুল হবে বলতে হবে, বলতে হয় শীর্ষস্থানীয়। আর তাই চলচ্চিত্রমোদী তরুণ-যুবা সহ চলচ্চিত্রপ্রেমিদের তাঁর প্রতি আগ্রহ থাকবেই। কিভাবে বেড়ে ওঠেন, কিভাবে হয়ে উঠেন একজন অনুকরণীয় চলচ্চিত্রকার। হয়তো সেইসব আগ্রহ বা তাঁর নিজের জীবনের এই আলোর অনালোকিত জীবনের গল্পটা বলার জন্যই তিনি একটি বই লিখেছেন। লিখেছেন তাঁর চলচ্চিত্র জীবনের আত্মজীবনী ‘তৃতীয় ভূবন’।
মৃণাল সেনে ছবি যতটা আগে দেখেছি, তাঁর লেখা তার সিকিভাগও আগে পড়িনি। তবে জেনেছিলাম তার লেখার হাত বেশ, গদ্য ঝড়ঝড়ে। সেই লোভে পরেই কিনে ফেলা হয় প্রত্যাশার চেয়েও বেশী দামের বই। আর কেনার পর একদিন মাঝ রাতে তার সাবলিল গদ্য পড়া শুরু করি। খুব বেশী দূর যাওয়ার আগেই এক জায়গায় এসে প্রচণ্ড ধাক্কা খাই, মন বিষাদে ভরে যায়। ঘটনার দিন ৭ আগস্ট ১৯৪১। হ্যা, ঠিকই ধরেছেন, ঐ দিন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর মহাপ্রয়াণ দিবস। ঐদিন তার চোখের সামনের ঘটনা। এখনকার বয়োবৃদ্ধ মৃণাল তখন যুবক। রবীন্দ্রনাথের দাহস্থান নিমতলা শ্মশানের ঘটনা। সে লিখেছে, “গঙ্গার ধারে এই নিমতলা ঘাটটি ক’দিন ধরেই সরকারি নিরাপত্তার মধ্যে রয়েছে যাতে কবির দেহের সৎকার সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়। পুলিশের কর্ডন ঘাটের গেটের সামনে। বাধ্য হয়েই আমি দূরে দাঁড়ালাম। আমার মতো আরো অনেকে উপায় না-দেখে দাঁড়িয়ে রইলো একটু দূরে। একটু তফাতে। কিন্তু সেই পুলিশ কর্ডনের ভেতর একটি লম্বা সুদর্শন যুবককে দেখে আমি একটু অবাকই হলাম। কতই বা বয়স হবে পঁচিশ-ছাব্বিশ। সাদা একটা ধুতি তাঁর পরনে আর গায়ে একটা কুর্তা। বিধ্বস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কর্ডনের ভেতরে। সেই যুবকের দুটি হাতে ওপর সাদা কাপড়ে মোড়া একটি মৃত শিশু, যাকে শ্মশানে দাহ করতে এনেছে যুবকটি. নিশ্চয়ই সেই শিশুটির বাবা। কিন্তু এখানে এসে এই নিষ্ঠুর পারিপার্শ্বিক অবস্থায় সে যুবকটি দ্বিধাগ্রস্ত। ও অন্য কোনও শ্মশানে গেলো না কেন! ভাবলাম আমি। যুবকটি একাই এসেছে মনে হলো। হয়তো কোনও ব্যাপার আছে যে, এই নিমতলা ঘাটেই তার শিশুটিকে দাহ করতে হবে। হয়তো মনের ভেতর কোনও ইচ্ছে, যুবকটির কোনো বিশেষ অভিমান কাজ করছে। হঠাৎ ভিড়ের ঢেউ। সবদিক দিয়ে। কাতারে কাতার মানুষ শ্মশানঘাট অতিক্রম করতে চলেছে। অসংখ্য মানুষ ছুটে আসছে শ্মশানের দিকে।
পুলিশের সবরকম রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা ভেঙেচুড়ে চুরমার হয়ে গেলো জনতার মিছিলে। চারদিকে বিশৃঙ্খলা। ভিড়ের চাপে মানুষের মৃত্যু। কোনওরকম বড় দুর্ঘটনা ঘটছে! কিন্তু মৃত ঐ শিশুটি! শিশুটি হারিয়ে গিয়েছে, ভিড়ের চাপে মৃত শিশুটি পদপিষ্ট হয়েছে! ঐ যুবকটি কি একমাত্র সন্তানের পিতা হয়তো, ‘হ্যাঁ’ হয়তো বা ‘না’।” এপর্যন্ত পড়ার পর আমার পড়া বিষন্নতায় থমকে ছিলো। আবার যখন শুরু করলাম, আর কোনও বিষন্ন দিনের গল্প মৃণাল করে নি। কেবল ভালো গল্পগুলোই বলেছিলেন। হয়তো আমার মতো অনুভূতিপ্রবণ পাঠকের কথাও তার মনে ছিলো। নয়তো তার বাকি জীবনের চলচ্চিত্রযাত্রায় কি কোনও বিষন্ন ঘটনা নেই? ছিলো না?
মৃণাল সেন এর বই ‘তৃতীয় ভূবন’ এর বাকি সময়টা সবটাই ছিলো তার সিনেমার জগতের কথা। তবে সেই সিনেমার গল্পগুলোও খুব বর্ণনাত্মক হয়ে আসে নি। এসেছে তাঁর সিনেমার ও একই সাথে সিনেমার সাথে তার নিজের বিশ্বযাত্রার কথা। যেখানেও প্রতি পৃষ্ঠায় তাঁর নানা সাফল্যের গল্পই তিনি করেছেন। অথচ এইসব সাফল্যের গল্প পড়তে পড়তে একটা সময় মনে হয়, চলচ্চিত্রকার মৃণালের জীবনে কি কোনও ব্যার্থতা নেই? তবে সেই ব্যার্থতা কোথায়? হয়তো সেই ব্যার্থতার কথা বলতে গিয়েই তিনি লিখেছেন, ‘আই অ্যাম গ্রোয়িং ইন এভরি ফিল্ম। সে কারণেই আমার পুরনো ছবি সম্পর্কে আমি বেশ ক্রিটিকাল। মাঝে মাঝে মনে হয় যদি পুরো ছবিটাই ড্রেস রিহার্সেল মনে করে আবার তুলতে পারতাম।’ এই ভাবনা ও বক্তব্য প্রমাণ করে সে তার নির্মিত ছবিগুলোর দুর্বল দিকগুলো আড়াল করে আরো ভালো তৈরি করতে চান। কিন্তু এর বাইরে তিনি তেমন কিছু বলেন নি। তাই মনে পড়ে হুমায়ূন আজাদের কথা। তিনি বলেছিলেন, বাঙালী আত্মজীবনী লিখতে পারে না। বাঙালীর আত্মজীবনী হয় আত্মপ্রশংসার মহাকাব্য’।

মৃণাল সেন হয়তো অনিচ্ছা সত্বেও এড়িয়ে গেছেন তার সিনেমাযাত্রার ভুল-ত্রুটি বা দুর্বলতা। কিন্তু সিনেমার ভূবন নিয়ে কথা বললে সে তথ্যও এই বইয়ে স্থান পাওয়ার দাবী করে বলেই মনে করি। যদিও ঐ ভুলের তথ্য বা গল্প ছাড়াও যথেষ্ঠ সুন্দর ও সাবলিল গদ্যের জন্যই পড়তে পড়তে মৃণাল সেন এর এক জীবনের সিনেমাযাত্রার সাক্ষী হয়ে থাকা যায়। তাই বা কম কি! জয় সিনেমা যাত্রা।

মৃণাল সেন ও তাঁর সিনেমাযাত্রার কথা

at সোমবার, জানুয়ারি ০৬, ২০১৪  |  No comments

মানুষের জীবনে যদি কখনো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে তবে আমরা তার মূল্যায়ন করি ‘সিনেমার মতো’ বলে। কারণ, সিনেমার গল্পটা স্বাভাবিক জীবনের গল্প হবেই না অধিকাংশ সময়ই আমাদের মাথায় তা ডিফল্ট হিসেবে সেট করা থাকে। সেই ডিফল্ট ভাবনার বাইরে গিয়ে আমরা তাই ভাবতেও চাই না। কারণ, আমরা চাই একটা নির্ঝঞ্ঝাট ও সমান্তরাল জীবন। যেখানে সিনেমার মতো কোনও ভিলেন থাকবে না, কাউকে নায়কোচিত হয়ে সেই ভিলেনের কাছ থেকে বড় কিছু ছিনিয়ে আনতে হবে না, সর্বোপরি একটা ছকে বাঁধা জীবনই প্রত্যাশা করি। যদিও এর বাইরেও মানুষ ভাবে, প্রত্যাশা করে, জীবন কাটাতে চায়। তবে তা শতকরা হিসেবে খুবই কম। সেইসব কম মানুষেরা পৃথিবীতে একটু ভিন্ন ভাবেই বাঁচে, জীবন যাপন করে। আর তাই তাদের জীবন সম্পর্কেও চারপাশের মানুষের থাকে প্রচণ্ড কৌতুহল। বাংলা চলচ্চিত্রের পথে তেমন একজন ভিন্ন জগতের মানুষ ছিলেন চিত্র পরিচালক মৃণাল সেন। যে সকল চলচ্চিত্রকারদের হাত ধরে বাংলা চলচ্চিত্র বিশ্ব দরবারে পরিচিত হয়েছে, মৃণাল তাদের একজন। কেবল একজন বললে ভুল হবে বলতে হবে, বলতে হয় শীর্ষস্থানীয়। আর তাই চলচ্চিত্রমোদী তরুণ-যুবা সহ চলচ্চিত্রপ্রেমিদের তাঁর প্রতি আগ্রহ থাকবেই। কিভাবে বেড়ে ওঠেন, কিভাবে হয়ে উঠেন একজন অনুকরণীয় চলচ্চিত্রকার। হয়তো সেইসব আগ্রহ বা তাঁর নিজের জীবনের এই আলোর অনালোকিত জীবনের গল্পটা বলার জন্যই তিনি একটি বই লিখেছেন। লিখেছেন তাঁর চলচ্চিত্র জীবনের আত্মজীবনী ‘তৃতীয় ভূবন’।
মৃণাল সেনে ছবি যতটা আগে দেখেছি, তাঁর লেখা তার সিকিভাগও আগে পড়িনি। তবে জেনেছিলাম তার লেখার হাত বেশ, গদ্য ঝড়ঝড়ে। সেই লোভে পরেই কিনে ফেলা হয় প্রত্যাশার চেয়েও বেশী দামের বই। আর কেনার পর একদিন মাঝ রাতে তার সাবলিল গদ্য পড়া শুরু করি। খুব বেশী দূর যাওয়ার আগেই এক জায়গায় এসে প্রচণ্ড ধাক্কা খাই, মন বিষাদে ভরে যায়। ঘটনার দিন ৭ আগস্ট ১৯৪১। হ্যা, ঠিকই ধরেছেন, ঐ দিন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর মহাপ্রয়াণ দিবস। ঐদিন তার চোখের সামনের ঘটনা। এখনকার বয়োবৃদ্ধ মৃণাল তখন যুবক। রবীন্দ্রনাথের দাহস্থান নিমতলা শ্মশানের ঘটনা। সে লিখেছে, “গঙ্গার ধারে এই নিমতলা ঘাটটি ক’দিন ধরেই সরকারি নিরাপত্তার মধ্যে রয়েছে যাতে কবির দেহের সৎকার সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়। পুলিশের কর্ডন ঘাটের গেটের সামনে। বাধ্য হয়েই আমি দূরে দাঁড়ালাম। আমার মতো আরো অনেকে উপায় না-দেখে দাঁড়িয়ে রইলো একটু দূরে। একটু তফাতে। কিন্তু সেই পুলিশ কর্ডনের ভেতর একটি লম্বা সুদর্শন যুবককে দেখে আমি একটু অবাকই হলাম। কতই বা বয়স হবে পঁচিশ-ছাব্বিশ। সাদা একটা ধুতি তাঁর পরনে আর গায়ে একটা কুর্তা। বিধ্বস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কর্ডনের ভেতরে। সেই যুবকের দুটি হাতে ওপর সাদা কাপড়ে মোড়া একটি মৃত শিশু, যাকে শ্মশানে দাহ করতে এনেছে যুবকটি. নিশ্চয়ই সেই শিশুটির বাবা। কিন্তু এখানে এসে এই নিষ্ঠুর পারিপার্শ্বিক অবস্থায় সে যুবকটি দ্বিধাগ্রস্ত। ও অন্য কোনও শ্মশানে গেলো না কেন! ভাবলাম আমি। যুবকটি একাই এসেছে মনে হলো। হয়তো কোনও ব্যাপার আছে যে, এই নিমতলা ঘাটেই তার শিশুটিকে দাহ করতে হবে। হয়তো মনের ভেতর কোনও ইচ্ছে, যুবকটির কোনো বিশেষ অভিমান কাজ করছে। হঠাৎ ভিড়ের ঢেউ। সবদিক দিয়ে। কাতারে কাতার মানুষ শ্মশানঘাট অতিক্রম করতে চলেছে। অসংখ্য মানুষ ছুটে আসছে শ্মশানের দিকে।
পুলিশের সবরকম রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা ভেঙেচুড়ে চুরমার হয়ে গেলো জনতার মিছিলে। চারদিকে বিশৃঙ্খলা। ভিড়ের চাপে মানুষের মৃত্যু। কোনওরকম বড় দুর্ঘটনা ঘটছে! কিন্তু মৃত ঐ শিশুটি! শিশুটি হারিয়ে গিয়েছে, ভিড়ের চাপে মৃত শিশুটি পদপিষ্ট হয়েছে! ঐ যুবকটি কি একমাত্র সন্তানের পিতা হয়তো, ‘হ্যাঁ’ হয়তো বা ‘না’।” এপর্যন্ত পড়ার পর আমার পড়া বিষন্নতায় থমকে ছিলো। আবার যখন শুরু করলাম, আর কোনও বিষন্ন দিনের গল্প মৃণাল করে নি। কেবল ভালো গল্পগুলোই বলেছিলেন। হয়তো আমার মতো অনুভূতিপ্রবণ পাঠকের কথাও তার মনে ছিলো। নয়তো তার বাকি জীবনের চলচ্চিত্রযাত্রায় কি কোনও বিষন্ন ঘটনা নেই? ছিলো না?
মৃণাল সেন এর বই ‘তৃতীয় ভূবন’ এর বাকি সময়টা সবটাই ছিলো তার সিনেমার জগতের কথা। তবে সেই সিনেমার গল্পগুলোও খুব বর্ণনাত্মক হয়ে আসে নি। এসেছে তাঁর সিনেমার ও একই সাথে সিনেমার সাথে তার নিজের বিশ্বযাত্রার কথা। যেখানেও প্রতি পৃষ্ঠায় তাঁর নানা সাফল্যের গল্পই তিনি করেছেন। অথচ এইসব সাফল্যের গল্প পড়তে পড়তে একটা সময় মনে হয়, চলচ্চিত্রকার মৃণালের জীবনে কি কোনও ব্যার্থতা নেই? তবে সেই ব্যার্থতা কোথায়? হয়তো সেই ব্যার্থতার কথা বলতে গিয়েই তিনি লিখেছেন, ‘আই অ্যাম গ্রোয়িং ইন এভরি ফিল্ম। সে কারণেই আমার পুরনো ছবি সম্পর্কে আমি বেশ ক্রিটিকাল। মাঝে মাঝে মনে হয় যদি পুরো ছবিটাই ড্রেস রিহার্সেল মনে করে আবার তুলতে পারতাম।’ এই ভাবনা ও বক্তব্য প্রমাণ করে সে তার নির্মিত ছবিগুলোর দুর্বল দিকগুলো আড়াল করে আরো ভালো তৈরি করতে চান। কিন্তু এর বাইরে তিনি তেমন কিছু বলেন নি। তাই মনে পড়ে হুমায়ূন আজাদের কথা। তিনি বলেছিলেন, বাঙালী আত্মজীবনী লিখতে পারে না। বাঙালীর আত্মজীবনী হয় আত্মপ্রশংসার মহাকাব্য’।

মৃণাল সেন হয়তো অনিচ্ছা সত্বেও এড়িয়ে গেছেন তার সিনেমাযাত্রার ভুল-ত্রুটি বা দুর্বলতা। কিন্তু সিনেমার ভূবন নিয়ে কথা বললে সে তথ্যও এই বইয়ে স্থান পাওয়ার দাবী করে বলেই মনে করি। যদিও ঐ ভুলের তথ্য বা গল্প ছাড়াও যথেষ্ঠ সুন্দর ও সাবলিল গদ্যের জন্যই পড়তে পড়তে মৃণাল সেন এর এক জীবনের সিনেমাযাত্রার সাক্ষী হয়ে থাকা যায়। তাই বা কম কি! জয় সিনেমা যাত্রা।

Read More

বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৩


গতকাল রাতে আমি যে গল্পটি আমি জেনেছি,
তার একটি শুরু আছে
এই কথা এখনো মনে রেখেছে শীত সন্তপ্ত ভোরের আকাশ

প্রতিদিন এই শীত ও শহরের উষ্ণতা বয়ে নিয়ে
একটি কোমল বাড়ির কাছে গোপনে লিখে রাখি
                    সেইসব মৃত্যুঞ্জয়ীদের নাম
এখানে কি আজ শিমুল বাগান হয়েছে?
যে শিমুল ফুটেছিলো এক দুপুরের রক্তে?

আমরা এই দুপুরে সেই ফাল্গুনের ঘ্রাণ বয়ে বেড়াই
দেখি, সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে এই ঘ্রাণ ছড়িয়ে যাচ্ছে

                                    পথ থেকে পথে 

ফাল্গুনের ঘ্রাণ

at বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪, ২০১৩  |  No comments


গতকাল রাতে আমি যে গল্পটি আমি জেনেছি,
তার একটি শুরু আছে
এই কথা এখনো মনে রেখেছে শীত সন্তপ্ত ভোরের আকাশ

প্রতিদিন এই শীত ও শহরের উষ্ণতা বয়ে নিয়ে
একটি কোমল বাড়ির কাছে গোপনে লিখে রাখি
                    সেইসব মৃত্যুঞ্জয়ীদের নাম
এখানে কি আজ শিমুল বাগান হয়েছে?
যে শিমুল ফুটেছিলো এক দুপুরের রক্তে?

আমরা এই দুপুরে সেই ফাল্গুনের ঘ্রাণ বয়ে বেড়াই
দেখি, সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে এই ঘ্রাণ ছড়িয়ে যাচ্ছে

                                    পথ থেকে পথে 

Read More

এই সাইটের যে কোনও লেখা যে কেউ অনলাইনে ব্যবহার করতে পারবে। তবে লেখকের নাম ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক।

Blogger template Proudly Powered by Blogger. Arranged By: এতক্ষণে অরিন্দম